বিসর্জনে দেবী দুর্গা কৈলাসে

নিজস্ব প্রতিবেদক:আবারও আমন্ত্রণ, ভক্তবৃন্দের অশ্রু আর শ্রদ্ধায় অসুরনাশিনী দেবী দুর্গাকে বিসর্জনেই বিদায় জানানো হয়েছে। ভক্তের অকালবোধনে দেবী দুর্গা শ্বশুরালয় কৈলাসে থেকে পিত্রালয় মর্ত্যলোকে এসেছিলেন। শরতকালে এই ধরায় এসেছিলেন বলেই দুর্গাপূজাকে বলা হয় শারদীয় দুর্গোৎসব। হিন্দু সম্প্রদায়ের ধর্মীয় সবচেয়ে বড় উৎসব হলো এই শারদীয় দুর্গোৎসব বা শারদোৎসব। ৫ দিনব্যাপী এই উৎসবের গতকাল শনিবার ছিল দেবী দুর্গার দশামীপূজা। পূজা শেষে সন্ধ্যায় বিসর্জনেই দুর্গতিনাশিনী দেবী দুর্গা এক বছরের মত আবারও ফিরেছেন শ্বশুরালয় কৈলাসে। সকালে মণ্ডপে মণ্ডপে পুরোহিত দেবীকে আবারও আমন্ত্রণ জানিয়ে দর্শমী পূজা সম্পন্ন করেন। এ সময় উপস্থিত ভক্তবৃন্দ পুষ্প দিয়ে দেবীকে শ্রদ্ধা জানিয়ে আবারও আমন্ত্রণ জানায়। এ সময় ভক্তবৃন্দ ছিল অশ্রুসিক্ত। পূজা শেষে ভক্তবৃন্দকে পুরোহিত অঞ্জলি প্রদান করেন। এ সময় মণ্ডপে মণ্ডপে হিন্দু ধর্মীয় সংগীত পরিবেশন করা হয়। সকাল থেকেই এ বছরের মতো দেবী দর্শনে মণ্ডপে মণ্ডপে আসতে শুরু করে ভক্তবৃন্দ আর দর্শনার্থী। কিন্তু বাধা হয় থেমে থেমে বৃষ্টি। এর মধ্যেও পূজামণ্ডপগুলোয় ছিল ভক্তবৃন্দ আর দর্শনার্থীর উপচেপড়া ভিড়। বিকেলে হিন্দুধর্মীয় বিধান মতে ভক্তবৃন্দ অশ্রু আর শ্রদ্ধায় বিদায় জানায় দেবী দুর্গাকে। শারদীয় দুর্গোৎসব সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ ও নির্বিঘœ করতে গতকালও মণ্ডপে মণ্ডপে সন্ধ্যা পর্যন্ত ছিল কঠোর পুলিশি নিরাপত্তা ব্যবস্থা। সব মিলিয়ে এবারের শারদীয় দুর্গোৎসব যশোরে সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ ও নির্বিঘেœ সম্পন্ন হয়েছে।
শারদীয় দুর্গোৎসবের ৫ দিনব্যাপী অনুষ্ঠানমালার শনিবার শেষ দিনে দেবী দুর্গাকে দেয়া হয় বিসর্জন। দেবীকে বিসর্জনে বিদায় জানানোর লক্ষ্যে যশোরের ঐতিহ্যবাহী লালদীঘিকে সাজানো বৈদ্যুতিক আলোয় দৃষ্টিনন্দন করা হয় লালদীঘির দক্ষিণপাড়স্থ স্থায়ী মঞ্চকে। সন্ধ্যা লাগার সাথে সাথে যশোর শহর ও শহরতলীর প্রায় ৪০টি প্রতিমা বিসর্জন দেয়া হয় এখানে। পর্যায়ক্রমে পরিচালনা করা হয় এ বিসর্জন কার্যক্রম। বিকেল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত মুষলধারে বৃষ্টি উপেক্ষা করে ভক্তবৃন্দ ও স্বস্ব পূজা কমিটির নেতৃবৃন্দ দেবী দুর্গার প্রতিমা নিয়ে লালদীঘিতে আসে। প্রতিমা বিসর্জন উপলক্ষে প্রতিবারের ন্যায় রাতে বৃষ্টি শেষে এবারও দর্শনার্থীর ছিল উপচেপড়া ভিড়। সন্ধ্যা থেকে রাত অবদি লালদীঘির চত্বর পাশে ছিল আইনশৃৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা। সব মিলিয়ে লালদীঘির পাড়ে এক মিলনমেলায় পরিণত হয়।
