৩% পত্রিকায় ওয়েজবোর্ড, তাতেও সন্দেহ

 

শহীদুল ইসলাম, জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক>
বাংলাদেশের নিবন্ধিত সংবাদপত্রগুলোর মধ্যে ৩ দশমিক ০৬৫ শতাংশ অষ্টম ওয়েজবোর্ড বাস্তবায়নের তথ্য সরকারকে জানিয়েছে।

অষ্টম মজুরি কাঠামো ঘোষণার চার বছর পরে এসে দেশের ৯১টি পত্রিকা এই বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের দাবি করলেও সরকারের ভেতরেই এ নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

শিগগিরই নবম ওয়েজবোর্ড ঘোষণা করা হবে জানিয়ে তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু বলছেন, অধিক সংখ্যক পত্রিকায় কীভাবে ওয়েজবোর্ড বাস্তবায়ন করা যায় সাংবাদিক নেতাসহ সংশ্লিষ্ট সবার সেই বুদ্ধি করা উচিৎ। কারণ বেশিরভাগ সাংবাদিকই ওয়েজবোর্ডের অধীনে বেতন-ভাতা পাচ্ছেন না।

প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের বাইরে পোশাক কারখানার শ্রমিক এবং সংবাদপত্রকর্মীদের বেতন-ভাতা সরকার নির্ধারণ করে দেয়।

২০১৩ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর সংবাদপত্র ও বার্তা সংস্থাগুলোর কর্মীদের বেতন গড়ে তাদের মূল বেতনের ৭৫ শতাংশ বাড়িয়ে অষ্টম মজুরি কাঠামো ঘোষণা করে সরকার।

মোহাম্মদ ইসতাক হোসেন

চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তরের (ডিএফপি) তথ্যানুযায়ী, দেশে নিবন্ধিত পত্র-পত্রিকার সংখ্যা ২ হাজার ৯৬৯টি। এর মধ্যে ঢাকা থেকে ৪৩৯টি এবাং মফস্বলের ৭১১টি দৈনিক পত্রিকার নিবন্ধন আছে।

এছাড়া সারা দেশে ১ হাজার ১৬৭টি সাপ্তাহিক পত্রিকা, ৩টি অর্ধসাপ্তাহিক, ২১২টি পাক্ষিক, ৩৯৭ মাসিক, ৭টি দ্বিমাসিক, ২৮টি ত্রৈমাসিক, একটি চতুর্মাসিক, দুইটি ষান্মাসিক এবং দুইটি বার্ষিক পত্রিকার নিবন্ধন রয়েছে।

আর দেশে মিডিয়া তালিকাভুক্ত পত্র-পত্রিকার রয়েছে ৬২৪টি। এরমধ্যে ঢাকার ২০৩টি এবং মফস্বলের ২৭৬টি দৈনিক পত্রিকা।

এছাড়া সারা দেশে ৯৯টি সাপ্তাহিক পত্রিকা, ২০টি পাক্ষিক পত্রিকা, ২৪টি মাসিক পত্রিকা, একটি ত্রৈমাসিক এবং একটি ষান্মাসিক পত্রিকা মিডিয়া তালিকাভুক্ত।

মিডিয়া তালিকাভুক্ত হওয়ায় ৬২৪টি পত্র-পত্রিকার সরকারি সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার অধিকার আছে। ৬২৪টি পত্র-পত্রিকার মধ্যে ঢাকার ৪৪টি ও মফস্বলের ৩২টি বাংলা পত্রিকা এবং ঢাকার ১৫টি ইংরেজি পত্রিকা অষ্টম মজুরি বোর্ড বাস্তবায়ন করছে বলে জানিয়েছে।

