স্বাগত ২০১৮

মুর্শিদুল আজিম হিরু>
শুভ নববর্ষ। স্বাগত ২০১৮ খ্রিস্টাব্দ। নতুন বছরের প্রথম সূর্য উঠেছে আজ। বহু ঘটনার স্বাক্ষী হয়ে কাল রাত ১২টা ১ মিনিটের সাথে সাথে স্মৃতি হয়ে গেল ২০১৭ খ্রিস্টাব্দ। নতুন বছরকে স্বাগত জানাতে মানুষের উদ্দীপনার কমতি ছিল না। রাত ১২টা ১ মিনিটে ব্যাপক উচ্ছ্বাসের সাথে বিশ্ববাসীর সাথে আমরাও স্বাগত জানিয়েছে নববর্ষকে।
দেশবাসীকে শুভেচ্ছা জানিয়ে বাণী দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি অ্যাডভোকেট আব্দুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, বিরোধী দলীয় নেতা রওশন এরশাদ, বিএনপির সভানেত্রী খালেদা জিয়া।
বছর শেষে প্রাপ্তি অপ্রাপ্তির হিসাব মেলানোর ইচ্ছা জাগে সবার। নানা উত্থান-পতন, প্রাপ্তি ও বিসর্জনের মধ্যদিয়ে কেটেছে ২০১৭ খ্রিস্টাব্দ। ছিল কিছু আলোচিত সমালোচিত ঘটনা।
বর্তমান সরকারের ধারাবাহিক সফলতার একটি হচ্ছে বছরের প্রথম দিন শিক্ষার্থীদের হাতে নতুন বই তুলে দেয়া। নবমবারের মত এবারও বছরের প্রথম দিনটি শুরু হবে বই উৎসব দিয়ে। এ উৎসবে অংশ নিবে দেশের লাখ লাখ শিশু কিশোর। শিক্ষাকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে এ সরকার। তারই ধারাবাহিকতায় বছরের প্রথম দিনই প্রথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের হাতে নতুন বই তুলে দেয়া হয়। প্রাথমিক ও গণ শিক্ষা মন্ত্রনালয় এদিন দেশের শিক্ষার্থীদের জন্য ‘বই উৎসব’ হিসেবে ঘোষনা করা হয়েছে। গত কয়েক বছরের চেয়ে এবার হরতাল অবরোধের বাধা ছাড়ায় শিক্ষার্থীরা দিয়েছে সকল পরীক্ষা। এ বছরও যেন কোন হরতাল অবরোধ কবলে শিক্ষার্থীরা না হয় এটায় কাম্য দেশবাসির।
হাওরাঞ্চলে আগাম বন্যার পর ভারি বর্ষণে পাহাড় ধসের পাশাপাশি ফের মৌসুমি বন্যা, সঙ্গে নিয়মিত বিরতিতে সাগরে নিম্নচাপ ও ঘূর্ণিঝড় মিলিয়ে বিদায়ী বছর জুড়ে দেশের সবপ্রান্তে ছিল দুর্যোগের হানা। এছাড়া বছর জুড়ে ছোটোখাটো ভূমিকম্প, ঝড়-জলোচ্ছ্বাস, বজ্রবৃষ্টি, বজ্রপাতসহ নানা ধরনের বৈরী আবহাওয়া। সবকিছু মোকাবেলা করে দেশের মানুষ নতুন বছরে নতুন সপ্ন নিয়ে বাঁচতে চায়।
বর্তমান সরকারের সফলতা অনেক। সবচেয়ে বড় সফলতা হলো পদ্মসেতুর দৃশ্যমান হওয়া। পরামানু বিশ্বে বাংলাদেশে। এ বছার পানায় পারমানবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মুলস্থাপনার আনুষ্ঠানিক উদ্ধোধন করা হয়। তথ্যপ্রযুক্তি খাতে বেশ কয়েকটি নতুনের স্বাদ নিয়েছে বাংলাদেশ। এর মধ্যে এ খাতের রপ্তানি আয় ৮০ কোটি ডলারে পৌছানো, জরুরি