এদিকে প্রতিমা বিসর্জন উপলক্ষে পূজা উদযাপন পরিষদ যশোর জেলা শাখার পক্ষ থেকে শারদ শুভেচ্ছা বিনিময়ের আয়োজন করে। শুভেচ্ছা বিনিময়কালে বক্তারা বলেন,সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ বাংলাদেশ। মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্যদিয়ে অর্জিত আমাদের স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ অসাম্প্রদায়িক চেতনা নিয়ে উন্নয়নের পথে এগিয়ে চলেছে। এই ধারা অব্যাহত রাখতে আগামীতেও প্রয়োজন জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্ব্।
জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের আয়োজনে শহরের লালাদীঘির পাড়ে এই অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন পরিষদের সভাপতি অসিম কুন্ডু। বক্তব্য রাখেন জেলা প্রশাসক আশরাফ উদ্দিন, পুলিশ সুপার আনিসুর রহমান, সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান শাহীন চাকলাদার, যশোর পৌরসভার মেয়র জহিরুল ইসলাম চাকলাদার রেন্টু, সিভিল সার্জন ডা.গোপেন্দ্র নাথ আচার্য্য, জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি শহিদুল ইসলাম মিলন, প্রেসক্লাব যশোরের সভাপতি জাহিদ হাসান টুকুন, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট যশোরের সভাপতি ডিএম শাহিদুজ্জামান, পূজা উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক দীপংকর দাস রতন, বাঁচতে শেখার নির্বাহী পরিচালক অ্যাঞ্জেলা গোমেজ, জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি রওশন ইকবাল শাহী, সাধারণ সম্পাদক ছালছাবিল আহমেদ জিসান প্রমুখ।
এসময় নেতৃবৃন্দ আরো বলেন এই দেশে ধর্ম বর্ণ সবই আছে কিন্তু জাতিতে আমরা বাঙালি। আমরা উৎসব প্রিয় জাতি, এখানে হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ-খ্রীষ্ঠান এক সাথে বাস করি। ধর্ম যার যার কিন্তু উৎসব সবার। নেতৃবৃন্দ সকল সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ থাকার জন্যে সকলের প্রতি আহবান জানান। লালদীঘিতে সর্বপ্রথম হরিসভা মন্দির পূজামন্ডপের প্রতিমা বিসর্জন দিয়ে শুরু হয় বিসর্জনের পালা। এখানে পর্যায়ক্রমে শহরের ৩৬ টি প্রতিমা বিসর্জন দেয়া হয়।
