নিরাপত্তা পরিষদকে বাংলাদেশ, মিয়ানমার থেকে নজর যেন না সরে

বিডিনিউজ>সীমান্তে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর তৎপরতা জোরদারের কথা তুলে ধরে রোহিঙ্গা সংকটের ‘যৌক্তিক সমাধান’ না হওয়া পর্যন্ত বিষয়টি থেকে দৃষ্টি না সরাতে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশ।
জাতিসংঘে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মাসুদ বিন মোমেন বলেন, গত তিন দশকের অভিজ্ঞতায় এটা স্পষ্ট যে, আন্তর্জাতিক মহলের নজর সরে গেলেই দ্বিপক্ষীয় (মিয়ানমার ও বাংলাদেশ) আলোচনা গতি হারিয়ে ফেলে।
চলমান মানবিক সংকট সরেজমিনে দেখতে ১৫ সদস্যের নিরাপত্তা পরিষদকে মিয়ানমার ও বাংলাদেশ সফরের আহ্বান জানান তিনি।
আট বছরের মধ্যে প্রথম মিয়ানমার নিয়ে বৃহস্পতিবার জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে উন্মুক্ত অধিবেশন বসে।
সেখানে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত বলেন, “দমন-পীড়নের মুখে স্থানান্তরিত মিয়ানমারের নাগরিকদের তাদের নিজেদের আবাসভূমিতে নিরাপদে ও সসম্মানে ফেরত যাওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।”
রাখাইনের উত্তরাঞ্চলে রোহিঙ্গাদের উপর যে সহিংসতা হয়েছে তা মধ্যাঞ্চলেও বিস্তৃত হতে পারে এবং সেখানে আড়াই লাখ রোহিঙ্গা বাস্তুচ্যুত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে বলে এই অধিবেশনে জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস সতর্ক করেন।
জাতিসংঘে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত নিকি হেলি রাখাইনে বেসামরিক রোহিঙ্গাদের হত্যা ও ধর্ষণের মতো মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় মিয়ানমারের সেনা নেতৃত্বকে বিচারের মুখোমুখি করার দাবি জানিয়েছেন।
তবে মিয়ানমার বরাবরের মতোই রোহিঙ্গাদের উপর নির‌্যাতনের অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। বিদ্রোহীদের হামলার পাল্টায় তার দমন অভিযান চালাচ্ছে।
এর মধ্যে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ভাষণে বলেছেন, “সংকটের গোড়া মিয়ানমারে, সমাধানও খুঁজতে হবে মিয়ানমারে।”
মোমেন বলেন, জটিল এই পরিস্থিতি মোকাবেলায় শান্তিপূর্ণ সমাধানের জন্য মিয়ানমার ও আন্তর্জাতিক মহলের সঙ্গে মিলে কাজ করতে বাংলাদেশ সব সময় প্রস্তুত ।
তবে এই সংকটের শুরু থেকে বাংলাদেশ বিষয়ে মিয়ানমারের নেতারা যে সব তুলছেন, সেগুলো নাকচ করে দিয়ে তিনি বলেন, ‘মুসলিমরা হিন্দুদের হত্যা করছে বা মুসলিমারই মুসলিমদের হত্যা করছে’ এধরনের বিবৃতিগুলোকে বেসামরিক মানুষের জীবন রক্ষায় সরকারে ব্যর্থতা বা উদাসিনতা হিসেবে ধরে নিতে হবে।
মিয়ানমারে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে অভিযোগ তুলে সেখানে সেখানে নিরাপত্তা পরিষদের ‘ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং মিশন’ পাঠানোর আহ্বান জানান বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত।