প্রয়োজনে তাৎক্ষণিক সহায়তার হেল্পলাইন ৯৯৯ চালু এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যন্ত্রমানবী ‘সোফিয়ার’ আগমন ছিল আলোচিত। এ বছরই প্রথমবারের মত পালিত হয় জাতীয় তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি দিবস। তরুণ প্রজন্মকে মেধা-মননের মাধ্যমে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবে ভূমিকা রাখতে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের নানা উদ্যোগ ছিল বছরজুড়ে। নতুন বছরে এ ধারা অব্যহত থাকুক এ আশা দেশবাসীর।
পিছনে ফিরে তাকালে দেশের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা ছিল জঙ্গি আস্তানার সন্ধান। আইনশৃঙ্খা বাহিনীর আন্তরিক চেষ্টায় কোন জাঙ্গিহামলা সফল হয়নি। দেশের কোন শহরে জঙ্গিরা আস্তানা গড়ে তুলে হামলার আগেই আইনশৃঙ্খলা তাদরে আটকে সক্ষম হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য অভিযান ছিল ঢাকার মিরপুরের রূপনগর, কল্যাণপুর, রাজশাহী, চাপাইনবাবগঞ্জ, ঝিনাইদহ, যশোর উল্লেখযোগ্য। সর্বশেষ ঢাকায় বিামন দিয়ে জঙ্গি হামলার পরিল্পনাকে ভেস্তে দেয় আইনশৃঙ্খরা বাহিনী। একজন পাইলটসহ বেশ কয়েকজনকে আটক করা হয় এঘটনার সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে। নতুন বছরে আর কোন জঙ্গি যেন গুপ্ত হামলা চালিয়ে কোন নিরীহ মানুষকে হত্যা না করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে সে প্রত্যাসা।

স্বাধীনতার ৪২ বছর পর যুদ্ধাপরাধীর রায় কার্যকরের মাধ্যমে দেশের কলঙ্ক মোচনের ধারা সূচিত হয়। এ ধারা আজও অব্যহত আছে। এপর্যন্ত ট্রাইব্যুনাল থেকে ২৫টি রায় হয়েছে। যার মধ্যে এ বছর হয়েছে ২টি রায়। মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে গঠিত দ্বিতীয় ট্রাইব্যুনাল বিলুপ্তির পর দুই বছরের বেশি সময় ধরে কার্যক্রম চালিয়ে আসা একমাত্র ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি আনোয়ারুল হক বছরের মাঝামাঝিতে এসে মারা গেলে স্থবির হয়ে পড়ে বিচারের কার্যক্রম। টানা তিন মাস ট্রাইব্যুনালের বিচারকাজ স্থবির থাকার পর বছরের শেষ দিকে গত ১১ অক্টোবর বিচারপতি মো.শাহিনুর ইসলামকে চেয়ারম্যান করা হলে কাজে ফেরে ট্রাইব্যুনাল। যুদ্ধ অপরাধ তদন্ত সংস্থার কাছে দেশবাসীর প্রত্যাসা নতুন উদ্যোমে মামলার তদন্ত শেষ করে অপরাধীদের দ্রুত বিচারিক কাজ শেষ করার সহযোগিতা।
