বাংলাদেশের সামনে বড় বাঁধা ওয়ার্নার-স্মিথ

সুলতান মাহমুদ রিপন>
মিরপুর টেস্টের তৃতীয় দিনে দুর্দান্তভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছে সফরকারী অস্ট্রেলিয়া। নাথান লায়নের দারুণ বোলিংয়ে বাংলাদেশকে ২২১ রানে গুটিয়ে দেওয়ার পর ডেভিড ওয়ার্নার ও স্টিভেন স্মিথের ব্যাটে ভালোভাবেই এগিয়ে চলেছে সফরকারীরা। যদিও দ্বিতীয় ইনিংসে সাকিব ও মিরাজ উইকেট পেলেন। এমনকি সেই সঙ্গে খুব দ্রুত অস্ট্রেলিয়ার
২টি উইকেট পকেটে ভরেন।
ফলে প্রচণ্ড চাপে পড়ে অস্ট্রেলিয়ার সামনে তখন হয়তো প্রথম ইনিংসের চিত্রটাই ভেসে উঠেছিল। এমনকি গতকাল শেষ বিকালে ক্যাচ এল শরীর বরাবর। সরে গেলেন সৌম্য সরকার, বেঁচে গেলেন ডেভিড ওয়ার্নার। ইমরুল কায়েসের কছে ক্যাচ এলো সোজাসুজি। হাতে নিলেন, কিন্তু পারলেন না জমাতে। বাঁচলেন স্টিভেন স্মিথ। দুটি ক্যাচ ছেড়ে বাংলাদেশের হতাশা। এই দুজন টিকে গেলেন বলেই টিকে থাকল অস্ট্রেলিয়ার আশা। বিশেষ করে বাংলাদেশের হতাশাটাকে কয়েক গুন বাড়িয়ে দিলেন ডেভিড ওয়ার্নার। ২৬৫ রানের লক্ষ্যে খেলতে নেমে চেনা রূপে ফিরে শুধু চাপ কাটালেন না তিনি, সঠিক পথেও ফেরালেন অস্ট্রেলিয়াকে। ওয়ার্নারের হাফসেঞ্চুরির সঙ্গে অধিনায়ক স্টিভেন স্মিথের ধৈর্যশীল ব্যাটিংয়ে তৃতীয় দিন শেষ করেছে সফরকারীরা ২ উইকেটে করেছে ১০৯ রানে। জয়ের জন্য এখনও দরকার তাদের ১৫৬ রান, বাংলাদেশের প্রয়োজন ৮টি উইকেট।
গতকাল শেষ বিকালে ইনিংসের শুরুতেই ধাক্কা দিয়েছিলেন সাকিব-মিরাজ। এক রানের মধ্যে আউট হয়ে গেলেন ম্যাথু রেনশ ও ওসমান খাজা। ২৮ রানে ২ উইকেট হারিয়ে প্রথম ইনিংসের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছিল অস্ট্রেলিয়া। তবে পাল্টা আক্রমণ ও ভাগ্যের সহায়তায় সে ধাক্কা সামলে নিয়েছে অস্ট্রেলিয়া। তবে মিরপুরের পিচ ও অস্বাভাবিক আচরণ করছে। গত দুই দিনের ‘আনপে¬য়েবল’ শেষ সেশন কোথায় মিলিয়ে গেল কে জানে! ফ্ল্যাট উইকেটে একের পর এক হাফ পিচ ডেলিভারির শাস্তি দিয়েছেন ওয়ার্নার-স্মিথ। সিরিজের প্রথম ফিফটি তুলে নিয়েছেন ওয়ার্নার। এই ওপেনার অপরাজিত আছেন ৭৫ রানে। অধিনায়ক স্মিথের রান ২৫।