তিনি বলেন, নিরাপত্তা পরিষদের জানা থাকা দরকার, মিয়ানমার অগাস্টের প্রথম সপ্তাহ থেকে বাংলাদেশ সীমান্তের কাছে দুই ডিভিশন সদস্য মোতায়েন করেছে।
নিচে পুড়ছে বাড়িঘর, উপরে মিয়ানমারের আকাশে উড়ছে হেলিকপ্টার। শাহপরীর দ্বীপ থেকে ১১ সেপ্টেম্বর তোলা ছবি। ছবি: মোস্তাফিজুর রহমান
নিচে পুড়ছে বাড়িঘর, উপরে মিয়ানমারের আকাশে উড়ছে হেলিকপ্টার। শাহপরীর দ্বীপ থেকে ১১ সেপ্টেম্বর তোলা ছবি। ছবি: মোস্তাফিজুর রহমান
“শূন্য রেখা থেকে ২০০ মিটারের মধ্যে মিয়ানমার সেনাদের দেখা গেছে। সেই সঙ্গে সীমান্তের কাছে ভারি অস্ত্র ও আর্টিলারি বসানো হয়েছে। মিয়ানমারের হেলিকপ্টার বা ড্রোন মোট ১৯ বার বাংলাদেশের আকাশসীমা লঙ্ঘন করেছে। সব শেষ লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে পরশু দিন।”
সেই সঙ্গে রোহিঙ্গাদের ফেরায় বাধা দিতে মিয়ানমার সেনাদের স্থলমাইন পেতে রাখা এবং বাংলাদেশের জেলের দিকে গুলি করায় একজনের নিহত হওয়ার কথা তুলে ধরেন তিনি।
“কিন্তু বার বার অনাকাঙ্ক্ষিত ও উদ্যেশ্যপ্রণোদিত উসকানির পরও বাংলাদেশ সর্বোচ্চ ধৈর্য্যরে পরিচয় দিয়ে নিজেকে দমিয়ে রেখেছে।”
মোমেন বলেন, মিয়ানমারের সেনা অভিযান ও পরবর্তী পরিস্থিতি ‘শান্তির জন্য হুমকি’ বা ‘শান্তি লঙ্ঘন’ কি তা খতিয়ে দেখাও নিরাপত্তা পরিষদের দায়িত্বের মধ্যে। সেই সঙ্গে শান্তি ফিরে আনার প্রক্রিয়া শুরু করাও এর আওতায় পড়ে।
সেই সঙ্গে বিশেষ করে রোহিঙ্গাসহ সহিংসতার শিকার জনগোষ্ঠীর কাছে মানবিক সহায়তা যাতে নির্বিঘ্নে পৌঁছাতে পারে তাও নিরাপত্তা পরিষদকে নিশ্চিত করতে হবে বলে জোর দিয়ে বলে তিনি।
“ক্ষতিগ্রস্ত এলকায় ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনার জন্য জাতিসংঘ ও অন্যান্য মানবিক সহায়তা সংস্থাগুলোর জন্য পূর্ণ ও অবাধ সুযোগ মিয়ানমারকে নিশ্চিত করতে হবে।”
সন্ত্রাসবাদের প্রতি বাংলাদেশের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির কথা তুলে ধরে জাতিসংঘে বাংলাদেশের দূত বলেন, সীমান্তে কোনো ধরণের সন্ত্রাসবাদ বা চরমপন্থা মোকাবেলায় মিয়ানমারের সঙ্গে যৌথ অভিযান চালাতেও বাংলাদেশ তৈরি।
রোহিঙ্গা বিদ্রোহীদের হামলার জবাবে গত ২৫ অগাস্ট রাখাইনে নতুন করে দমন অভিযান শুরু করে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। তাদের সহিংসতার মুখে এ পর্যন্ত প্রায় পাঁচ লাখ রোহিঙ্গা পালিয়ে বাংলাদেশে এসেছে। ওই অভিযানকে ‘জাতিগত নিধন’ হিসেবে বর্ণনা করে আসছিলেন জাতিসংঘ মহাসচিব।

রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন বন্ধে বিভিন্ন দেশ ও সংস্থা মিয়ানমারের প্রতি আহ্বান জানালেও তাতে সাড়া না মেলার প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, সুইডেন, মিশর, সেনেগাল ও কাজাখস্তানের অনুরোধে নিরাপত্তা পরিষদ এদিন বৈঠকে বসে।