মসজিদে গণহত্যা ও জঙ্গি-মানস

Zihadi - 111
১. নভেম্বর ২৪, ২০১৭– মিসরের সুফি মসজিদে জুমা নামাজে বোমা-ব্রাশফায়ার, ২৭ শিশুসহ নিহত ৩০৫, আহত ১২৮।

২. হামলার ব্যাপকতা, প্রস্তুতি, ধরন, ক্ষিপ্রতা, দক্ষতা, টিমওয়ার্ক ইত্যাদি আইসিসএর সঙ্গে মেলে এবং এক সন্ত্রাসীর হাতে আইসিসের পতাকা ছিল বলে একজন জানিয়েছেন।

৩. ২০১৩ সালে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট মুহাম্মদ মুরসিকে অন্যায়ভাবে ক্ষমতাচ্যুত ও গ্রেপ্তার, সিনাইতে জঙ্গি-উত্থান, সরকারি বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষ ও জয়-পরাজয়, ২০১৪ সালে সেখানকার জঙ্গি সংগঠন (ওলিয়াত সিনাই বা আনসারুল বায়তুল মুকাদ্দাস) আইসিসের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা, এগুলো রাজনৈতিক। কিন্তু মসজিদে হামলার শেকড়টা আদর্শিক। সমস্যাটা মারাত্মক। এ দানব প্রতিহত করতে দ্বন্দ্বটার শেকড়ে যেতে হবে, বুঝতে হবে দুপক্ষের চরিত্র ও কর্মপদ্ধতি।

বলাবাহুল্য, দুপক্ষই কোরান হাদিস থেকে সমর্থন দেখান। কিন্তু গাছের পরিচয় তো তার ফলেই। যেহেতু জনগণের পক্ষে অত অত কেতাব পড়া সম্ভব নয়, তাই বৃক্ষের ফলের দিকেই দেখা যাক সে শান্তি অর্থাৎ ইসলাম কোথায় আছে।

৪. সুফি মানসিকতা:

সুফিদের ধর্মবিশ্বাস হল ইসলামের মিস্টিক অর্থাৎ মরমীয়া ব্যাখ্যা। “সুফিইজম অ্যান্ড শরিয়াহ, এ স্টাডি অফ শেখ আহমদ সিরহিন্দ’স এফোর্ট টু রিফর্ম সুফিইজম” বইটা তাদের ইসলামি ধর্মবিশ্বাস বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করেছে, এর মধ্যে রাজনীতি ইসলামি রাষ্ট্র, মতভেদ হলে কাউকে শত্রু বা মুরতাদ বলা ইত্যাদি নেই। রাষ্ট্রক্ষমতার প্রতি তাদের মনোভাব আমরা সুফিদের মধ্যে দেখেছি। বাংলায় অনেক সুফি এসেছেন, তাদের অনেকেই প্রজাদের নালিশের ভিত্তিতে অত্যাচারী জমিদারদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে জয়ী হয়েছেন। যেমন দিনাজপুর, চট্টগ্রাম, বগুড়া, যশোহর, হরিরামপুর ইত্যাদি জায়গার হযরত শাহ মাহমুদ, জাফর খাঁ গাজী, পীর বদরুদ্দীন, শাহ বদরুদ্দীন, সুলতান বলখী, কাত্তাল পীর, বড়খাঁ গাজী, শাহ নেকমর্দান ইত্যাদি। ক্ষমতায় বসলে তাদের ইসলাম প্রচারে সুবিধেই হত, কিন্তু তাঁরা সবাই ক্ষমতা ছেড়ে জনগণের মধ্যে ফিরে মুসলিম সংখ্যালঘিষ্ঠ দেশকে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে পরিণত করার অভূতপূর্ব অসাধ্য সাধন করেছিলেন। সে জন্যই লক্ষ মুসলিম তো বটেই, লক্ষ অমুসলিমও আজও আসেন হযরত শাহ জালাল, নিজামুদ্দীন আউলিয়া, খাজা মঈনুদ্দীন চিশতির দরবারে।

ইসলাম যদি শান্তির ধর্ম হয় তবে সে শান্তি এখানে আছে কিনা ভেবে দেখুন।

৫. জঙ্গি মানসিকতা:

জঙ্গিদের জীবন-মরণ চাওয়া মাত্র একটাই, তা হল, শারিয়া আইনভিত্তিক ইসলামি রাষ্ট্র। এ বিশ্বাস নিয়ে তারা জন্মায়নি, এটা তাদের মাথায় গেঁথে দেওয়া হয়েছে। বিশ্বাসটা সতেরশ শতাব্দীর ওয়াহাব বা সাম্প্রতিক জামাতে ইসলামী, মুসলিম ব্রাদারহুড, তালেবান, বোকো হারাম বা আইসিসের আবিস্কার নয়, এটা বানানো হয়েছে চৌদ্দশ বছর আগেই। নবীজী ও চার খলিফার পর ইসলাম রাজতন্ত্রের কুক্ষিগত হল, রাজারা বিলক্ষ্মণ জানত ইসলামে রাজতন্ত্র অবৈধ। তাই তাদের দরকার হল রাজতন্ত্রের গায়ে ইসলামি লেবেলের। গড়ে উঠল রাজনৈতিক ইসলাম, দুনিয়ার সব অমুসলিমের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ভিত্তিতে– উদ্ধৃতি দিচ্ছি:-

