রোহিঙ্গারা কী চায়?

সুলাইমান নিলয়, কক্সবাজার থেকে ফিরে বিডিনিউজ>
মিয়ানমারে ‘বন্দি জীবন’ থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে এসে ‘মুক্তির স্বাদ’ পেলেও স্বভূমেই ফিরতে চান রোহিঙ্গা শরণার্থীরা।

নিপীড়নের মুখে নাফ নদী পেরিয়ে পালিয়ে এসেছেন বাংলাদেশে; কিন্তু সেতারা বেগমের মন পড়ে আছে মংডু এলাকার সারাপাড়ায়, যেখানে তার বসতভিটা- ছবি: মোস্তাফিজুর রহমানতবে মিয়ানমারের পূর্ণ নাগরিক হিসেবে অধিকার নিয়ে বসতভিটায় ফিরতে চাইছেন তারা; যাতে পরবর্তী সময়ে একই অভিজ্ঞতার মুখোমুখি তাদের আবার না হতে হয়।

নির্যাতনের মুখে রাখাইন রাজ্য থেকে পালিয়ে আসা নূর আলম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, বাংলাদেশে এসে তারা ‘মুক্তির স্বাদ’ পেয়ে গেছেন।

“তারা (মিয়ানমারের কর্মকর্তা) বলে, তোমরা এদেশের লোক না। আমি রোহিঙ্গা, ওরা আমাদের বাঙালি বলে।”

সুদূর অতীতকাল থেকে বার্মার আরাকান রাজ্যে বসবাস করে এলেও রোহিঙ্গাদের নিজেদের নাগরিক হিসেবে মেনে নিতে নারাজ মিয়ানমার সরকার। বৌদ্ধপ্রধান মিয়ানমারের নাগরিকত্ব আইনে এই মুসলিম জনগোষ্ঠীকে অস্বীকার করা হয়েছে।

সহিংসতায় পালিয়ে এলেও মিয়ানমারে ফিরতে চান বালুখালীর বাসিন্দা ইন্দ্র রুদ্র, যার মিয়ানমারের নাগরিকত্ব রয়েছেরাখাইন রাজ্যের মোট জনসংখ্যার ৪০ শতাংশ রোহিঙ্গা সেখানে কী অবস্থায় থাকছেন, তা ফুটে ওঠে মংডু জেলার বলিবাজারের বাসিন্দা নূর আলমের কথায়।

“ওখানে তো আমরা জেলে থাকি, আমাদেরকে বন্দি রাখছে। সরকারের ডকুমেন্ট না থাকলে কোথাও যেতে পারি না। এক গ্রাম থেকে আরেক গ্রামে গেলেও চেয়ারম্যানের অনুমতি লাগে। তাহলে আমরা খাঁচার পাখি না?”

শরণার্থী হয়ে বাংলাদেশে এলেও এখানে ‘ঠিকভাবে ঘুমাতে পারছেন’ জানিয়ে এই রোহিঙ্গা বলেন, “আমাদেরকে নাগরিক বলে মেনে নিলে যাব।”

রাষ্ট্রহীন রোহিঙ্গারা বিভিন্ন সময়ে নির্যাতনের শিকার হয়ে বাংলাদেশে আসছে। ১৯৭৮ সাল থেকে শুরুর পর গত বছর পর্যন্ত রোহিঙ্গার সংখ্যা ৪ লাখ ছাড়ায়।

গত ২৫ অগাস্ট সেনা ও পুলিশ চৌকিতে হামলার পর রাখাইনে সেনা অভিযান শুরুর পর বাংলাদেশ সীমান্তে নামে রোহিঙ্গাদের ঢল। নতুন শরণার্থীর সংখ্যা ইতোমধ্যে চার লাখ ছাড়িয়েছে।

বসত ভিটা ছেড়ে শরণার্থী জীবনের শুরু; উখিয়ার পালংখালী ইউনিয়নের ছবুল্লাকাটা এলাকার পাহাড়ের গাছ কেটে নতুন ঘর তৈরি করছে রোহিঙ্গারা- ছবি: মোস্তাফিজুর রহমান

বসত ভিটা ছেড়ে শরণার্থী জীবনের শুরু; উখিয়ার পালংখালী ইউনিয়নের ছবুল্লাকাটা এলাকার পাহাড়ের গাছ কেটে নতুন ঘর তৈরি করছে রোহিঙ্গারা- ছবি: মোস্তাফিজুর রহমান

শরণার্থীরা বলছেন, রাখাইনে অভিযানে নির্বিচারে হত্যাকাণ্ড ও ধর্ষণ ঘটাচ্ছে সেনা সদস্যরা, জ্বালিয়ে দিচ্ছে ঘর। মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ‘জাতিগত নির্মূল অভিযান’ চালাচ্ছে বলে জাতিসংঘের বক্তব্য।

