রূপসা নদীর পাড়ে ঘুমিয়ে আছেন বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিন ও বীর বিক্রম মহিবুল্লাহ

 খুলনা প্রতিনিধি :

রূপসা নদীর পাড়ে ঘুমিয়ে আছেন বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিন ও বীর বিক্রম মহিবুল্লাহ

রূপসা নদীর পাড়ে ঘুমিয়ে আছেন বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিন ও বীরবিক্রম মহিবুল্লাহ। দেশ স্বাধীনের ৬ দিন আগে ১০ ডিসেম্বর খুলনাকে শত্রুমুক্ত করতে এসে শহীদদের রক্তে লাল হয় রূপসা নদীর পানি। যাদের মধ্যে অন্যতম দুই শহীদ বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিন ও বীরবিক্রম মুহিবুল্লাহ। সেদিন খুলনা শিপইয়ার্ডের অদূরে নদীতে এ দুই বীর সন্তানসহ এক ঝাঁক মুক্তিকামী সাহসী বীর সেনা মিত্র বাহিনীর বোমা বিস্ফোরণে শহীদ হন।

জানা যায়, চূড়ান্ত বিজয়ের অভিযানের উম্মাদনায় ৭ ডিসেম্বর মুক্তিকামি নৌ-সেনারা নেভাল জেটি হলদিয়া থেকে ৩টি রণতরী বি,এন,এস পদ্মা, পলাশ ও আই, এস, এস পানভেল নিয়ে বাংলার জলসীমায় যাত্রা শুরু করেন। উদ্দেশ্য তাদের হিরণ পয়েন্ট, তৎকালীন চালনা ও খুলনাসহ পাকিস্তানী নৌ-ঘাটি তিতুমীর দখল করা। জাহাজ ৩টি ৯ ডিসেম্বর সকালে সীমান্ত নদী রায়মঙ্গল অতিক্রম করে বাংলাদেশের জলসীমায় প্রবেশ করে। বিজয়ের উল্লাশে আনন্দ ও সাহসীকতা যেন আরো বেড়ে যায়, মুক্তিকামী বীর সেনাদের। শত্রুদের প্রতি নজর রেখে খুব সতর্কতার সাথে সুন্দরবনের অচেনা অজানা জলসীমার পথ ধরে ঐদিন বিকেলে আকরাম পয়েন্টে নোঙ্গর করে পদ্মা, পলাশ ও পানভেল। এর মধ্যে ওই এলাকাসহ পার্শ্ববর্তী এলাকা শত্রুমুক্ত করতে সক্ষম হয়েছিল বীর সেনারা।

১০ ডিসেম্বর ভোর ৪ টায় সেখান থেকে রওনা হয়ে অনেকটা বিনা বাধায় এ দলটি সকাল ৭টার মধ্যে মংলায় যায়। মংলা বন্দর ও চালনাসহ ওই এলাকা শত্রুমুক্ত করে সকালেই খুলনা অভিমুখে রওনা হয় ৩টি রণতরী। রণতরী বহরের প্রথমে ভারতীয় জাহাজ আই,এন,এস পানভেল, মাঝে বি,এন,এস পলাশ ও শেষে আই,এন,এস পদ্মা একই গতিতে এগোতে থাকে। তখন দুপুর ১২ টার দিকে জাহাজ ৩টি খুলনা শিপইয়ার্ডের অদূরে যাওয়া মাত্রই হঠাৎ আকাশে ৪টি বিমান মহড়া দিতে থাকে। নৌ সেনাদলের অধিনায়ক ওয়াকিটকির মাধ্যমে খবর পান বিমানগুলো মিত্র বাহিনীর, আশঙ্কার কোনো কারণ নেই। কিন্তু সামান্য সময়ের মধ্যে ভুল তথ্যে ওই যুদ্ধ বিমানের নিক্ষিপ্ত বোমায় পলাশ ও পদ্মা জাহাজ মারাত্মকভাবে বিধ্বস্ত হয়। আংশিক বিধ্বস্ত পদ্মার ইঞ্জিন বিকল হয়ে নদীর চরে আটকা পড়ে। এদিকে বোমা আর গোলা বারুদে যুদ্ধ জাহাজ পলাশে আগুন ধরে যায়। জীবন বাঁচাতে নদীতে ঝাপিয়ে পড়তে থাকেন আহত যোদ্ধারা। তখন অসংখ্য যোদ্ধাদের তাজা রক্তে লাল হয়ে উঠেছিল রূপসা নদীর ঘোলা পানি।

