নাই বিচার বনাম ময়লা রাজনীতি

বিএনপির শীর্ষনেতারা ক্রমাগত অভিযোগ করে চলেছেন যে, সরকার খালেদা জিয়াকে নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা করার পাঁয়তারা করছে। বেগম জিয়ার বিরুদ্ধে দুটি দুর্নীতি মামলার বিচারকাজ দ্রুত শেষ করে তাঁকে শাস্তি দিয়ে সরকার এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে চায় বলে বিএনপির অনুমান। কিন্তু তাদের এই অনুমান একান্তই কল্পনানির্ভর। যদি ধরেও নেওয়া হয় যে, দুর্নীতি মামলায় বেগম জিয়ার শাস্তি হবে তবু এটা বলা যায় না যে, তিনি নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষিত হবেন। নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে আর এক বছর পরই। এই সময়ের মধ্যে নিম্ন আদালতে বিচারপ্রক্রিয়া শেষ হলেও হাই কোর্ট, সুপ্রিম কোর্ট হয়ে আসতে কতদিন লাগবে তা বলা যায় না। তাছাড়া নিম্ন আদালতে সময়ক্ষেপণের যে কৌশল খালেদা জিয়া নিয়েছেন তা অভূতপূর্ব। তাঁর এই কৌশল অব্যাহত থাকবে বলেই মনে হচ্ছে। সরকারের ভেতর যেমন মামলা শেষ করার তাড়া আছে, তেমনি বিএনপিরও আছে রোডব্লকের পরিকল্পনা। দুই মিলে মামলা ‘শেষ হইয়াও’ শেষ হচ্ছে না।

জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় বেগম জিয়া আত্মপক্ষ সমর্থন করে যে বক্তব্য দিচ্ছেন তা শেষ হতে কতদিন লাগবে তা এখন অনুমান করা যাচ্ছে না। এর মধ্যেই তিনি পাঁচ দিন বক্তব্য দিয়েছেন। ষষ্ঠ দিনের বক্তব্য দেওয়ার তারিখ নির্ধারণ করা আছে। সেদিনই যে বক্তব্য প্রদান শেষ হবে তার নিশ্চয়তা কী?

শুরু থেকেই নানা অজুহাতে সময় নিয়েছেন। আদালত, বিচারক-– সব কিছুই তাঁর অপছন্দ। পরিবর্তনের আবেদন করেছেন দফায় দফায়। গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য তাঁকে আদালতে হাজির করা হয়েছে। এখন তিনি নিয়েছেন কালক্ষেপণের নতুন কৌশল। তিনি আদালতে যে দীর্ঘ ভাষণ দিচ্ছেন তা হয়তো একটি রেকর্ড হয়ে থাকবে। বিএনপি নেত্রীর অনেক কথা। এত বলে যান, তবু কথা শেষ হয় না।

আদালতকে তিনি মূলত সরকারবিরোধী বক্তৃতার মঞ্চ বানিয়ে ফেলেছেন। জনসভায় তিনি সাধারণত যে বক্তৃতা করেন, আদালতেও তাই করছেন। সরকার বিএনপিকে প্রায় দুই বছর প্রকাশ্য জনসভা করতে দেয়নি। বিএনপি নেত্রী তার ঝাল মিটিয়ে নিচ্ছেন আদালতে। প্রথম দিন চোখের পানি বাধা না মানলেও পরে তিনি নিজেকে সামলে নিয়েছেন। তিনি সরকারকে তুলোধুনা করছেন। প্রায় একই কথার পুরাবৃত্তি করছেন। কিন্তু বক্তব্য শেষ করছেন না।

গত ১৬ নভেম্বর পঞ্চম দিনের মতো আদালতে তিনি যে বক্তব্য দিয়েছেন তাতে তিনি কী বলেছেন? নতুন কথা কিছু কি আছে? বেগম জিয়া হয়তো বলবেন, দুনিয়ায় কোনো কথাই তো নতুন নয়। কে কীভাবে বলে সেটাই আসল।