অষ্টম ওয়েজবোর্ড ঘোষণার পর ২০১৩ সালের ৩০ ডিসেম্বর অষ্টম মজুরি বোর্ডের সুপারিশ বাস্তবায়নে সরকারি কর্মকর্তা, সাংবাদিক নেতা এবং সংবাপত্রের মালিক পক্ষের প্রতিনিধিদের নিয়ে ত্রিপক্ষীয় মনিটরিং টিম গঠন করে তথ্য মন্ত্রণালয়।

এই টিমের মেয়াদ শেষ হলে গত বছরে ১০ নভেম্বর ডিএফপি মহাপরিচালককে আহ্বায়ক করে নয় সদস্যের মনিটরিং টিম পুনর্গঠন করা হয়।

ওই টিমে তথ্য মন্ত্রণালয়ের উপসচিব/জ্যেষ্ঠ সহকারী সচিব (প্রেস-২/১), নোয়াবের কোষাধ্যক্ষ মতিউর রহমান চৌধুরী, নোয়াবের একজন প্রতিনিধি, বিএফইউজের সভাপতি মনজুরুল আহসান বুলবুল, বিএফইউজের মহাসচিব ওমর ফারুক, বাংলাদেশে সংবাদপত্র কর্মচারী ফেডারেশনের সভাপতি মো. মতিউর রহমান তালুকদার এবং বাংলাদেশ ফেডারেল ইউনিয়ন অব নিউজ পেপার ওয়ার্কার্সের সভাপতি মো. আলমগীর হোসেনকে সদস্য করা হয়। আর সদস্য সচিবের দায়িত্বে আছেন ডিএফপির উপ-পরিচালক (বিজ্ঞাপন)।

এই মনিটরিং টিমকে অষ্টম মজুরি বোর্ড যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে কি না তা পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও তদারকি এবং সংবাদপত্রে সাংবাদিক, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সবশেষ সংবাদপত্র মজুরি বোর্ড রোয়েদাদ অনুযায়ী সঠিকভাবে বেতনভাতা পরিশোধ করা হচ্ছে কি না তা তদারকি করতে বলা হয়েছিল।

এই টিমের আহ্ববায়ক ও ডিএফপির মহাপরিচালক মোহাম্মদ ইসতাক হোসেন মঙ্গলবার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, কোনো অভিযোগ থাকলে তদারকি টিম সেগুলো নিয়ে কাজ করে।

যেসব পত্রিকা অষ্টম ওয়েজবোর্ড বাস্তবায়ন করেনি তাদের চাপ দেওয়া হয় না জানিয়ে তিনি বলেন, “যারা বাস্তবায়ন করতে না পারে ওইসব পত্রিকার সাংবাদিকরাই তো প্রোটেস্ট করেন। আর যদি প্রোটেস্ট না করেন তারাই তো বলেন আমরা দিচ্ছি। সাংবাদিকরা যদি স্বীকার করেন আমরা পাই, আসলে তো পাচ্ছে না, তাহলে তো আমাদের কিছু করার থাকে না, বেশিরভাগ তো তাই হয়।”

৯১টি পত্রিকা আসলেই অষ্টম ওয়েজবোর্ড বাস্তবায়ন করেছে কি না ‘প্রয়োজন হলে’ তা তদন্ত করে দেখা হয় জানিয়ে ইসতাক বলেন, “আসলেই করল, না কাগজে করে বাস্তবে করে নাই সেটা তো তাদের ব্যাপার।

“কারণ ওটা ইনভেস্টিগেশন করতে হয় জিজ্ঞেস করে, ডকুমেন্টস-নথি দেখে। ওগুলো সব ঠিকই থাকে কিন্তু আসলে বাস্তবায়ন করে না; কমপ্লেন না দিলে তদন্তও করা যায় না।”

ডিএফপি মহাপরিচালক বলেন, “মনিটরিং টিমের সদস্যরা ওয়েজবোর্ড বাস্তবায়নে চাপ দেন না। তারা মূলত কোনো আবেদন করলে তার ভিত্তিতে কাজ করেন, তদন্ত হয়, পরিদর্শনে যান, ব্যবস্থা নেন।”

