যশোরে আরও একটি খুন লক্ষ্যভ্রষ্ট গুলিতে নিহত নিরীহ চা দোকানি

নিজস্ব প্রতিবেদক:যশোরে আরও একটি হত্যার ঘটনা ঘটলো গতকাল। এ নিয়ে শহরে তিনজন খুন হলেন। এবার নিহত হয়েছে সন্ত্রাসীদের লক্ষ্যভ্রষ্ট গুলিতে এক নিরীহ চা দোকানি। শহরের বেজপাড়া টিবি ক্লিনিক মোড়ে বেলা সোয়া ১১টার দিকে প্রকাশ্যে এক সন্ত্রাসীকে লক্ষ্য করে তার প্রতিপক্ষ গুলি করলে এ ঘটনা ঘটে। এর পরপরই বেজপাড়া ও ষষ্টিতলা এলাকায় পাল্টাপাল্টি বাড়ি ভাংচুর ও বোমবাজি করে সন্ত্রাসীরা আতঙ্কের সৃষ্টি করে।
গতকাল নিহত টিপু সুলতান (২৩) বেজপাড়া টিবি ক্লিনিক এলাকার মোহাম্মদ আলীর ছেলে এবং একই এলাকার সুভাস কুমারের বাড়ির ভাড়াটিয়া।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, টিপুর টিবি ক্লিনিক মোড়ে রাণী ভিলার নিচে রাস্তার পাশে একটি চায়ের দোকান আছে। বেলা সোয়া ১১টার দিকে তিনি দোকানে কাজ করছিলেন। এ সময় একই এলাকার সন্ত্রাসী সোহেল ওরফে ট্যাবলেট সোহেল তার দোকানের সামনে কালভার্টের ওপর দাঁড়ায়। সে সময় ষষ্টিতলার দিক দিয়ে একটি মোটর সাইকেলে করে এসে রেল রোড খাটপট্টি এলাকার রবিউল ইসলামের ছেলে রাব্বি ইসলাম শুভ এবং ষষ্টিতলাপাড়ার নিত্য ঘোষের ছেলে শিশির ঘোষ সেখানে যায়। আরও একটি মোটর সাইকেলে আরও তিনজন ছিল। শিশির মোটর সাইকেল চালাচ্ছিল এবং শুভ পেছনে বসা ছিল। শুভ একটি পিস্তল দিয়ে ট্যাবলেট সোহেলকে লক্ষ্য করে একটি গুলি করে। ঘটনাটি বুঝতে পেরে সোহেল একপাশে সরে গেলে গুলিটি তার পেছনে দোকানের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা টিপুর বুকে বিদ্ধ হয়। এরপর ট্যাবলেট সোহেল দৌড়ে টিবি ক্লিনিকের দিকে চলে যায়। সে সময় মোটরসাইকেল নিয়ে শুভ ও শিশির তার পিছে ধাওয়া করে। সোহেলকে পালিয়ে গেলে তারা ফিরে এসে ষষ্টিতলা পাড়ার দিকে চলে যায়। এসময় আশেপাশের লোকজন এসে দোকানের মধ্যে পড়ে থাকা টিপুকে ২৫০ শয্যা হাসপাতালে নিয়ে গেলে জরুরি বিভাগের চিকিৎসক ডা. কল্লোল কুমার সাহা মৃত ঘোষণা করেন। গুলিটি তার বুকের বাম পাশে বিদ্ধ হয়ে ভেতরেই থেকে যায়।
ঘটনার পর সেখানে উপস্থিত হন যশোরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সালাহউদ্দিন সিকদার, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ক সার্কেল নাইমুর রহমান, কোতয়ালি থানার পরিদর্শক (ইন্টেলিজেন্স অ্যান্ড কমিউনিটি পুলিশিং) আলমগীর হোসেনসহ উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। তারা বলেছেন, সন্ত্রাসীর ছোড়া গুলিতে মারা গেছে টিপু নামে এক দোকানদার। কারা গুলি করেছে তা অনুমান করা গেছে। এখন আসামি আটকের চেষ্টা চলছে। পুলিশ সেখান থেকে একটি গুলির খোসা উদ্ধার করে।
নিহতের মামা মিলন হোসেন বলেছেন, টিপু টিবি ক্লিনিক মোড়ের রাস্তার পাশে একটি ছোট টোঙ ঘরে সিঙ্গাড়া-পুরি বিক্রি করে। টিপু তার মা বাবার এক মাত্র ছেলে। তারা এক ভাই, এক বোন। সাড়ে তিন বছরের তাজিম নামে এক ছেলে রয়েছে টিপুর।
নিহতের মা ডালিয়া বেগম এবং স্ত্রী সুমী খাতুন জানিয়েছেন, সকালে লোক মুখে তারা জানতে পারেন টিপুর বুকে গুলি লেগেছে এবং সে হাসপাতালে মারা গেছে। সন্ত্রাসী শুভ নাকি মেরেছে। ট্যাবলেট সোহেলকে মারতে গিয়ে গুলিটি টিপুর বুকে লাগে।
এই ঘটনায় ১২ জনের নাম উল্লেখ করে কোতয়ালি থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন নিহতের মা ডালিয়া বেগম।