এদিকে, তখনও জাহাজ পলাশের ইঞ্জিন রুম আর্টি ফিসিয়ার চিপ ই,আর এ রুহুল আমিন অগ্নিদগ্ধ রণতরী পলাশ ও বিপন্ন মুক্তিযোদ্ধাদের জীবন বাঁচাতে কর্তব্যে ছিলেন অটল। অবশেষে নিজের জীবনের মায়া ত্যাগ করে শেষ চেষ্টা চালাতে গিয়েই শহীদ হন রুহুল আমিন। একই জাহাজে লিডিং সিমেন (৬২০৭২১ এ বি) এর দায়িত্বে থেকে বুকের তাজা রক্ত দিয়ে শহীদ হন মহিবুল্লাহ। সেই সাথে আরো শহীদ হন নৌ-সেনা ফরিদ উদ্দিন, আক্তার উদ্দিন, দৌলত হোসেন ও নৌ কমান্ডো রফিকসহ ৯ জন। এছাড়া পদ্মা জাহাজের অধিনায়ক লে. মিত্রসহ ২১ জন নৌ সেনা নদীর পশ্চিম প্রান্তে উঠলে রাজাকারদের হাতে বন্ধী হন।

অপর রণতরী পানভেল দ্রুত পিছু হটে যায় যুদ্ধাহত কিছু সংখ্যক মুক্তি সেনাকে পানভেলে করে পশ্চিম বঙ্গে চিকিৎসার জন্য নিয়ে যায়। কেউ কেউ মৃত্যুর যন্ত্রণায় কাতরাতে কাতরাতে নদীর পূর্বপাড়ে উঠে নিরাপদে স্থান নেয়। জনতা যুদ্ধ বিধ্বস্ত পলাশে থাকা বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিন ও বীরবিক্রম মহিবুল্লাহসহ অন্যান্য শহীদদের মরদেহ রূপসা নদীর পূর্বপাড়ে সমাহিত করেন।

বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ রুহুল আমিন নোয়াখালী জেলার বেগমগঞ্জের বাগচাপরা গ্রামের পিতা মৃত আজাহার আলী মিয়া ও মাতা জোলেখা বেগমের পুত্র। ১৯৩৫ সালের জুন মাসে নোয়াখালীর বাগচাপরা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন রুহুল আমিন। রুহুল আমিন হাইস্কুলে পড়ার সময় থেকেই তার বাবার আর্থিক স্বচ্ছলতা কমতে থাকে, ছুটতে হয় রুহুল আমিনকে জীবিকা নির্বাহের জন্য। ১৯৫৩ সালে তিনি হাইস্কুল পাস করে নৌ বাহিনীতে জুনিয়র মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার হিসাবে যোগদান করেন এবং প্রাথমিক প্রশিক্ষণের জন্য গমন করেন পি,এন,এস,এ। ১৯৫৮ সালে তিনি সফলভাবে পেশাগত প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করেন। ১৯৬৫ সালে ম্যাকানিশিয়ান কোর্সের জন্য নির্বাচিত হন, সফলভাবে কোর্স সমাপ্ত করে তিনি ইঞ্জিন রুম আর্টিফিসার পদে নিযুক্ত হন। ১৯৬৮ সালে তিনি চট্টগ্রামের পি,এন,এস বখতিয়ার নৌঘাটিতে বদলি হন। ১৯৭১ সালে যুদ্ধ শুরু হলে পরিবারের মায়া ছেড়ে যুদ্ধে যোগ দেয়ার সিদ্ধান্ত নেন রুহুল আমিন। এপ্রিল মাসে ত্রিপুরা সীমান্ত অতিক্রম করে ২নং সেক্টরে যোগ দেন। সেপ্টেম্ব মাসে তিনি বহু যুদ্ধে অংশ নেন। ওই মাসেই বাংলাদেশ নৌবাহিনী গঠনের উদ্দেশ্যে সকল সেক্টর থেকে সাবেক নৌ সেনাদের প্রাথমিক কাঠামো গঠন করেন। সেনাদের কোলকাতায় আনা হয়, সেখানে অন্যান্যদের সাথে রুহুল আমিনও ছিলেন। ভারত সরকার বাংলাদেশ নৌবাহিনীকে ২টি টাগবোর্ট উপহার দেয়, পরে টাগবোর্ট ২টি কে গান বোর্টে রুপান্তরিত করে পদ্মা ও পলাশ নাম দেওয়া হয়।

শহীদ বীরবিক্রম মহিবুল্লাহ মো. সুজা আলীর পুত্র এবং মহিবুল্লাহ এর পুত্রের নাম সালাহউদ্দিন জুয়েল।

জেএইচ/এসবি