৭ বছরের যন্ত্রনা থেকে রেহাই পেলেন বৃদ্ধা সুলতা রানী

বিল্লাল হোসেন>
৭৫ বছরের বৃদ্ধা সুলতা রানী জরায়ুর টিউমারে আক্রান্ত হয়ে ৭ বছর ধরে যন্ত্রনায় ভুগছিলেন। দিনে দিনে অস্বাভাবিকভাবে বড় হতে থাকে তার পেট। যখন পেটে ব্যথা শুরু হতো তখন হাউমাউ করে কাঁদতেন তিনি। বৃদ্ধা মায়ের দুর্বিসহ যন্ত্রনা সহ্য করতে পারছিলেন না তার সন্তানেরা। মাকে একটু শান্তির জন্য তাকে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয় চিকিৎসা সেবার জন্য। কিন্তু চিকিৎসকেরা তার বয়স দেখে কেউ অস্ত্রোপচার করতে রাজি হননি। চিকিৎসকরা পরিবারের সদস্যদের বার বার জানিয়ে দেন, সুলতা রানীর বয়স অনেক বেশি হয়ে গেছে। তাই অচেতন করলে তার জ্ঞান না ফেরার সম্ভাবনা বেশি। কিন্তু একটু দেরিতে হলেও সেই দুর্বিসহ জীবন-যাপন করা থেকে মুক্তি পেয়েছেন সুলতা রানী। মঙ্গলবার বিকেলে যশোরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে আধুনিক পদ্ধতিতে ওই রোগীকে অচেতন করার পর অস্ত্রোপচার করেন গাইনী বিভাগের অধ্যাপক ডাঃ নিকুঞ্জ বিহারী গোলদার। এ সময় তার পেট থেকে সাড়ে ৭ কেজি ওজনের একটি টিউমার বের করা হয়। বর্তমানে সুলতা সুস্থ আছেন। কান্নার বদলে এখন তার মুখে হাসি ফুটেছে। তিনি ঝিনাইদহ সদর উপজেলার পোড়াহাটি গ্রামের ফটিক চাঁদ সূত্রধরের স্ত্রী।
বিপুল কুমার সূত্রধর জানিয়েছেন,তার মা সুলতা রানী দীর্ঘদিন থেকে পেটে ব্যথায় আক্রান্ত ছিলেন। ঝিনাইদহের চিকিৎসকদের পরামর্শে প্যাথলজিক্যাল পরীক্ষা নিরীক্ষা করার পর জানা যায় তার জরায়ুতে টিউমার হয়েছে। যে কারনে তার এই ব্যথা যন্ত্রনা। সে অনুযায়ী ঝিনাইদহের ডাঃ আব্দুল খালেক ও ডাঃ জাহিদুল ইসলামের কাছ থেকে চিকিৎসাসেবা নিয়েও কোন কাজ হয়নি। এক প্রকার ওই দুজন চিকিৎসক পরিবারের লোকজনকে জানান অস্ত্রোপচার না করলে সুলতার পেটের ব্যথা সারবেনা। কিন্তু তার বয়স বেশি হয়ে গেছে। তাই অস্ত্রোপচার করা সম্ভব নয়। কেননা অচেতন করার পর তার জ্ঞান না ফেরার সম্ভাবনা বেশি। যে কারনে ওই দু চিকিৎসক ওই রোগীকে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের গাইনী বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডাঃ দিপ্তী রানী সাহার কাছে নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেন। সেখানে নিয়ে যাওয়া হলে ওই চিকিৎসকও রোগীর অস্ত্রোপচারে রাজি হননি। এরপর থেকে তারা হতাশ হয়ে পড়েন। দেশের বিভিন্ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে সুলতাকে নিয়ে যাওয়া হয় চিকিৎসাসেবার জন্য। তাকে অস্ত্রোপচারের পরিবর্তে দেয়া হয় ওষুধের ব্যবস্থাপত্র। কিন্তু বছরের পর বছর ওষুধ খাইয়েও কোন কাজ হয়নি। আবার পেটও বড় হতে থাকে তার। দীর্ঘ ৭ বছর প্রতিটি সময় যন্ত্রনায় পার হতে থাকে এই বৃদ্ধার। না পেরেছেন শান্তিতে ঘুমাতে না পেরছেন খাওয়া দাওয়া করতে। বিপুল সূত্রধর আরো জানান, বৃদ্ধা মায়ের যন্ত্রনায় পরিবারের লোকজনের মুখে কোন হাসি ছিলোনা। সর্বশেষ গত সপ্তাহে তারা স্বরণাপন্ন হন যশোর মেডিকেল কলেজের গাইনী বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ডাঃ নিকুঞ্জ বিহারী গোলদারের ব্যক্তিগত চেম্বার যশোরের কিংস হসপিটালে। ওই চিকিৎসকের পরামর্শে গত সোমবার রোগীকে ওই হসপিটালে ভর্তি করা হয়। মঙ্গলবার বিকেলে সেখানে রোগীকে অস্ত্রোপচার করেন ডাঃ নিকুঞ্জ বিহারী গোলদার। জটিল এ অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে রোগী সুলতা রানী ৭ বছরের যন্ত্রণাময় জীবন থেকে রক্ষা পেলেন। ডাঃ নিকুন্জ্ঞ বিহারী গোলদার জানান, রোগীর বয়স বেশি হয়ে যাওয়ায় অস্ত্রোপচার করা ছিলো সত্যিই ঝুঁকিপূর্ণ। চিকিৎসকেরা সাধারণত রোগীকে জেনারেল ও স্পাইনাল উপায়ে অচেতন করে অস্ত্রোপচার করেন। কিন্তু এ দুই উপায়ে রোগী সুলতার অস্ত্রোপচার করলে তার জ্ঞান না ফেরার সম্ভাবনা ছিলো। তাই তিনি ওই রোগীকে অন্য উপায়ে অস্ত্রোপচার করার সিদ্ধান্ত নেন। তার পরামর্শে রোগীকে ইপি ডোরাল পদ্ধতিতে অচেতন করা হয়। দীর্ঘ কয়েক ঘন্টার অস্ত্রোপচারে তিনি সফলতা পেয়েছেন। ডাঃ নিকুঞ্জ বিহারী গোলদার আরো জানান, ইপি ডোরাল হলো রোগীকে অচেতন করার আধুনিক ও নতুন পদ্ধতি। আমার দীর্ঘ চিকিৎসা জীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে বৃদ্ধা সুলতাকে যন্ত্রণাময় জীবন থেকে মুক্তি দেয়ার ব্যবস্থা করতে পেরেছি। তার পেট থেকে বের করা সাড়ে ৭ কেজি ওজনের টিউমারটি দেখতে অনেকেই ভিড় করে। বর্তমানে রোগী সুস্থ আছেন। তিনি সম্পুর্ণ ঝুঁকিমুক্ত।