খালেদা জিয়া বলেছেন, “সাম্প্রতিক কিছু ন্যাক্কারজনক ঘটনায় আদালতগুলোর ওপর শাসক মহলের রাজনৈতিক চাপ ও কর্তৃত্ব আরও বেড়েছে। ন্যায়বিচারের সুযোগ আরও সীমিত হয়ে পড়েছে। প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহাকে তাঁর পদ থেকে সরে যেতে বাধ্য করা হয়েছে। ক্ষমতাসীনদের পছন্দমাফিক রায় না দেওয়ার কারণে দেশের প্রধান বিচারপতিকে যেখানে এমন ভাগ্য বরণ করতে হয়, সেখানে অন্য বিচারকদের সামনে ন্যায়বিচারের সুযোগ ও পরিবেশ কি আর থাকতে পারে?”

 

Sheikh Hasina - 33333
এখন তিনি রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার, তখন কি শেখ হাসিনা সেটা হবেন?

 

খালেদা জিয়া বলেছেন, “আশঙ্কার জায়গা হচ্ছে, দেশে ন্যায়বিচারের পরিবেশ ও সুযোগ তারা ধ্বংস করে দিচ্ছে। কাজেই আদালতের কাছে আমি ন্যায়বিচার পাব কি না, সে সংশয় নিয়েই এই মামলায় আমাকে অত্র জবানবন্দি দিতে হচ্ছে।”

খালেদা জিয়া অভিযোগ করেছেন, রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বশবর্তী হয়ে তাঁর বিরুদ্ধে ৩৬টি মামলা করা হয়েছে। তিনি বলেছেন, “আমি রাজনীতিতে সক্রিয় আছি বলে আমাকে ক্ষমতাসীনরা সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচনা করে। অথচ শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে দায়ের করা দুর্নীতির মামলাগুলো তুলে নেওয়া হয়। অসত্য, ভিত্তিহীন অভিযোগ ও অপপ্রচার চালিয়ে এবং জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন করতে ব্যর্থ হয়ে এসব মামলার আশ্রয় নিয়েছে সরকার।”

বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া আদালতে ঘুরিয়ে ফিরে যেসব কথা বলছেন তার মূল নির্যাস হল, তিনি বর্তমান সরকারের আমলে ন্যায়বিচার পাবেন না। বিচারব্যবস্থা সরকারি চাপে নত। তিনি রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার। শেখ হাসিনা মামলা থেকে রেহাই পান, তিনি পান না। যদি ধরে নিই তাঁর বক্তব্য সঠিক তাহলে প্রশ্ন আসে, তিনি সব জেনেশুনে বিচারকাজ বিলম্বিত করছেন কেন? সাজানো মামলায় তাঁকে যদি পূর্বনির্ধারিত রায়ে শাস্তি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে সরকার তাহলে কার উদ্দেশে, কীসের জন্য এত কথা বলছেন? তিনি কি তাহলে মামলার কাজ বিলম্বিত করে কোনো বিশেষ সুবিধা পাওয়ার কথা ভাবছেন? বর্তমান শাসক মহল ন্যায়বিচারকে ‘নাই বিচার’ করে থাকলে তিনি কি ন্যায়বিচার পাওয়ার জন্য সরকারবদলের অপেক্ষা করছেন?

খালেদা জিয়া চিকিৎসার জন্য লন্ডন গিয়ে পুত্র তারেক রহমানের সহায়তায় সরকারবিরোধী কিছু তৎপরতায় জড়িয়েছিলেন বলে সরকারি মহলে প্রচার আছে। সদ্যপদত্যাগী প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার সঙ্গেও সরকারবিরোধী একটি ঘোট পাকানো নিয়ে জল্পনাকল্পনা আছে। সব কিছু মাথায় রেখেই খালেদা জিয়া আদালতে ধীরে চলার কৌশল নিয়েছেন বলে যদি কেউ মনে করে, তাহলে সেটা ভুল বলা যাবে কি?