খেলাধুলার মাঝে সবচেয়ে বড় হয়ে উঠেছে ক্রিকেট। ক্রিকেট উম্মাদনা আমাদের চিরকালের। এ বছর বাংলার টাইগারদের অনেক সিরিজ জয় করেছে। সিরিজ জয় করে ক্রীড়া ক্ষেত্রে বিশ্ব দরবারে আমাদের মাথা উচু করে দিয়েছে ক্রিকেটারা। নতুন নতুন রেকর্ড অর্জন করেছে আমাদের ক্রিকেটারা। সবচেয়ে বড় অর্জন ছিল বিদেশের মাটিতে নিউজিল্যান্ডকে হারানো। এই একটি দেশকে হারাতে বাকি ছিল বাংলাদেশের। যা এবার সম্ভাব হয়েছে। আন্তজাতিক অংঙ্গনে খেলাধুলায় পিছিয়ে নেই আমাদের মেয়েরা। সাউথ এশিয়ান ফুটবল ফেডারেশন (সাফ) অনূর্ধ্ব-১৫ নারী ফুটবল চ্যাম্পিয়ানশিপের ফাইনালে ভারতকে হারিয়ে চ্যম্পিয়ন হয়েছে বাংলাদেশের মেয়েরা। রাউন্ড রবিন লিগে টানা তৃতীয় জয় তুলে নিয়ে ফাইনালে নেমেছিল ‘অপরাজিত’ বাংলার বাঘিনীরা। ফাইনালে গোলাম রব্বানী ছোটনের দল ভারতকে ১-০ গোলে হারিয়ে সাফের শিরোপা নিজেদের করে নিয়েছে বাংলাদেশের মেয়েরা। আগামিতে ক্রীড়া অংঙ্গনে এ ধারা অব্যহত রাখবে আশাবাদ দেশবাসীর।
২০১৭ সালে আমাদের মাঝ থেকে চির বিদায় নিয়েছেন অনেক মনীষী। গোটা জাতিকে শোক সাগরে ভাসিয়ে মৎস্য ও প্রানি সম্পদ মন্ত্রী মুহাম্মদ মায়েদুল হক, আওয়ামী গীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য সুরঞ্জিত সেন গুপ্ত, যশোরের জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান পীরজাদা হাদিউজ্জামান, সাবেক সংসদ সদস্য খান টিপু সুলতান, চট্টগ্রামের মেয়র মহিউদ্দিন, ঢাকা উত্তরের মেয়র আনিসুল হক, নায়ক রাজ রাজ্জাক, লোকগানের শিল্পী বারী সিদ্দিকী, মুক্তিযোদ্ধা সুন্দরবনের কিংবদন্তী মেজর জিয়া উদ্দিন, সঙ্গিত শিল্পী আব্দুল জব্বার, চলচিত্র অভিনেতা মিজু আহম্মেদ, বীরপ্রতিক রকেট জলিল, হরি ধানের উদ্ভাবক হরিপদ, যশোর আইনজীবী সমিতির সভাপতি জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারন সম্পাদক শরীফ আব্দুর রাবিক, যশোর মেডিকেল কলেজের অধ্যাক্ষ ডাক্তার আবু হেনা মুহাম্মদ মাওলা চৌধুরীসহ আরও কত মনীষী চলে গেছেন না ফেরার দেশে। এসব মনীষীদের রেখে যাওয়া কর্মগুলো আমরা বুকে ধারন করে এগিয়ে যাবো আগামি দিনে।
এত কিছুর পরও নতুন বছরকে স্বাগত জানানোর আনন্দ থেকে বিন্দুমাত্র বিচ্যুত করতে পারেনি কাউকে। জীবনের পরতে পরতে রয়েছে হাঁসি কান্না আর দুঃখ। তাই উৎসবের সময় কেন উচ্ছ্বাস উদ্দীপনা নয়। সেই উচ্ছ্বাস উদ্দীপনা থেকেই কাল সূর্যাস্তের পরপরই অপেক্ষা সকলের। প্রশাসনের কড়াকড়িতে বাজির শব্দ তেমন কানে না পৌঁছালেও বর্ষ বরণের কমতি ছিল না দেশের বিভিন্ন স্থানে। ঘড়ির কাটা রাত ১২টা ০১ মিনিট ছোঁয়ার সাথে সাথে ইংরেজি নববর্ষ বরণে মেতে উঠেছিল গোটা দেশবাসী।