“প্রথমে যুদ্ধ নিষিদ্ধ ছিল। তারপর যাহারা মুসলমানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে এবং যাহারা আল্লাহ ছাড়া অন্যের উপাসনা করে তাহাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের অনুমতি দেয়া হইল ও পরে যুদ্ধকে বাধ্যতামূলক করা হইল।

মদিনা ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. মুহসিন খান অনুদিত সহি বুখারী (অখণ্ড) পৃ– ১০৮১। এটা দুনিয়ার সব অমুসলিমের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা ছাড়া আর কিছুই নয়। এর সমর্থনে শারিয়া আইন বানানো হল–

“খলিফা দুনিয়ার সকল অমুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করিবেন যতক্ষণ পর্যন্ত না তাহারা মুসলমান হইয়া যায়।”

— শাফি আইন উমদাত আল শালিক, আইন নং 0.9.9।

সূরা হাদীদ আয়াত ২৫–

“আমি লোহা অবতীর্ণ করেছি যাতে রয়েছে প্রচণ্ড শক্তি।”

এই “শক্তি’র ব্যাখ্যা করা হল “রণশক্তি”– (ইবনে কাথির} আজ যখন যুদ্ধ করে দুনিয়া দখলের স্বপ্নটা কুয়াশার মতো মিলিয়ে গেছে হাওয়ায়, এখন লোহার শক্তিটা হয়ে গেছে “রাষ্ট্রশক্তি।”

বাংলাদেশ ইসলামি ফাউন্ডেশন কর্তৃক প্রকাশিত বিধিবদ্ধ ইসলামি আইন ৩য় খণ্ড পৃ– ২৪৫)।

সূরা বাকারা ৪২, হজ্ব ৩০ ইত্যাদি (মিথ্যা বল না, সত্যের সঙ্গে মিথ্যে মিশিও না) লঙ্ঘন করে চৌদ্দশ বছর আগেই আইন করা হয়েছিল যা আজও আছে কেতাবে আর ওয়াজ মাহফিলে– “উদ্দেশ্য যদি বাধ্যতামূলক হয় তবে মিথ্যা বলা বাধ্যতামূলক।”– শাফি আইন নং r.8.2। দুনিয়ার সব অমুসলিমের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণাটা এখনও বলবৎ মওদুদির সুস্পষ্ট দাবিতে যা জঙ্গিদের ধর্মবিশ্বাসের ভিত্তি– মুসলমানদের ক্ষমতা থাকলে তারা সারা দুনিয়া থেকে সব অমুসলিম সরকারকে উচ্ছেদ করে বিশ্ব-ইসলামি রাষ্ট্র কায়েম করবে– জিহাদ ইন ইসলাম, পৃষ্ঠা ১৫।

মওদুদি এটাও বলেছেন-– ““ইসলামি বিপ্লবের পর জনগণকে নোটিস দেওয়া হইবে যাহারা বিশ্বাসে-কর্মে ইসলাম ছাড়িয়াছে ও সেভাবেই থাকিতে চায় তাহারা প্রকাশ্যে অমুসলিম পরিচিতি প্রকাশ করিয়া এক বছরের মধ্যে দেশত্যাগ করুক। তারপর যাহারা জন্মাইবে তাহারা হইবে মুসলিম। ইসলামি আইন প্রয়োগ করিয়া তাহাদিগকে ধর্মীয় কাজকর্ম ও দায়িত্ব পালনে বাধ্য করা হইবে। তারপর কেউ ইসলাম ছাড়িয়া দিলে তাহাকে খুন করা হইবে।”

[দ্য পানিশমেণ্ট অফ দ্য অ্যাপোস্টেট অ্যাকর্ডিং টু ইসলামিক ল’]

ইসলাম যদি শান্তির ধর্ম হয় তবে সে শান্তি এখানে আছে কিনা ভেবে দেখুন।

৬. বাস্তবতা:

ধর্মবিশ্বাসের এই দ্বন্দ্ব বাস্তবে প্রতিফলিত হচ্ছে প্রবল হিংস্রতায়। পাকিস্তানে শিয়া-সুন্নিদের পরস্পরের মসজিদে হামলা-হত্যার ঐতিহ্য বহু বছরের, সেখানে শিয়ারা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। সুফিরা অস্ত্রহীন, অরক্ষিত ও আক্রান্ত, জঙ্গিরা সশস্ত্র ও অক্রমণকারী, তা-ও আবার অতর্কিত আক্রমণ। এ এক অসম, অন্যায় যুদ্ধ। সিনাই প্রবলভাবে সুফি-প্রভাবিত, মসজিদটি তাদের কেন্দ্র। সুফিরা জঙ্গিদের কখনও গালাগালি করেনি মুরতাদ বলেনি কিন্তু তবু জঙ্গিরা প্রচার করেছে ‘সুফিবাদ একটি রোগ’ ও গত বছর এক সুফি-ইমামের শিরচ্ছেদ করেছে। এবারে তারা মুসলিম হয়েও মসজিদে নামাজরত মুসলিম-হত্যায় বিশ্বরেকর্ড গড়ল। শিশুসহ শত শত নিরপরাধ নিহত-আহত হল, শত শত এতিম হল বিধবা হল, বিশ্বে আবারও ছড়িয়ে গেল ইসলামভীতি। জঙ্গিদের ধর্মবিশ্বাসের ভিত্তি হয়ে উঠেছে ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় যে কোনো বাধা যে কোনো উপায়ে উচ্ছেদ করা ইবাদত, এরপর আর কত রক্ত ঝরবে কে জানে!

৭. পটভূমি বাংলাদেশ:

দেশে ইসলামি রাষ্ট্রপন্থীদের এক অংশ হিংস্র হয়ে উঠেছে। মুসলিমের মধ্যেই ভিন্নমত তারা সহ্য করতে পারে না এবং প্রতিপক্ষকে কতল করা ছাড়া আর কোনো সমাধান খুঁজে পায় না। এরা প্রবলভাবে সুফি-বিরোধী ও সূফিদের মাজারবিরোধী। এরাই বোমা হামলা করেছে হযরত শাহ জালালের দরগায়। একাত্তরে এদের অবিশ্বাস্য নৃশংসতা বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, ওটার শেকড়ই হল ইসলামের ওই যুদ্ধবাজ ব্যাখ্যা। এই হিংস্রতারই প্রবল প্রকাশ সাম্প্রতিক ব্লগার-লেখক-প্রকাশক হত্যায়। ইসলামি রাষ্ট্রপন্থী নেতাদের কাউকে কোনোদিন দেখলাম না ভিন্নমতাবলম্বী কাউকে ডেকে আদব-লেহাজের সঙ্গে হাসিমুখে আলাপ-আলোচনা করতে। সংলাপ না হলে নিজের প্রতি অভিযোগের সত্যতা কীভাবে যাচাই হবে, কীভাবে প্রতিপক্ষের যুক্তিগুলোর মূল্যায়ন হবে, কীভাবে পরস্পরের বিশ্বাসের সবলতা দুর্বলতাগুলো উপলব্ধি করবে?

৮. অনতিবিলম্বে যা করতে হবে:

(ক) মুখে মিষ্টি কথা সবাই বলে, হিটলারও বলত। তাই মুখের কথা নয়, ইসলামি রাষ্ট্রপন্থীদের অতীত বর্তমানের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে জনগণকে সচেতন করতে হবে;

(খ) আলেম উলামা দ্বারা প্রতিষ্ঠিত-পরিচালিত পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ ইসলামি সংগঠন নাহদালাতুল উলামার প্রকাশিত “ইলিউশন অফ ইসলামি স্টেট্” (ইসলামি রাষ্ট্রের বিভ্রম)এর মতো বইগুলো ছড়িয়ে দিতে হবে।

(গ) দেশের কিছু মওলানা বুক ফুলিয়ে হুঙ্কার দেন ও ঘৃণা ছড়ান, তাদেরকে আইনের আওতায় আনতে হবে। তারা ভুলে যান যে, তারা ফিতনা ছড়াচ্ছেন যা হত্যার চেয়েও বড় অপরাধ।

সূরা বাকারা আয়াত ১৯১। অন্য মাওলানারা তাদের বিরোধিতা করলে ভালো হয়।

(ঘ) ধর্মে রাজনীতি ও রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার নিষিদ্ধ করতে হবে। এটা নুতন কিছু নয়, খোদ সৌদি আরবেই আইন করা হয়েছে খোতবায় রাজনৈতিক বক্তব্য দিলে ইমাম চাকরি হারাবেন– একাত্তর টিভি ৪ জানুয়ারি ২০১৭। সংযুক্ত আরব আমিরাতেও সরকার নির্দেশ দিয়েছে খোতবায় অমুসলিমদের প্রতি যেন নেতিবাচক কথা না বলা হয়। আলেম-উলামা-মাওলানারা জাতিকে হেদায়েত দিন, এখন যার অভাব প্রকট এবং ওখানেই থেমে যান। যে শুনবে শুনবে, কেউ না শুনলে তার দায়িত্ব আপনার নয়। হুঙ্কারি ওয়াজ করে “ইসলাম প্রতিষ্ঠা” করার দায়িত্ব আপনাকে দেওয়া হয়নি, সে অধিকার আপনার নেই।

সবাইকে সালাম।