বাংলাদেশ সীমান্তে নাফ নদীর ওপারে মংডুর উত্তরে সাহেব বাজারের মো. ইউসুফ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন মিয়ানমারে তাদের বঞ্চনার কথা।

২০০৪ সালে দশম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হওয়ার পর উচ্চ শিক্ষার ইচ্ছা থাকলেও কোনো কলেজে ভর্তি হতে পারেননি তিনি। রোহিঙ্গা হওয়ায় চাকরির আশা বাদ দিয়ে ব্যবসায় নামলেও দুর্গতির শেষ হয়নি তার।

ইউসুফ বলেন, “ব্যবসার কাজে মংডু যেতেও বাধার মুখে পড়তে হয়। কিছু দিন ধরে সমস্যা আরও বেড়েছিল।”

২০১২ সালে পুরনো পরিচয়পত্র নেওয়ার পর জীবন আরও জটিল হয়ে পড়ে বলে জানান এই রোহিঙ্গা।

তিনি বলেন, চেকপোস্টে পড়লেই এক হাজার টাকা জরিমানা। এভাবে এক যাত্রায় ১০টি চেকপোস্টে পড়লে ১০ বারই জরিমানা দিতে হয়। যত দূরেই আর যে কাজেই যেতে হয়,তাদের দিনে দিনে ফিরতে হয় বাসায়।

 

নাগরিকত্বের স্বীকৃতি না থাকায়ই এই দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে জানিয়ে ইউসুফ বলেন, “আমরা আমাদের দেশে ফিরতে চাই। নাগরিকত্ব নিয়ে সেখানে যেতে চাই।”

রাখাইন সঙ্কট নিয়ে গঠিত জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনান নেতৃত্বাধীন কমিশন রেহিঙ্গাদের নাগরিকত্বের স্বীকৃতি দেওয়ার সুপারিশ করেছেন। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে রোহিঙ্গাদের ফেরত নিয়ে মিয়ানমারে একটি ‘সেইফ জোন’ প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে মঙ্গলবার জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে মিয়ানমারের নেত্রী অং সান সু চি ‘যাচাই’ করে শরণার্থীদের ফেরত নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। তবে রোহিঙ্গা শব্দটি বলেননি তিনি, সেনা নির্যাতনের বিষয়েও থেকেছেন নীরব।

মংডুর নলবুইন্যা পাড়ায় স্বচ্ছল কৃষক মোহাম্মদ হোসেন (৬০) বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে জানান,

রোহিঙ্গাদের ভোটাধিকার যখন ছিল, তখন ভোট দিতেন সু চিকে।

কিন্তু এবার সেই সু চির আমলেই দেশ ছাড়তে হওয়ায় গণতন্ত্রের নেত্রীর উপরও ক্ষোভ হোসেনের।

নূর আলম ও ইউসুফের মতো হোসেনও বলেন, সমস্যা সমাধানে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব দিতে হবে। সেটা দিলে তিনিও দেশে ফিরবেন।

বারবার সহিংসতায় দেশছাড়া রোহিঙ্গাদের সবচেয়ে বড় আবাস এখন বাংলাদেশ; মিয়ানমারের থাকা রোহিঙ্গার চেয়ে বাংলাদেশে থাকা শরণার্থীর সংখ্যা এখন বেশি।

সহিংসতার পর মুসলিম রোহিঙ্গাদের সঙ্গে পালিয়ে আসাদের মধ্যে রয়েছেন হিন্দুরাও। তাদের একজন চিকনছড়ির সোনারাম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, শান্তি ফিরলে তিনিও ফিরতে চান স্বভূমে।

 

এই সহিংসতায় দুই ছেলেকে হারানো মিয়ানমারের বালুখালীর বাসিন্দা ইন্দ্র রুদ্রও ফিরতে চান মিয়ানমারে; তবে চান নিরাপত্তার নিশ্চয়তা।

‘কালো কাপড়’ পরা যে গোষ্ঠী হামলা করেছিল, তারা কোনোদিন ফিরে আসবে না, এমন নিশ্চয়তা পেলে তারা ফিরে যেতে চান।

তবে এদের থেকে ভিন্ন মত পোষণ করছেন চিকনছড়ির নিরঞ্জন পাল। তিনি তৃতীয়বার বাংলাদেশে শরণার্থী হয়ে এলেন। ১৯৭৮ এবং ১৯৯১ সালে তিনি বাংলাদেশে শরণার্থী হয়ে এসেছিলেন। ৭৮ সালে কয়েক মাস থেকে তিনি দেশে ফিরেছিলেন। ১৯৯১ সালে বাংলাদেশে ছিলেন তিন বছর।

এবারের মতো ভয়াবহ পরিস্থিতি আর দেখেননি জানিয়ে নিরঞ্জন বলেন, তার দেশে আর কোনোদিন শান্তি ফিরবে বলে তিনি বিশ্বাস করেন না। তাই ফিরতেও চান না তিনি।