‘এক্সরে ফ্লিমে কিছু বোঝা যাচ্ছে না, আল্ট্রাসনোতে কালার নেই’

বিল্লাল হোসেন>
‘গত ১৯ ডিসেম্বর যশোর সদর উপজেলার দোগাছিয়া গ্রামের দিন মজুর শাহজাহান আলী অসুস্থ ছেলে রাজন হোসেনকে নিয়ে যান যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে। ৫ টাকা দিয়ে টিকিট কেটে রোগিকে নিয়ে যান বহিঃবিভাগের দায়িত্বরত চিকিৎসক একেএম জাহাঙ্গীর আলমের কাছে। তিনি রোগিকে দেখেই একটি এক্সরে করতে বলেন। যথারীতি সরকারি এ হাসপাতাল থেকে এক্সরে করানোর পর পুনরায় চিকিৎসকের কাছে যান রোগি। চিকিৎসক এক্সরে ফ্লিম দেখে বলেন হাসপাতাল থেকে করা এক্সরে ফ্লিমে কিছু বোঝা যাচ্ছে না। ডিজিটাল এক্সরে করে আনেন। শাহজাহান আলী ছেলের চিকিৎসা দিকে অগত্য একটি বেসরকারি ক্লিনিক থেকে পুনরায় এক্সরে করে আনার পর ওই চিকিৎসক রোগির চিকিৎসাসেবা দেন।’
গত দু সপ্তাহের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, শুধু ডাক্তার জাহাঙ্গীর আলম নয় বহিঃবিভাগে দায়িত্বরত প্রায় চিকিৎসক হাসপাতাল থেকে করানো এক্সরে ছাড়াও অন্য কোন রিপোর্টও দেখতে চান না। বিশেষ করে হাসপাতাল থেকে করা আল্ট্রাসনো রিপোর্ট দেখেনই না গাইনী বহিঃবিভাগে দায়িত্বরত ডা. লুৎফুন্নাহার লাকি।
হাসিনা খাতুন নামে এক নারী জানান, তিনি অন্তঃসত্ত্বা পুত্রবধূকে ডাক্তার দেখানোর জন্য নিয়ে যান চিকিৎসক লুৎফুন্নাহার লাকির চেম্বারে। তিনি রোগীর টিকিট হাতে নিয়ে কোনো ওষুধ না লিখেই আল্ট্রাাসনো রিপোর্ট করতে পাঠিয়ে দেন। ডিজিটাল রিপোর্ট করাতে বলেন তিনি। কিন্তু তার সামর্থ্য না থাকায় বেসরকারি স্বাস্থ্য কেন্দ্রে না গিয়ে সরকারি এ হাসপাতাল থেকেই পরীক্ষাটি করান। পরে রিপোর্টসহ রোগি ব্যবস্থাপত্র নিতে যান। হাসপাতালের রিপোর্ট দেখেই ডা. লুৎফুন্নাহার লাকি ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। তিনি রোগিকে বলেন, এখানকার রিপোর্ট ভালো হয় না আপনি কেন কালার আল্ট্রাসনো করেননি। এ সময় তাকে চিকিৎসা না দিয়েই বের করে দেয়া হয়। পরে এক রোগির চিকিৎসাসেবা প্রদান করেন গাইনী বিভাগের আবাসিক সার্জন ডাঃ নিলুফার ইসলাম অ্যামেলি।
চিকিৎসকরা যখন হাসপাতালে রিপোর্ট বাতিল করে দিচ্ছেন তখন রোগিদের একটি নির্দিষ্ট প্রাইভেট হাসপাতাল বা ক্লিনিকের নামও বলে দিচ্ছেন যেখান থেকে রিপোর্ট করালেই গ্রহণযোগ্য হবে।