যেসব পত্রিকায় অষ্টম ওয়েজবোর্ড

ঢাকার বাংলা পত্রিকা: বাংলাদেশ প্রতিদিন, প্রথম আলো, কালের কণ্ঠ, যুগান্তর, আমাদের সময়, ইত্তেফাক, জনকণ্ঠ, সমকাল, ভোরের কাগজ, মানবকণ্ঠ, সকালের খবর, ভোরের পাতা, আলোকিত বাংলাদেশ, আমাদের অর্থনীতি, বণিক বার্তা, ইনকিলাব, আমার সংবাদ, প্রতিদিনের সংবাদ, মানব জমিন, সংবাদ, সংবাদ প্রতিদিন, ভোরের ডাক, ঢাকা প্রতিদিন, নবচেতনা, খবর, জনতা, বাংলাদেশের খবর, আমার বার্তা, বাংলাদেশ সময়, আজকের সংবাদ, দিন পরিবর্তন, বর্তমান, কালবেলা, ঢাকা রিপোর্ট, খোলা কাগজ, অর্থনীতির কাগজ, নওরোজ, খবরপত্র, ঢাকার ডাক, বাংলার দূত, নবরাজ, সোনালী খবর, মুক্ত খবর এবং প্রথম কথা।

ঢাকার ইংরেজি পত্রিকা: দ্য ডেইলি স্টার, ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস, ডেইলি সান, দা এশিয়ান এজ, ঢাকা ট্রিবিউন, দ্য ডেইলি অবজারভার, নিউ এজ, দ্য নিউ নেশন, দা ইন্ডিপেনডেন্ট, দ্য নিউজ টুডে, আওয়ার টাইম, দ্য বাংলাদেশ টুডে, দ্য বাংলাদেশ নিউজ, দ্য পিউপুলস টাইমস এবং ডেইলি ইন্ডাস্ট্রি।

মফস্বলের পত্রিকা: নারায়ণগঞ্জের দৈনিক যুগের চিন্তা, নরসিংদীর দৈনিক গ্রামীণ দর্পণ, মুন্সিগঞ্জের দৈনিক মুন্সিগঞ্জের কাগজ, ময়মনসিংহের দৈনিক স্বদেশ সংবাদ, দৈনিক আজকের ময়মনসিংহ, দৈনিক সবুজ ও দৈনিক আজকের বাংলাদেশ, টাঙ্গাইলের দৈনিক মজলুমের কণ্ঠ ও দৈনিক প্রগতির আলো, চট্টগ্রামের দৈনিক পূর্বকোণ, দৈনিক আজাদী, দৈনিক পূর্বদেশ ও দৈনিক সুপ্রভাত বাংলাদেশ, কুমিল্লার দৈনিক আমাদের কুমিল্লা, দৈনিক কুমিল্লার কাগজ ও দৈনিক শিরোনাম, রাজশাহীর দৈনিক সানসাইন, বগুড়ার দৈনিক করতোয়া ও দৈনিক চাঁদনীবাজার, রংপুরের দৈনিক পরিবেশ, দিনাজপুরের দৈনিক উত্তর বাংলা, খুলনার দৈনিক জন্মভূমি, দৈনিক প্রবাহ ও দৈনিক সময়ের খবর, যশোরের দৈনিক গ্রামের কাগজ, দৈনিক স্পন্দন, দৈনিক সমাজের কথা ও দৈনিক কল্যাণ, বরিশালের দৈনিক আজকের বার্তা, দৈনিক আজকের পরিবর্তন ও দৈনিক মতবাদ এবং ঝালকাঠির দৈনিক শতকণ্ঠ।

৯৫ ভাগ সাংবাদিক ওয়েজবোর্ড পান না জানিয়ে সম্প্রতি তথ্যমন্ত্রী বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমার মনে হয় কীভাবে (ওয়েজবোর্ড) পাওয়া যায় সেই বুদ্ধি উনাদের (সাংবাদিক নেতা) করা উচিত, মন্ত্রী হিসেবে আমারও করা উচিত।

“মনিটরিং সেলের যারা নেতৃবৃন্দ আছেন তারা, আমার অফিসার, আমিসহ কেন ৯৫ ভাগ সংবাদপত্রে ওয়েজবোর্ড দিতেই পারছি না?”

তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু

তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু

ওয়েজবার্ডে ইলেকট্রনিক মিডিয়ার কর্মীদের যুক্ত করতে তাদের বেতন-ভাতা কেমন হতে পারে সে বিষয়ে একটা প্রস্তাবনা ওইসব গণমাধ্যমের সাংবাদিকদের কাছে চেয়েও এখনও তা পাওয়া যায়নি বলে জানান ইনু।

তিনি বলেন, “বেতন তো আমি দেব না। টেলিভিশন কর্তৃপক্ষ এবং সাংবাদিকদের উভয়ের সম্মতিতে একটা বেতন কাঠোমো দেবে… আমি কি হাওয়ার উপরে ওয়েজবোর্ড দিয়ে দেব? অনলাইন পত্রিকার কি হবে? এই জটিল প্রশ্নের উত্তরগুলো তো সাংবাদিক নেতারা দেবেন। অনলাইন পত্রিকার যারা সাংবাদিক তারা কি ওয়েজবোর্ডের আওতায় আসবে?”

নবম ওয়েজবোর্ড গঠনের ৮০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে জানিয়ে ইনু বলেন, “ওয়েজবোর্ড আমরা দেব। মালিকপক্ষ এখনও নাম দেয়নি, মালিকপক্ষ যদি নাম না দেয় সেক্ষেত্রে সরকার মালিকদের প্রতিনিধি মনোনয়ন দিতে পারবে। কিন্তু প্রতিনিধি দেবে না বলে নোয়াব সিদ্ধান্ত দেয়নি।

“প্রতিনিধি না দিলে সরকার মনোনীত মালিক প্রতিনিধি নিয়ে ওয়েজবোর্ড গঠনের যে প্রক্রিয়া আমরা সেই পথে যাব। আমি মনে করি প্রধানমন্ত্রীর একটু পরামর্শ নেওয়া উচিত। সাংবাদিক নেতাদেরও পরামর্শ নেওয়া উচিত কারণ আমরা কার্যকরি ওয়েজবোর্ড চাই, যে ওয়েজবোর্ডটা সাংবাদিকদের উপকার দেবে।”

আরও টিভি আসছে

বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের অনুমোদন পেতে তথ্য মন্ত্রণালয়ে দুইশর বেশি আবেদন জমা আছে জানিয়ে তথ্যমন্ত্রী বলছেন, সরকার চাইলে আরও টিভির অনুমোদন দিতে পারে।

“সরকার বিবেচনা করলে দেবে, এটা নিয়ে আমাদের কোনো মাথা ব্যথা না। কেউ যদি মনে করে টিভির লাইসেন্স নিয়ে ব্যবসা করতে পারবেন, করেন। না করতে পারলে আমার কি? আমরা তো কাউকে জোর করে দিচ্ছি না। দুইশরও বেশি আবেদন পড়ে আছে। প্রত্যেকে একটা করে টিভি চায়। বাংলাদেশের সব নাগরিকই একটা করে টিভি লাইসেন্স চায়।”

সরকারি অনুমোদন পাওয়া ৪৪টি বেসরকারি টেলিভিশনের মধ্যে সম্প্রচারে আছে ২৬টি। একটি টিভি পরীক্ষামূলক সম্প্রচার চালাচ্ছে, দুটি টেলিভিশনের লাইসেন্স স্থগিত রয়েছে।

বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের সাংবাদিক, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য কোনো বেতন কাঠামো নির্ধারণ করা নেই।