খালেদা জিয়া আদালতে ক্ষমতাসীন সরকারের বিরুদ্ধে নানা সমালোচনা করছেন। সেটা তিনি করতেই পারেন। সরকারের এক নম্বরের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হয়ে তিনি যদি সরকারের প্রশংসা করেন তাহলে মানুষ তাঁকে আর সমর্থন করবে কেন? সরকারবিরোধিতা হল আমাদের দেশে বিরোধী রাজনীতির বড় হাতিয়ার। এই হাতিয়ারে খালেদা জিয়া অব্যাহত শান দেবেন, তাতে অস্বাভাবিকতা কিছু নেই। তবে প্রশ্ন হল, ক্ষমতাসীন সরকারের নীতি-পদক্ষেপের নিন্দা-সমালোচনা করার পাশাপাশি তিনি ক্ষমতায় গেলে কী কী পরবর্তন আনবেন, সেগুলো কি বললে ভালো হয় না?

এখন যদি দেশে ন্যায়বিচারের পরিবেশ ও সুযোগ ধ্বংস হয়ে থাকে তাহলে তখন (বেগম জিয়া ক্ষমতায় গেলে) তা কি অবারিত ও প্রসারিত হবে? এখন তিনি রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার, তখন কি শেখ হাসিনা সেটা হবেন? এখন আদালতগুলোর ওপর শাসক মহলের রাজনৈতিক চাপ ও কর্তৃত্ব বেড়েছে। তখন কি কমবে?

অভিযোগ করার সঙ্গে সঙ্গে এই অঙ্গীকারগুলো ব্যক্ত হলে মানুষ বুঝতে পারত তিনি কেন সরকারকে পছন্দ করছেন না। শেখ হাসিনার সরকারের চেয়ে খালেদা জিয়ার সরকার যে উত্তম হবে তা বোঝার উপায় কী? আদালতে দেওয়া তাঁর বক্তব্য গণমাধ্যমে গুরুত্ব দিয়ে প্রচার হচ্ছে। তাই তিনি এই সুযোগে তাঁর নির্বাচনী অঙ্গীকার অনায়াস প্রচারের একটি সুযোগ নিতে পারেন।

পরবর্তী ধার্য দিনে তিনি সেটা করেন কি না সেটাই এখন দেখার বিষয়।

দুই.

নির্বাচনের সময় যত নিকটবর্তী হচ্ছে শাসক দল আওয়ামী লীগের মধ্যে ততই অস্থিরতার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। ঝগড়া-বিবাদ মিটিয়ে দলের ঐক্য সংহত করা যখন জরুরি, তখন দেখা যাচ্ছে অনৈক্যের ঝাপটা আঘাত হানছে দলটিকে। দেশে একটি কথা কীভাবে যেন চালু হয়ে গেছে যে, আওয়ামী লীগের বড় শত্রু আর কেউ নয়। আওয়ামী লীগের শত্রু আওয়ামী লীগ।

বুর্জোয়া রাজনৈতিক দলের মধ্যে মতভেদ, মতপার্থক্য থাকা কোনো অস্বাভাবিক কিছু নয়। মূলধারার সঙ্গে কিছু উপধারাও সক্রিয় থাকে। আওয়ামী লীগের জন্মলগ্ন থেকেই এর অভ্যন্তরে ডান-বামের একটি লড়াই চোরাস্রোতের মতো বহমান ছিল। বাম-প্রবণতা বেশি শক্তিশালী ছিল। কারণ দলের মূল নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নিজে ছিলেন বাম -নুরাগী। খন্দকার মোশতাকের মতো নেতা আওয়ামী লীগের ভেতরেই ছিল।

এখন আওয়ামী লীগের মধ্যে আদর্শিক বিরোধের চেয়ে ব্যক্তিগত চাওয়া-পাওয়া তথা স্বার্থের দ্বন্দ্বই বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। আওয়ামী লীগ এবং তার সমর্থক সংগঠনগুলোর অনেকেই রাজনীতির চেয়ে ভাগাভাগি, লুটপাট, সম্পদশালী হওয়ার দিকে অধিক মনোযোগী। ছাত্রলীগ-যুবলীগ-স্বেচ্ছাসেবক লীগের নাম-পরিচয়ে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে অনেকেই জড়িয়ে পড়ছেন। এত দিন ছিল আর্থিক সুবিধা লাভের জন্য, আধিপত্য প্রতিষ্ঠার জন্য বেপরোয়া আচরণের অভিযোগ। এখন তারা ধর্ষণ-গণধর্ষণের মতো ঘৃণ্য অপরাধ সংঘটনেও দ্বিধা করছে না।

