জাতির গৌরবের দিন আজ

নিজস্ব প্রতিবেদক>
বাঙালি জাতির জীবনে আজ এক আনন্দের দিন। জাতির মহান গৌরবের সেই দিনটির দেখা মিলেছিল ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর ইতিহাসের পাতায় রক্তিম অক্ষরে লেখা এক সংগ্রামের শেষে এসেছে বহু কাঙ্খিত এ দিনটি। আজ মহান বিজয় দিবস। নয় মাসের যুদ্ধ শেষে ৪৭ বছর আগের এদিনে ঢাকার ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) আত্মসমর্পণ করেছিল বর্বর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী। চূড়ান্ত বিজয়ের মধ্য দিয়ে পৃথিবীর মানচিত্রে অভ্যুদয় ঘটে স্বাধীন বাংলাদেশের।
মহান বিজয় দিবস উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, বিরোধী দলের নেতা রওশন এরশাদ এবং বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া পৃথক বাণী দিয়েছেন। আজ সরকারি ছুটি।
যুদ্ধাপরাধীদের চূড়ান্ত শাস্তির পর জাতির জীবনে যে দায় মুক্তি ঘটেছে,তারপর নতুন এক আনন্দে ও বিজয় এবছরের মহান বিজয় দিবসে যোগ হয়েছে। আর তা হচ্ছে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণের বিশ্ব স্বীকৃতি। ৭ মার্চের ভাষণকে ঐতিহাসিক দলিল হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সাংস্কৃতিক সংস্থা-– ইউনেসকো। ৩১ অক্টোবর এই স্বীকৃতি দেওয়ার কথা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়েছে। এতদিন যে ভাষণ ছিল বাঙালির জাগরণ ও আত্মপ্রত্যয়ের অবিনাশী বাণী, এখন তা পরিণত হল বিশ্বসম্পদে। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ ঢাকার তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) লাখ লাখ মানুষের সমাবেশে বঙ্গবন্ধু তাঁর ঐতিহাসিক ভাষণে বলেছিলেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’। এই বজ্রনির্ঘোষ কন্ঠধ্বনি বাঙালি জাতির স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষায় মূর্ত রূপ দিয়েছিল। যুদ্ধজয়ে প্রাণিত করেছিল। পৃথিবীর অনেক বিখ্যাত ভাষণের কথা আমরা জানি। কিন্তু সেসব ভাষণ ছিল লিখিত। অন্যদিকে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ ছিল অলিখিত। এই ভাষণের পর আন্তর্জাতিক মিডিয়া তাঁকে ‘পোয়েট অফ পলিটিক্স’ বা রাজনীতির কবি হিসেবে অভিহিত করেছিল।
দীর্ঘ নয় মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে ৩০ লাখ শহীদের আত্মত্যাগ, দুই লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে অর্জিত এ বিজয়ের দিনটিতে আনন্দের পাশাপাশি বেদনাও বাজবে বাঙালির বুকে। বিনম্র শ্রদ্ধা ও গভীর কৃতজ্ঞতায় জাতি স্মরণ করবে জানা-অজানা সেই সব শহীদকে। যাদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতার সুফল ভোগ করে পেরিয়ে গেল ৪৭ বছর। কিন্তু যারা সেই সংগ্রামের উত্তাল দিনে জাতির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে হাত মিলিয়েছিল ঘাতক পাকিস্তানি সেনাদের সঙ্গে, সেই রাজাকার-আলবদরদের বিচার না করার কলঙ্ক যেন অনেকটাই ম্লান করেছিল জাতির এই শ্রেষ্ঠ অর্জনকে। দিনে দিনে গণদাবিতে পরিণত হয়ে ওঠা যুদ্ধাপরাধীদের বিচারকাজ অবশেষে শুরু হয়েছিল স্বাধীনতার মাস ২০১০ সালের মার্চে। যা এখনও অব্যাহত। চূড়ান্ত রায় কার্যকর হয়েছে কুখ্যাত যুদ্ধাাপরাধীদের।
আজ সকাল থেকেই সারা দেশে পথে নামবে উৎসবমুখর মানুষ। শহীদদের স্মরণ করে বিনম্র শ্রদ্ধায় দেশের সব স্মৃতিসৌধ ভরিয়ে দেবে ফুলে ফুলে। রাজধানীতে সব বয়সী অগণিত মানুষ সমবেত হবে সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধে। শ্রদ্ধার ফুলে ঢেকে যাবে সৌধের বেদি। জাতি স্মরণ করবে ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে স্বাধিকার আন্দোলনের বিভিন্ন পর্যায়ে যারা আত্মত্যাগ করেছেন, তাদের।
লাল-সবুজ পতাকা উড়বে আজ বাড়িতে ও গাড়িতে, সব প্রতিষ্ঠানে। মাথায় থাকবে পতাকার রঙে রাঙা ফিতা। পতাকার রঙের পোশাকও থাকবে উৎসবে শামিল অনেকের পরনে। পতাকায় সজ্জিত করা হবে রাজধানীসহ দেশের বড় শহরগুলোর প্রধান সড়ক ও সড়কদ্বীপ। আজ সরকারি ছুটি। রাতে গুরুত্বপূর্ণ ভবনে করা হবে আলোকসজ্জা। হাসপাতাল, শিশুসদন ও কারাগারগুলোতে পরিবেশন করা হবে বিশেষ খাবার।
বরাবরের মতোই এবারো যথাযোগ্য মর্যাদায় মহান বিজয় দিবস পালনের বিস্তারিত কর্মসূচি নেয়া হয়েছে। ভোরে ৩১ বার তোপধ্বনির মাধ্যমে দিবসটির সূচনা হবে। সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী সাভার জাতীয় স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ করবেন। এরপর মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রীর নেতৃত্বে বীরশ্রেষ্ঠ পরিবার ও যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধারা পুষ্পস্তবক দেবেন। বিকেলে বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতি মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মানে সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে মিলিত হবেন।