এর আগে চা বিরতির পরপরই ২২১ রানে অলআউট হয়েছে বাংলাদেশ। ২৬৫ রানের টার্গেট দিয়েও হাসিখুশি দেখাচ্ছিল বাংলাদেশকে। মিরপুরে সবচেয়ে বেশি রান তাড়া করার রেকর্ডটা যে মাত্র ২০৮ রানের।

লক্ষ্য আরও বড় দিতে পারত বাংলাদেশ। কিন্তু মুশফিকুর রহিম অদ্ভুতুড়ে আউট হয়েই ঝামেলা বাধিয়ে দিয়েছেন। ৪১ রান করেছেন অধিনায়ক। কিন্তু ননস্ট্রাইক প্রান্তে ক্রিজে না থাকার মাশুল দিয়েছেন মুশফিক। লায়নের হাত ছুঁয়ে বল স্টাম্পে যাওয়ায় রানআউট হয়ে ফিরেছেন। এরপর চার বল খেলে কোনো রান না করেই ওয়েডের হাতে ক্যাচ দিয়ে ফিরেছেন নাসির হোসেন। সাব্বির খেলছিলেন নিজের মারমুখী ভঙ্গিতেই। কিন্তু আম্পায়ারের ভুল সিদ্ধান্তে তাঁকেও ফিরতে হয়েছে। প্রথম ইনিংসের ভুলের পুনরাবৃত্তি না করতেই হয়তো আর রিভিউ নিলেন না। শূন্য রানে তিন উইকেট হারিয়ে ফেলে বাংলাদেশ। এরপর মিরাজ আর শফিউলেই দুই শ পেরোয় স্বাগতিক দল।
প্রথম সেশনেই ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নেয় বাংলাদেশ। তাইজুল ইসলাম আর ইমরুল কায়েস ফিরে গেলেও আক্রমণটা সচল রেখেছিলেন তামিম ইকবাল ও অধিনায়ক মুশফিকুর রহিম। প্রথম ইনিংসের মতো এই ইনিংসেও দারুণ ধারালো তামিমের ব্যাট। মুশফিকও যেন প্রতিজ্ঞাবদ্ধ ছিলেন প্রথম ইনিংসের বড় রান না করার দুঃখটা ঘোচাতে। তবে মধ্যাহ্নবিরতির পরই ধাক্কা খেয়েছে বাংলাদেশ। তামিমের পর দ্রুত আউট হয়েছেন সাকিব আল হাসানও। তামিম আউট হয়েছেন ৭৮ রানে। ১৫৫ বলের ইনিংসে ছিল ৮টি চার। প্রথম সেশনের দুই ঘণ্টায় ৮৭ রান তুলেছিল বাংলাদেশ।
সকালে তাইজুলের ফেরাটা খুব অপ্রত্যাশিত ছিল না। ‘নাইটওয়াচম্যান’ হিসেবে ভালোই খেলে গেছেন তিনি। ২২ বল খেলে ৪ রান করেছেন। কিন্তু সত্যিকারের ধাক্কা হয়ে আসে ইমরুলের উইকেটটি। নাথান লায়নের বলে বারবার পরাস্ত হচ্ছিলেন। অফস্টাম্পের ওপর দুর্বলতাটা বোঝা যাচ্ছিল। ইমরুলের সেই দুর্বল জায়গায় একের পর এক বল করে ফল পেলেন অস্ট্রেলীয় অফস্পিনার। ১৮ বল খেলে ২ রান করে ফিরেছেন ইমরুল। ¯ি¬পে তাঁর ক্যাচটি নিয়েছেন ডেভিড ওয়ার্নার।