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের নিজেও সমর্থকদের অপকর্মের বিরুদ্ধে একাধিকবার সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছেন। কিন্তু পরিবর্তনের লক্ষণ নেই। কেউ কেউ বরং মনে করেন আওয়ামী ধারার রাজনীতি বদলাচ্ছে কিন্তু সেটা খারাপের দিকে।

দেশের রাজনীতি নিয়ে সমালোচনার অন্ত নেই। রাজনীতি বড় ব্যবসায় পরিণত হয়েছে, এ সমালোচনাও এখন পুরানো হতে চলেছে। সব ধরনের অপরাধ ও অপরাধীর নিরাপদ আশ্রয়স্থল এখন রাজনীতি। ভালো মানুষ, সজ্জন মানুষ, বিবেকবোধসম্পন্ন মানুষ এখন ক্রমেই রাজনীতি থেকে দূরে সরে যাচ্ছেন। রাজনীতিতে এখন তাদেরই দাপট, যাদের চক্ষুলজ্জার বালাই নেই। চোখের সামনে অন্যায় ঘটবে কিন্তু না দেখার ভান করতে হবে। দলের নাম-পরিচয় ব্যবহার করে অপরাধ করলেও তাকে নির্দোষ দাবি করতে হবে, প্রমাণ করতে হবে।

নোংরা রাজনীতির একটি উদাহরণ গত ১৬ নভেম্বর রাজধানীতে প্রত্যক্ষ করা গেছে। ঢাকা মহানগর (দক্ষিণ) আওয়ামী লীগের একটি সভা পণ্ড করার জন্য এক গ্রুপ আরেক গ্রুপের বিরুদ্ধে ‘ময়লা আক্রমণ’ চালিয়েছে। রাজধানীর লালবাগ এলাকায় পার্ল হারবার নামের একটি কমিউনিটি সেন্টারে দলীয় একটি সভা আহ্বান করা হয়েছিল। কিন্তু ওই সভা পণ্ড করার জন্য কমিউনিটি সেন্টারের সামনে ময়লা-আবর্জনা স্তুপ করে রাখা হয়। একই দলের সমর্থকরা এভাবে নিজের নাক নিজে কাটার মতো কাজ করতে পারেন, ভাবতেও কেমন লাগে।

ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সাধারণ সম্পাদক শাহে আলম মুরাদের সঙ্গে দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র সাঈদ খোকনের নাকি বনিবনা নেই। তাদের বিরোধ পুরানো। এই দুই নেতার অনুসারীদের মধ্যে দ্বন্দ্বের জেরেই ওই ময়লা হামলার ঘটনা ঘটেছিল বলে গণমাধ্যমে খবর ছাপা হয়েছে। অবশ্য দুই নেতাই সাংবাদিকদের কাছে দাবি করেছেন, তাদের মধ্যে বিরোধ নেই। বিরোধ যদি না-ই থাকে তাহলে ‘ময়লা’ আক্রমণের ঘটনা ঘটল কীভাবে? কারা এটা ঘটাল? আওয়ামী লীগের সভাস্থলে ময়লা ফেলে প্রতিবন্ধকতা তৈরির সাহস নিশ্চয়ই বিএনপি কিংবা জামায়াত দেখায়নি।

এর আগে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে বাড়ি থেকে বের হতে না দেওয়ার জন্য বালুর ট্রাক দিয়ে ব্যারিকেড তৈরি করে আলোচনায় এসেছিল আওয়ামী লীগ। এবার নিজেরা নিজেরা ময়লা হামলা চালিয়ে রাজনীতিকেই আরেকটু ময়লাযুক্ত করা হল না কি?