হাসপাতালের প্রশাসনিক সূত্র জানায়, অনেক বেসরকারি স্বাস্থ্য কেন্দ্র থেকে সরকারি এ হাসপাতালের আল্ট্রাসনো রিপোর্টের মান অনেক ভালো। এখানে অনেক দক্ষ চিকিৎসক আল্ট্রাসনো রিপোর্ট করেন। তারপরেও কতিপয় চিকিৎসক কেন হাসপাতাল থেকে করা আল্ট্রাসনো রিপোর্ট দেখতে চান না তা বোঁধগম্য নয়।
রোগির স্বজনদের অভিমত, কমিশন বাণিজ্যের কারণে সরকারি হাসপাতাল থেকে করা এক্সরে আল্ট্রাসনো রিপোর্ট দেখতে অনিহা প্রকাশ করেন চিকিৎসকেরা। এতে তারা লাভবান হলেও সরকারি হাসপাতালে রাজস্ব কমছে। আর আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে রোগী ও তাদের স্বজনেরা। তাদের দাবি এখন রোগি বা তার স্বজনরা কী করবেন? হয় সরকারি খরচের রিপোর্ট দেখতে হবে না হয় হাসপাতালের মেশিনগুলোর কাজ বন্ধ করে দিতে হবে। কতিপয় চিকিৎসক আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ার জন্য বাইরে থেকে রিপোর্ট করাতে বেশি আগ্রহী বলে মনে হচ্ছে।
আলাপকালে একাধিক রোগীর জানান, অন্য কোন পরীক্ষার রিপোর্টের ব্যাপারে চিকিৎসকের অনিহা থাকলেও হাসপাতাল থেকে করা এক্সরে রিপোর্ট তারা দেখেন না।
এ প্রসঙ্গে অর্থোপেডিক বিভাগের এক চিকিৎসক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, হাসপাতাল থেকে করা এক্সরে রিপোর্টের মান ভালো না। এতো দুর্বল এক্সরে দেখে রোগীর রোগ নির্ণয় করা কষ্টকর। তাই রোগীদের ডিজিটাল এক্সরে করতে বলা হয়।
তবে প্রসঙ্গটি নিয়ে ভিন্ন মত পোষণ করেছেন হাসপাতালের মেডিকেল টেকনোলজিষ্ট মৃত্যুঞ্জয় কুমার রায়। তিনি জানিয়েছেন, হাসপাতালের মেশিন হিসেবে এক্সরে রিপোর্টের মান অনেক ভালো। কিন্তু চিকিৎসকেরা ডিজিটাল রিপোর্টের প্রতি আসক্ত হওয়ায় হাসপাতালে এক্সরের সংখ্যা অনেক কমে গেছে। এখন প্রতিদিন এখানে ১০ থেকে ১২টা এক্সরে হয়। অথচ একসময় সরকারি এ হাসপাতালে ৮০ থেকে ৯০ জন রোগীর এক্সরে করা হতো। চিকিৎসকেরা আন্তরিক হলে আবারো হাসপাতালে এক্সরে করার সংখ্যা বাড়বে।
বিষয়টি নিয়ে কথা হয় হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডাঃ একেএম কামরুল ইসলাম বেনুর সাথে। তিনি দৈনিক স্পন্দনকে জানিয়েছেন, বহিঃবিভাগ ও অন্তঃবিভাগে দায়িত্বরত প্রত্যেক চিকিৎসককে নির্দেশনা দেয়া আছে হাসপাতাল থেকে করা এক্সরে আল্ট্রাসনোসহ বিভিন্ন রিপোর্টের প্রতি গুরুত্ব দেয়ার জন্য। তবে কোন রোগি নিজ ইচ্ছায় ডিজিটাল পরীক্ষা নিরীক্ষা করার বিষয়টি ভিন্ন। কিন্তু হাসপাতালের রিপোর্ট দেখতে অনিহা প্রকাশের বিষয়টি জানা ছিলোনা। তিনি অবশ্যই খোঁজ নিয়ে দেখবেন। কেউ নির্দেশনা অমান্য করলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।