নাগরিকের নগরপ্রধান হোক নদীমুখী

কেবল নগর বসবাসেই নাগরিক নয়, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীও নাগরিক এবং রাষ্ট্রের সুবিধা গ্রহণের অধিকার রাখে। নাগরিক সমস্যা এবং নাগরিক অধিকার মূলত ব্যস্তানুপাতিক। অর্থাৎ নাগরিক সমস্যা বাড়তে থাকলে নাগরিক অধিকারে ঘাটতি দেখা দেয়।

তবে নাগরিক সমস্যা কি কেবল যানজটকেন্দ্রিকই হয়? অথবা নাগরিক দাবি কি কেবল গ্যাসের মূল্য কম করা? অবাক হওয়ার কিছু নেই যদি নদী দূষণকে শুধু প্রাকৃতিক সমস্যা চিহ্নিত না করে নাগরিক সমস্যারূপে চিহ্নিত করে নাগরিক তার নদী অধিকার ফিরে পাওয়ার দাবি জানায়।

বাংলাদেশে নাগরিক সাংবাদিকতার মাধ্যমে নাগরিক সমস্যা ও নাগরিক অধিকারবোধকে সুষ্পষ্ট করা সম্ভব হয়েছে বিগত কয়েক বছরে। এরই ধারাবাহিকতায় নাগরিক সাংবাদিকতা ভিত্তিক সংকলন ’নগর নাব্য – মেয়র সমীপেষু’ নাগরিক ও নগরপ্রধানের মাঝে গড়ে তোলে এক সেতুবন্ধন। আমার অনেকবারই সুযোগ হয়েছিল নাগরিক সাংবাদিক ও নগরপ্রধানদের আলাপচারিতায় উপস্থিত থেকে অভিজ্ঞ হওয়ার।

এ বছর জুনে পৌরসভা কার্যালয়ে এক নাগরিক মতবিনিময়ে টাঙ্গন নদীর নাব্যতা সংকট নিয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে ঠাকুরগাঁও পৌরসভা মেয়র ফয়সল আমীন অকপটেই বলেছিলেন অনেক কথা।

মেয়র ফয়সল আমীন

টাঙ্গন নদীর উৎপত্তিস্থল আটোয়ারী থানার টাঙ্গন ব্যারেজ থেকে। এটা ভারতীয় নদী নয়। মূল সমস্যা হচ্ছে নদীর নাব্যতা শীতকালে-গ্রীষ্মকালে ব্যাপকভাবে কমে যায়। ফলে চর জেগে ওঠে। এই নদীতে আমরা ছেলেবেলায় গোসল করেছি, সাঁতার কেটেছি। কিন্তু আজকে নদীর চেহারা সেরকম নেই। সরু হয়ে এসেছে। এই নদীর দু’পাশের জমি মূলত খাস জমি। জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে সরকার থেকে, এসি ল্যান্ড অফিস থেকে এসব জমি বিভিন্ন ভূমিহীনদের লিজ দেয়া হয়েছে। এতে যা হয়ে থাকে, অনেকে নদীর চরের উপরে বসতি স্থাপন করেছে। এভাবে নদীর পরিধি অনেক ছোট হয়ে এসেছে। সবকিছু মিলিয়ে নদী এখন ছোট। আর পৌরসভার ভেতরে নদীর পরিধি অনেক কম। টাঙ্গন নদীর দুটো ব্রিজ। একটা পুরনো লোহার ব্রিটিশ আমলের ব্রিজ। এটা বন্ধ আছে। গাড়ি চলেনা, হয়তো রিকশা চলে, সাইকেল চলে, মোটরবাইক চলে। তবে ব্রিজটা এবানডেন করা হয়েছে। আরেকটা নতুন ব্রিজ, যা দিয়ে এখন সবাই চলাচল করে থাকে। তো এর কিছুটা পর থেকেই টাঙ্গন নদীর পৌরসভার ভেতরের অংশ।

ব্রিজ পার হয়ে একটু গেলেই ডিসি বস্তি, এরপর বিডিআর ক্যাম্পের পেছন দিয়ে নদীটা বেরিয়ে গেল।  ওই পর্যন্তই শেষ পৌরসভার অংশ। খুবই সামান্য অংশ, আমাদের পৌরসভার ভেতরে নদী যতটুকু আছে মানুষ এখনো সেভাবে ঢোকেনি। তবে অন্যদিকে হয়ত জনবসতি অনেক বেড়ে গেছে। তাতে নদী দখল হচ্ছে। আর ভূমিদস্যুদের যে প্রকোপ সেটা সারা বাংলাদেশের চিত্র। যা থেকে আমাদের ঠাকুরগাঁও নিস্তার পায়নি। এটা পৌরসভার একার পক্ষে সম্ভব নয়। প্রশাসনের সক্রিয় সহায়তার প্রয়োজন আছে। সে সহযোগিতা যদি আমরা না পাই তবে নদী পুনরুদ্ধার করা কঠিন হবে। নারায়ণগঞ্জে কোর্টের অর্ডার নিয়েও সরকার হিমশিম খাচ্ছে বুড়িগঙ্গায় পাশে জমি পুনরুদ্ধারে, সেখানে ঠাকুরগাঁও তো একটা ছোট্ট শহর। আর আমাদের পক্ষেও এটা দু:সাধ্য। তবে আমরা চেষ্টায় আছি নতুন করে যেন দখল না হয়। আমি মাননীয় জেলা প্রশাসক সাহেবের সাথে কথাও বলেছি এর আগে। আমরা ইদানীংকালে চেষ্টা করছি নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনার জন্য। এখানে যে বালুটা হয়, চরটা পরে, সরকার থেকে ইজারা দেয়া হয়, বালুটা কেটে নিয়ে যায় যারা বালু ব্যবসায়ী, তাতে কিছুটা হলেও নাব্যতা বাড়ে। এটা প্রতিবছরই করা হয়। এটা সরকারই পরিচালনা করে। এটার সাথে পৌরসভার কোনো সম্পৃক্ততা নেই। নদী আমাদের এখানে যতটুকু আছে, তা আছে। কিন্তু সরকার যদি ভূমিহীনদের জমি পত্তন দেয়া থেকে বিরত থাকে তাহলে কিছুটা হলেও নদীর প্রশস্ততা বাড়বে।