দিনের প্রথম বলেই ব্যাকওয়ার্ড পয়েন্ট দিয়ে প্যাট কামিন্সকে সীমানাছাড়া করেছিলেন তামিম ইকবাল। চতুর্থ বলে আবার ¯ি¬প ও গালির ফাঁক গলে বাউন্ডারি। দিনের শুরুটা একেবারে মনের মতোই হয়েছিল বাংলাদেশের। কামিন্সের বলে তামিমের বিরুদ্ধে একটি এলবিডবি¬উর জোরালো আবেদন হয়েছিল। মাঠের আম্পায়ার আলিম দার তাতে ‘না’ বলে দেওয়ায় অস্ট্রেলীয় অধিনায়ক স্টিভ স্মিথ রিভিউও নিয়েছিলেন, কিন্তু টিভি আম্পায়ার ইয়ান গোল্ড নিশ্চিত করেছেন, আলিম দারের সিদ্ধান্ত ঠিকই ছিল।
তবে উপমহাদেশে চতুর্থ ইনিংসে ব্যাটিংয়ে নেমে অস্ট্রেলিয়া যে কখনো জিততে পারেনি, তা নয়। চতুর্থ ইনিংসে টার্গেট তাড়া করতে নেমে এখানে সাতবার জিতেছে অস্ট্রেলিয়া। যার মধ্যে সর্বোচ্চ ৩০৭ রান তাড়া করে জয়ের রেকর্ডটা বাংলাদেশের বিপক্ষেই, ২০০৬ ফতুল¬া টেস্টে। কিন্তু তাঁদের বাকি ছয়টি রান তাড়া করে জয়ের নজির আশা জোগাচ্ছে বাংলাদেশকে। সব কটি জয়ই এসেছে দুই শর নিচের লক্ষ্যে। অর্থাৎ উপমহাদেশে চতুর্থ ইনিংসে অস্ট্রেলিয়া মাত্র একবারই দুই শর বেশি রান তাড়া করে জিততে পেরেছে।
বাংলাদেশকে আশা দেখাচ্ছে আরও একটি পরিসংখ্যান। ম্যাচের দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাটিংয়ে নেমে ২১৭ রান করেছে অস্ট্রেলিয়া; যা গোটা ম্যাচে এখন পর্যন্ত সর্বনিম্ন সংগ্রহ। বাংলাদেশের ছুড়ে দেওয়া ২৬৫ রানের টার্গেট এ ম্যাচের সর্বোচ্চ সংগ্রহ। চতুর্থ ইনিংসে অস্ট্রেলিয়াকে তাড়া করতে হচ্ছে ম্যাচের সবচেয়ে বড় টার্গেট। আর উপমহাদেশের মাটিতে ১০টি টেস্ট খেলুড়ে দেশের মধ্যে অস্ট্রেলিয়ার দলগত ব্যাটিং পারফরম্যান্সই সবচেয়ে বাজে (২৬.৬৯)।
তবে উপমহাদেশের বাইরে গোটা এশিয়া বিচার করলে জয়ের আশা করতেই পারে অস্ট্রেলিয়া। এশিয়ায় তিন শর নিচে টার্গেট তাড়া করতে নেমে তাঁরা হেরেছে মাত্র একবার। মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামে সর্বশেষ চারটি চতুর্থ ইনিংসে দলগুলোর (১৬৪, ২২১, ৭/১০১ ও ১৬৭) সংগ্রহও অস্ট্রেলিয়ার পক্ষে নয়। মিরপুরে চতুর্থ ইনিংসে সর্বোচ্চ ২০৮ রান তাড়া করে জিতেছে ইংল্যান্ড।
সংক্ষিপ্ত স্কোর:
বাংলাদেশ প্রথম ইনিংস: ২৬০
অস্ট্রেলিয়া প্রথম ইনিংস: ২১৭
বাংলাদেশ দ্বিথীয় ইনিংস: ২২১
অস্ট্রেলিয়া দ্বিতীয় ইনিংস: (লক্ষ্য ২৬৫) ৩০ ওভারে ১০৯/২ (ওয়ার্নার ৭৫*, রেনশ ৫, খাওয়াজা ১, স্মিথ ২৫*; মিরাজ ১/৫১, নাসির ০/২, সাকিব ১/২৮, তাইজুল ০/১৭, মোস্তাফিজ ০/৮)।