আগুনে নিঃস্ব হয়ে গেল একটি পরিবার

মিরাজুল কবীর টিটো>
যশোরে ভয়াবহ আগুনে নিঃস্ব হয়ে গেল একটি পরিবার। বাড়ির উপার্জনক্ষম দুই পুরুষের এক সাথে প্রাণহানি দুই নারীকে পথে বসিয়ে দিল বলে জানিয়েছেন তাদের আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীরা।
তিন বছর বয়সী শিশু আরাফাতের কিছু বোঝার বয়স তার হয়নি। বাবা চাচা মারা গেছে জানে না। তাকে বললেও সে বুঝবে না। শুধু এদিক ওদিক তাকিয়ে বাবাকে খুঁজছে এ অবুঝ শিশু। মাকে জিজ্ঞাসা করছে বাবার কথা। এই অবুঝ শিশু তার বাবাকে আর কোনো দিন দেখতে পাবে না। পাবে না বাবার আদর।
সোমবার আরাফাতের বাবা আজহারুল ইসলাম পিকলু (৩৪) ও চাচা রুহুল আমিনের (২৫) গ্যারেজে আগুনে মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। উপার্জনক্ষম দুইজনকেই হারিয়ে দিশেহারা পরিবারের অন্যরা। সন্তান হারিয়ে পিকলুর মা বেলুকা বেগম (৫০) বুক চাপড়িয়ে চিৎকার করে কেঁদে কেঁদে বলতে থাকেন, আমার দুই সোনার মানিক, বুকের ধন হারিয়ে গেছে। তাদেরকে আর কোনো দিন পাব না। কে আমাকে আয় করে খাওয়াবে। কে মা বলে ডাকবে।
গতকাল নিহত পিকলুর বাড়ি গিয়ে দেখা গেছে সেখানে ছিল শোকার্ত এলাকাবাসীর উপচে পড়া ভিড়। উপস্থিত মানুষেরা স্বজন হারানোদের সান্ত্বনা দিতে গিয়ে কেঁদে ফেলেন। এতে ওই বাড়িতে হৃদয়বিদারক পরিবেশের সৃষ্টি হয়। নিহত পিকলুর মামি শাহেদা বেগম জানান, ১২ বছর আগে নির্মাণ শ্রমিক বাবা মারা গেলে সংসারের হাল ধরে পিকলু। তার সাথে কাজে রাখে আপন ছোট ভাই রুহুল আমিনকে। তাদের মৃত্যুতে উপার্জন করার আর কেউ থাকলো না এ পরিবারে। তিনি আরো জানান, পিকলু সকালে খেয়ে কাজে যায়। দুপুরে খেতে আসেনি। আর রাতে দুই ভাইয়ের মর্মান্তিক মৃত্যু ঘটলো। পিকলুর স্ত্রী তানিয়া বেগম ছয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা। স্বামী হারিয়ে তিনি বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন। তার অনাগত সন্তান জন্মের আগেই বাবাকে হারালো। নিহত পিকলুর শ্যালিকা তালজিলা চিৎকার করে কেঁদে কেঁদে বলতে থাকে। আমার দুলা ভাইকে আর পাব না। কেউ আর আমাকে আদর করবে না। পরীক্ষা দিতে নিয়ে যাবে না। হে আল্লাহ এমনটি কেন হলো! কাকে আমি দুলাভাই বলে ডাকবো। তার সাথে ঘুরতে যাবো।
এদিকে যশোর মাগুরা সড়কের কিসমত নওয়াপাড়ায় ওয়ার্কশপে আগুন লাগার ঘটনায় আলাদা দু’টি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। মামলা করা হয়েছে অপমৃত্যুর। যশোর কোতয়ালি থানার এসআই নজরুল ইসলাম গতকাল মামলাটি করেছেন। আর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকা কাভার্ড ভ্যানের মালিক ও চালক হুমায়ন কবীর ও হেলপার আশরাফুল হাসপাতাল থেকে গোপনে চলে গেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
এদিকে দু’টি তদন্ত কমিটির মধ্যে একটি তিন সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে যশোর ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে। এই কমিটির আহ্বায়ক ফায়ার সার্ভিসের খুলনা বিভাগের উপপরিচালক আবুল হোসেন, যশোর ফায়ার সার্ভিসের সহকারী পরিচালক পরিমল চন্দ্র কুণ্ডু ও সিনিয়র স্টেশন কর্মকর্তা। কমিটিকে সাতদিনের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে গঠন করা কমিটির আহ্বায়ক করা হয়েছে যশোরের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট একেএম মামুনুজ্জামানকে। সেই সাথে একটিতে পুলিশের প্রতিনিধি ও জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তা সদস্য রয়েছেন।
এদিকে, গতকাল নিহত দুইজনের বাড়িতে যান যশোর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি শহিদুল ইসলাম মিলন, নওয়াপাড়া ইউপি চেয়ারম্যান নাসরিন সুলতানা খুশি। তারা শোকাহত পরিবারকে সমবেদনা জানান।
সোমবার রাতে যশোর শহরতলীর কিসমত নওয়াপাড়ায় একটি গ্যারেজে রসায়নিক তরল পদার্থে ভরা ব্যারেলবাহী একটি কাভার্ড ভ্যানে ঝালাই করার সময় আগুন ধরে যায়। বিকট শব্দে কাভার্ড ভ্যানের পেছনের অংশ বিষ্ফোরিত হয়। প্রকম্পিত হয়ে ওঠে এলাকা। ভ্যানটিতে ২২০টি ব্যারেল ছিল বলে ফায়ার সার্ভিস কর্মকর্তা পরিমল কু-ু জানান। কাভার্ড ভ্যানের আগুন ছড়িয়ে পড়ে পুড়ে গেছে আরো চারটি গাড়ি। এর মধ্যে তিনটি কাভার্ড ভ্যান ও একটি ট্রাক। রাত সাড়ে ১০টার দিকে আগুন কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসলে প্রথম আগুন লাগা গাড়ির নিচ ও পাশ থেকে উল্লিখিত দুই ভাইয়ের মরদেহ উদ্ধার করে ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা। গ্যারেজটি যশোর-মাগুরা সড়ক লাগোয়া। আগুনে আহত হয়েছেন রসায়নিক পদার্থবাহী গাড়ির মালিক ও চালক কবির হোসেন ও হেলপার আশরাফুল। তারা গাড়ির ভেতরে ছিলেন। আগুন দেখতে পেয়ে লাফিয়ে নিচে নামেন। কবিরের চুল ও শরীরের কিছু অংশ ঝলসে গেছে।
ফায়ার সার্ভিস কর্মকর্তা পরিমল কুন্ডু বলেন, রসায়নিক পদার্থটি কী ছিল তা জানতে পরীক্ষা করা হচ্ছে।