নাগরিক সাংবাদিক নিতাই বাবু ২০১৭’র মার্চে নারায়নগঞ্জ নগর ভবন মেয়র কার্যালয়ে সরাসরি প্রশ্ন রেখেছিলেন মেয়র সেলিনা হায়ৎ আইভীকে।

নিতাই বাবু: মাননীয় মেয়র, বর্তমানে শীতলক্ষার পানি শোধন করেও পান করা যায় না দুর্গন্ধের কারণে। শীতলক্ষ্যা দূষণ নিয়ে বেশ কয়েকটি লেখা প্রকাশ হয়েছে ব্লগ ডট বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডট কমে। ২৭ জানুয়ারি ২০১৭ তারিখে প্রকাশিত পোস্টের শিরোনাম ছিল – শীতলক্ষা নদীর কুচকুচে কালো পানি। ১৬ নভেম্বর ২০১৬ তারিখে প্রকাশিত পোস্টের শিরোনাম ছিল শীতলক্ষ্যা নদীতে বিষাক্ত কেমিকেলের পানি এবং আমাদের মৃত্যু। এই লেখাটি নগর নাব্য-মেয়র সমীপেষুতেও ছাপা হয়েছে। নিট গার্মেন্টসের ডাইং এর বিষাক্ত কেমিকেলের পানি থেকে শীতলক্ষ্যা নদীকে বাঁচাতে আপনার পরিকল্পনা ও পদক্ষেপ জানতে চাই।

মেয়র আইভী স্মিত হাসি দিয়ে কয়েক সেকেন্ড চুপ থাকেন। তারপর তিনি পরিস্থিতি ব্যক্ত করেন।

মেয়র সেলিনা হায়ৎ আইভী

আমি আপনাদেরকে নিয়ে আন্দোলন করতে পারি। এর বেশি কী করবো? এটা নিয়ে বহুবার আন্দোলন হয়েছে, পথসভা হয়েছে, নৌকার মধ্যে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ করেছি। এখন আমি জানি না পরিবেশ অধিদপ্তর কী করবে। তবে ডাইংগুলিকে অবশ্য অবশ্যই ইমিডিয়েট বন্ধ করা উচিৎ। আমরা যেটা করছি, নদীর ওই পাড় বাঁধাই করে দিতে চাচ্ছি। বাঁধাই করা মানে স্লোপ প্রোটেকশন দিয়ে রাস্তা করছি। আপনারা গেলে ইঞ্জিনিয়ারদের ডাকবো (হাতে ধরা নকশা দেখিয়ে)। অলরেডি আমি কাজ শুরু করে দিয়ে এসেছি। এটা হলে যেটা হবে, ডাইং যেন পাইপ দিতে না পারে। আমাদের সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। যে দেবে সেখানে জরিমানা হবে।কিন্তু জরিমানার বিধানটা আবার আমার নেই, থাকলে লিমিটেড আছে। যেটা আবার পরিবেশ অধিদপ্তর করতে পারে বেশি। সিটি করপোরেশনের লিমিটেশন দেয়া আছে যে এতোর বেশি করা যাবে না।  পরিবেশ অধিদপ্তর ডাইং এর অনুমতি দিচ্ছে, আমরা তো দেই না।সুতরাং পরিবেশের সাথে সিটি করপোরেশন এবং নাগরিক এই তিনটা এক সাথে প্রেশারগ্রুপ হিসেবে কাজ করলে তাহলে হয়ত কিছুটা সম্ভব হবে বর্জ্য, ড্রেনের পানি বন্ধ করা। পানিকে তো ট্রিটমেন্ট করতেই হবে। নদীকে খনন করতে হবে। এটা নৌ মন্ত্রনালয়ের দায়িত্ব। ইতিমধ্যে বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কিন্তু পাঁচটি বড় বড় নদীকে নিয়ে কাজ শুরু করে দিয়েছেন। তারমধ্যে শীতলক্ষ্যাও আছে। বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালি, শীতলক্ষ্যা, ধলেশ্বরী। আমরা আশা করি আজকে না হলেও আগামি পাঁচ বছর পরে হলেও শীতলক্ষ্যা, বুড়িগঙ্গা,  ধলেশ্বরী, তুরাগের পানির অবস্থার উন্নতি হবে।