যাদের অভিযুক্ত করা হয়েছে তার হলো ষষ্টিতলাপাড়ার মাহবুব আলম ম্যানসেল, রেলরোডস্থ খাটপট্টি এলাকার শুভ, ষষ্টিতলা পাড়ার শিশির ঘোষ, শংকরপুর এলাকার ফারুক হোসেনের ছেলে সাহেদ হোসেন নয়ন, ষষ্টিতলাপাড়ার আরিফ, আল-আমিন, নান্টু, বারান্দী মোল্লাপাড়ার রিপন হোসেন ওরফে ডিম রিপন, ষষ্টিতলার সজল, হাসান এবং রবিউল। এছাড়া অজ্ঞাত ৪/৫ জনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযুক্তদের অবৈধ অস্ত্রধারী, কুখ্যাত সন্ত্রাসী, মাদক ব্যবসায়ী হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
স্থানীয়রা জানিয়েছে, বেজপাড়া টিবি ক্লিনিক এলাকা, ষষ্টিতলাপাড়া এলাকাজুড়ে সন্ত্রাসীদের দুইটি গ্রুপের মধ্যে রয়েছে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে দ্বন্দ্ব। সুযোগ পেলেই ম্যানসেল গ্রুপ এবং সন্ত্রাসী ট্যাবলেট সোহেল গ্রুপ একে অপরকে আক্রমণ করে থাকে। ২/৩ সপ্তাহ আগে নীল রতন ধর রোডে (ভোলাট্যাং রোড) সন্ত্রাসী শিশির ও শুভকে আক্রমণ করে সন্ত্রাসী ট্যাবলেট সোহেল। তাদের লক্ষ্য করে গুলি ছোড়া হয়। কিন্তু গুলি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়েছিল। তারই প্রতিশোধ নিতে শুভ-শিশির গ্রুপ শনিবার ট্যাবলেট সোহেলের ওপর হামলা করে। কিন্তু ট্যাবলেট সোহালের কিছু না হলেও প্রাণ গেলো একজন নিরীহ চা দোকানির। ঘটনার পর পুলিশ ঘটনাস্থলের পাশের একটি ভবনের সামনে স্থাপন করা সিসি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করেছে । ভিডিও ফুটেজে হত্যাকারী চিহ্নিত হবে বলে এলাকার লোকজন ধারণা করছেন।
এ দিকে ওই ঘটনার পর দুপুরে ট্যাবলেট সোহেল পক্ষীয়রা হামলা চালায় সন্ত্রাসী শুভ ও শিশির ঘোষের বাড়িতে। এছাড়া ষষ্টিতলাপাড়ার নিশান, মানিক এবং হাজির মেসে হামলা চালিয়ে জিনিস পত্র ভাঙচুর করা হয়। প্রত্যেক বাড়ির সামনে বোমার বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। শিশিরের মা চায়না ঘোষ জানিয়েছেন, ওই এলাকার ১৫/২০ জন তাদের বাড়িতে বেলা আড়াইটার দিকে আচমকা হামলা চালায়। শিশিরকে না পেয়ে ঘরের মধ্যে ঢুকে আসবাবপত্র ভাঙচুর করে। একই অভিযোগ করেছেন নিশান হোসেন। তিনি বলেছেন, ম্যানসেল দাঁড়িয়ে ছিল। আর তার নির্দেশে শিশির, রমজান, সাগর, শুভ ভাইপো রানাসহ ১০/১২ তাদের বাড়িতে হামলা চালিয়ে জিনিসপত্র ভাঙচুর করেছে। এ সময় তার ভাই আরিফ বাঁধা দিতে গেলে তাকে মেরে হাত ভেঙ্গে দেয়া হয়েছে। পরে শিশিরের বাড়ির পাশের একটি ছাত্র মেসে হামলা করেছে সন্ত্রাসীরা। পুলিশ সংবাদ পেয়ে ষষ্টিতলা পাড়ায় গেলে সন্ত্রাসীরা পালিয়ে যায়। সেখান থেকে জালেরকাঠিসহ বিস্ফোরিত বোমার স্পিøন্টার উদ্ধার করে। বর্তমানে ওই এলাকায় পরিস্থিতি থমথমে রয়েছে।
এ দিকে গুলিতে নিহত টিপুর লাশ নিয়ে মিছিল করেছে এলাকাবাসি। তারা লাশ নিয়ে কোতয়ালি থানায় যান বিকেল সাড়ে তিনটার দিকে। সেখানে আধাঘন্টা সময় অবস্থান নেয়া হয়। পরে আসামি আটকের আশ্বাস পেয়ে এলাকাবাসি লাশ বাড়িতে নিয়ে যায়।
কোতয়ালি থানার পরিদর্শক আলমগীর হোসেন জানিয়েছেন, নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে একটি অভিযোগ দেয়া হয়েছে থানায়। আমরা সেটা পর্যালোচনা করছি। প্রকৃত আসামি সনাক্ত এবং আটকের চেষ্টা চলছে।
এ নিয়ে যশোরে এ ডিসেম্বর মাসে তিনজন খুন হলেন। এর আগে ১ ডিসেম্বর শহরের জেলা প্রশাসকের কার্যালয় চত্বরের কালেক্টরেট পার্কে খুন হয় রনি ওরফে বাবু ও ২ ডিসেম্বর যশোর উপশহরে খুন হন এনজিও পরিচালক গোলাম কুদ্দুস ভিকু।