রোহিঙ্গাদের ফেরানোর চুক্তির সপ্তাহেও পোড়ানো হয় বহু গ্রাম: এইচআরডব্লিউ

নিউজ ডেস্ক>
মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে গত দুই মাসে আরও অন্তত ৪০টি রোহিঙ্গা গ্রাম জ্বালিয়ে দেওয়ার প্রমাণ পাওয়ার কথা বলেছে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)।

অক্টোবর ও নভেম্বরে মংডু, বুথিডং ও রাথিডংয়ের এক হাজার গ্রামের স্যাটেলাইট ছবি বিশ্লেষণ করে মানবাধিকার সংস্থাটি বলছে, দুই মাসের মধ্যে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের লক্ষ্যে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে যখন চুক্তি হল, ওই সপ্তাহেও কয়েকটি গ্রাম পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।

গত ২৫ অগাস্ট রাখাইনে সেনা অভিযান শুরুর পর ২৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত স্যাটেলাইট ইমেজে ২৮৮টি রোহিঙ্গা গ্রাম পোড়ানোর চিহ্ন পাওয়ার কথা এর আগে জানিয়েছিল এইচআরডব্লিউ।

রোববার আরেক প্রতিবেদনে তারা জানিয়েছে, অক্টোবর ও নভেম্বরে নতুন ৪০টি গ্রাম মিলিয়ে রোহিঙ্গাদের অন্তত ৩৫৪টি গ্রাম পুড়িয়ে দেওয়ার প্রমাণ তাদের হাতে এসেছে।

মংডুর স্যাটেলাইট ছবি, ২ ডিসেম্বরওইসব গ্রামের হাজার হাজার বাড়ি আংশিক বা পুরোপুরি ভষ্মীভূত হয়েছে, যেগুলোর বাসিন্দা ছিলেন মূলত রোহিঙ্গা মুসলমানরা।

আর গত দুই মাসে নতুন করে বহু রোহিঙ্গা মিয়ানমার থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। সব মিলিয়ে গত সাড়ে তিন মাসে বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গার সংখ্যা সাড়ে ছয় লাখ পেরিয়ে গেছে।

রোববার এইচআরডব্লিউর এক ‍বিবৃতিতে বলা হয়, গত দুই মাসে যে ৪০ গ্রামে ধ্বংসযজ্ঞ চালানোর চিহ্ন ছবিতে দেখা গেছে, তার মধ্যে ২৪টি পোড়ানো হয়েছে অক্টোবরে। আর নভেম্বরে পোড়ানো হয়েছে ১১টি। পাঁচটি গ্রাম দুই মাসেই জ্বলতে দেখা গেছে উপগ্রহ থেকে পাঠানো ছবিতে।

রাখাইনের ৩০টি পুলিশ পোস্ট ও একটি সেনা ক্যাম্পে সমন্বিত হামলার পর ২৫ অগাস্ট থেকে সেনাবাহিনীর এই দমন অভিযান শুরু হয়, যাকে ‘জাতিগত নির্মূল অভিযান’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে জাতিসংঘ।

অন্যদিকে মিয়ানমার সরকার ওই হামলার জন্য রোহিঙ্গা গেরিলাদের একটি দলকে দায়ী করে আসছে। সেনাবাহিনীর অভিযানকে তারা বলছে ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে লড়াই’।

 

মিয়ানমারের নেত্রী অং সান সু চি আন্তর্জাতিক চাপের মুখে গত ১৮ অগাস্ট প্রথমবারের মত রোহিঙ্গা সঙ্কট নিয়ে ভাষণ দিতে এসে দাবি করেন, ৫ সেপ্টেম্বরের পর রাখাইনে আর কোনো দমন অভিযান চালানো হয়নি।

কিন্তু এইচআরডব্লিউ বলছে, এ পর্যন্ত যে ৩৫৪টি গ্রাম পুড়িয়ে দেওয়ার প্রমাণ তাদের হাতে এসেছে, তার মধ্যে অন্তত ১১৮টিতে ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয়েছে ৫ সেপ্টেম্বরের পর।

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত সপ্তাহে ফ্রান্স টোয়েন্টিফোরকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে গত ২৩ নভেম্বর বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে সম্মতিপত্র সই হওয়ার সময় ঢাকার পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, যারা ফিরে যাবেন, তাদের আশ্রয় ও নিরাপত্তার সব বন্দোবস্ত মিয়ানমারকে করতে হবে। মিয়ানমার সরকারও তাতে সম্মতি দিয়েছিল।

কিন্তু এইচআরডব্লিউ বলছে, তাদের হাতে নতুন যে স্যাটেলাইট ছবি এসেছে, সেখানে ২৫ নভেম্বরও মংডুর মায়ো মি চ্যাং গ্রামে বাড়িঘর জ্বলতে দেখা গেছে।

২৫ নভেম্বর থেকে ২ ডিসেম্বর পর্যন্ত অন্তত চারটি রোহিঙ্গা গ্রামে ধ্বংসযজ্ঞ চলার চিহ্ন দেখা গেছে উপগ্রহ থেকে তোলা ছবিতে।
এইচআরডব্লিউর এশিয়া বিষয়ক পরিচালক ব্র্যাড অ্যাডামস বলেন, “চুক্তি স্বাক্ষরের কয়েক দিনের মধ্যে রোহিঙ্গা গ্রামে সেনাবাহিনীর ধ্বংসযজ্ঞ চালানো থেকে এটাই প্রমাণ হয়, রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি শুধুই লোক দেখানো।”

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় রাখাইনের ওই এলাকায় জাতিসংঘের ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশন পরিচালনার সুযোগ দিতে আহ্বান জানিয়ে এলেও মিয়ানমার সরকার তাতে সাড়া দেয়নি।

বরং রোহিঙ্গা গ্রামগুলোতে ব্যাপক নৃসংশতা ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ নিয়ে অভ্যন্তরীণ তদন্তের পর মিয়ানমারের সেনাবাহিনী এক প্রতিবেদনে বলেছে, তাদের সৈন্যরা সেসব কিছুই করেনি।

তবে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন মেদসঁ সঁ ফ্রঁতিয়ে গত ১৪ ডিসেম্বর এক প্রতিবেদনে বলেছে, অগাস্টে রাখাইনে সেনা অভিযান শুরুর পর প্রথম মাসেই অন্তত ৬৭০০ রোহিঙ্গা নিহত হয়েছে। এর মধ্যে অন্তত ৭৩০ জনের বয়স পাঁচ বছর বা তার কম।

জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাই কমিশনার যেইদ রাদ আল-হুসেইন বিবিসিকে এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, রোহিঙ্গাদের ওপর যে নৃশংসতা হচ্ছে, তা অত্যন্ত সুপরিকল্পিত। ভবিষ্যতে কোনো আদালত যদি এ ঘটনাকে গণহত্যা হিসেবে সাব্যস্ত করে, তাতে তিনি মোটেও অবাক হবেন না।