খুলনা : বিচ্ছেদে ভাসিয়ে খুলনায় শেষ হলো সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রতিমা বিসর্জন। শনিবার বিকেল ৫টা থেকে প্রথমে ফুলতলার ভৈরব নদে বিসর্জন শুরু হয়। সন্ধ্যার পর ভৈরব নদের জেলখানা ঘাট, চরেরহাট, দৌলতপুর ও রেলীগেট ঘাটে বিসর্জ্জন অনুষ্ঠিত হয়। দামোদর সনাতন সংঘ, বকশী বাড়ি পূজা মন্দির, সাহাপাড়া সার্বজনীন পূজা মন্দির, পশ্চিমপাড়া ভৈরব পূজা মন্দির, কিশোর ভ্রাতৃ সংঘ, ফুলতলা বাজার জামিরা রোড পূজা মন্দির, বসুরাবাদ কানইডাঙ্গা মাতৃ মন্দির, পয়গ্রাম পালপাড়া সার্বজনীন পূজা মন্দিরসহ ফুলতলা, দামোদর ও জামিরা ইউনিয়নের সকল মন্দিরের প্রতীমা ফুলতলা ঘাটে বিসর্জন করা হয়। অনুরূপভাবে জেলখানা ঘাট, চরেরহাট, দৌলতপুর ও রেলীগেটে মহানগরীর বিভিন্ন মন্ডপের প্রতিমা বিসর্জ্জন করা হয়। দেবী বিসর্জনে সবচেয়ে বেশি ভিড় লক্ষ্য করা গেছে, মহানগরীর শীতলাবাড়ী, দোলখোলা, টুটপাড়া গাছতলা, ঊমা শিবমন্দির, কয়লাঘাট, রূপসা মহাশ্মশান কালি, বাগমারা, তালতলা, শিববাড়ী, ছোট বয়রা মন্ডপে। বিসর্জনের আগে নারীরা দেবী দুর্গার সিঁথিতে সিঁদুর পরান এবং মিষ্টি মুখ করান। পরে মন্দিরে আগত নারীরা একে অপরের সিঁথিতে সিঁদুর বিনিময় করেন। এরপর বিভিন্ন পূজা মন্ডপ থেকে ট্রাক যোগে দেবী দুর্গার প্রতিমা বিসর্জনের শোভাযাত্রা শুরু হয়। এ শোভাযাত্রাগুলোয় যোগ দেন মন্দিরগুলোর পুণ্যার্থীরা। শোভাযাত্রাগুলো ভৈরব নদের ঘাটে প্রতিমা বিসর্জনের মাধ্যমে শেষ হয়। জেলা ও মহানগরীতে এবার ৯৪৩টি মন্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়েছে বলে জানিয়েছেন পূজা উৎযাপন পরিষদের খুলনা জেলা শাখার সভাপতি বিজয় ঘোষ ও পূজা উৎযাপন পরিষদের খুলনা মহানগর শাখার সভাপতি শ্যামল হালদার।
চুকনগর : বিকেলে চুকনগর সর্বমঙ্গলা মাতৃ মন্দির তীর্থ কমপ্লেক্স পূজা মন্ডপসহ এলাকার ২৪ টি মন্ডপে একযোগে দুর্গা দেবীর বিজয়া দশমী শেষান্তে বুড়িভদ্রা নদীতে আনুষ্ঠানিক ভাবে বিসর্জন দেয়া হয়। এসময় নারী ভক্তদের অশ্র“তে এক হৃদয় বিদারক দৃশ্যের অবতরণ ঘটে। বিসর্জন অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন- পূজা উদ্যাপন পরিষদ সভাপতি জয়দেব আঢ্য, সম্পাদক জয়দেব মন্ডল, স্বপন কুমার দেব, অশোক কুমার দে, প্রহ্লাদ ব্রহ্ম, আশুতোষ নন্দী, ইউপি চেয়ারম্যান প্রতাপ রায়, কৃষ্ণ নন্দী, অরুণ নন্দী, নিতাই নন্দী, মুকুন্দ অধিকারী, বিধান তরফদার, পুরহিত তাপস কুমার উপপাধ্যায়, উত্তম রায়, প্রমুখ।
কপিলমুনি : খুলনার কপিলমুনিতে ঢাক ঢোল উলু ও শঙ্খ ধ্বনীর মধ্য দিয়ে দেবী দুর্গার বিসর্জন সম্পন্ন হয়েছে। কপিলমুনির কালী ঘাটে শনিবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬ টায় আনুষ্ঠানিকভাবে কপিলমুনি এলাকার সকল মন্ডপের দূর্গা প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হয়েছে। কালীঘাটে পুরুষ ভক্তরা ‘মা তুমি আবার এসো’, আর নারী ভক্তরা উলু ধ্বনী ও মায়ের ললাটে সিদুর পরিয়ে অশ্র“ স্বজল চোখে এ বিদায় জানান।