নাগরিকদের সামনে নগরপ্রধানরা সম্ভাবনার আশ্বাস দিয়েছেন, আবার সীমাবদ্ধতার কথাও বলেছেন। এই সীমাবদ্ধতা সত্বেও নাগরিকেরা নগরপ্রধানের মুখাপেক্ষী থাকবেই। এ কারণেই মেয়র নির্বাচনগুলো নিয়ে নাগরিক জল্পনা-কল্পনার শেষ থাকে না।

২০১৫ সালে দক্ষিণ ঢাকার মেয়র নির্বাচন নিয়ে যখন অনেক মাপতোল, তখন বিশেষ প্রত্যাশা করেছিলাম নদীমুখী প্রতিশ্রুতিই যেন হয় নাগরিকের নগরপ্রধান নির্বাচনে যোগ্যতা। দৈনিক সমকালে প্রকাশিত সেই চিন্তার শিরোনাম ছিল – বুড়িগঙ্গা বাঁচালেই যোগ্য মেয়র। ঢাকার দুই অংশে নির্বাচিত দুই মেয়র আনিসুল হক এবং সাঈদ খোকনকে অবশ্য নদীমুখী প্রতিশ্রুতিতে সরব পাওয়া গিয়েছিল।

নদী বাঁচাও আন্দোলনের অগ্রদূত রিভারাইন পিপল আয়োজিত জাতীয় নদী অলিম্পিয়াড ২০১৬ এর একটি পর্বে উপস্থিত হয়ে তৎকালীন মেয়র আনিসুল হক নদী দখল বন্ধ করতে সবাইকে কার্যকরী ভূমিকা রাখতে আহবান জানিয়েছিলেন। অপর একটি পর্বে মেয়র সাঈদ খোকন আশ্বাস দিয়েছিলেন বুড়িগঙ্গা রক্ষায় ’শুরুটা করতে যাচ্ছি’।

মনোনয়নে দিতে রাজনৈতিক দলগুলো অনেক লাভ-ক্ষতি যাচাই করবে, ভোটের দিন নাগরিকেরাও তাদের রায়টা জানাবে। কিন্তু উত্তর ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন সংকটের খেসারত হিসেবে তুরাগ নদী দূষিত হচ্ছে এমন অভিযোগ নিরসনে সফল হতে পারবেন কি আগামির নগরপ্রধান? আর এখানেই রাজনৈতিক দলগুলো এবং নাগরিকদের আবারো স্মরণ করিয়ে দিতে হয় যে নগরবাসীর নগরপ্রধান নির্বাচনের যোগ্যতা যেন হয় একজন নদীমুখী নগরপ্রধান।

জাতীয় নির্বাচনে হাতে সময় থাকলেও এর মাঝে রংপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচন এবং উত্তর ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচন নিয়ে নাগরিক মহলে অংক কষা চলছে। ইতিমধ্যে আওয়ামী লীগের সরফুদ্দিন আহমেদ ঝন্টুকে হারিয়ে জাতীয় পার্টি রংপুরে নিজেদের ফিরিয়ে এনেছে সদ্য নির্বাচিত মেয়র মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফার মাধ্যমে।

নাগরিক সাংবাদিকরা সরফুদ্দিন আহমেদ ঝন্টুকে রংপুরের ঐহিত্য শ্যামাসুন্দরী খাল নিয়ে সরব পেয়েছিল। শ্যামাসুন্দরী খাল নদী না হলেও এই জলাধার রংপুরের নাগরিক ও নদীর জন্য গুরুত্ব রাখে। জুনে রংপুর নগর ভবন কার্যালয়ে নাগরিক সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে সরফুদ্দিন আহমেদ ঝন্টু দ্বার্থহীন কণ্ঠে খাল সংস্কারে ৫০ কোটি টাকা দুর্নীতির অভিযোগ করেন এবং বিচার দাবি করেন। এই উচ্চারণ নাগরিক মনে আশ্বাস জুটিয়েছিল হয়ত শ্যামাসুন্দরী খালের একটা গতি হবে।

গণতান্ত্রিক রাজনীতির নিয়মে আজকে সরফুদ্দিন আহমেদ ঝন্টু  নগরপ্রধান পদ থেকে সরে গেছেন এবং স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা। সদ্য নির্বাচিত নগরপ্রধান মোস্তফা  রংপুরবাসীর জন্য শ্যামাসুন্দরী খাল পুনরুদ্ধারকে অগ্রাধিকার দেবেন তো?

আনিসুল হক প্রয়াত হওয়ায় উত্তর ঢাকা সিটি করপোরেশনের উন্নয়ন কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা ব্যহত হবে নি:সন্দেহে। নিয়ম মাফিক এবং প্রশাসনিক কাজের স্বার্থেই এখন একটি মেয়র নির্বাচন আসন্ন। প্রতিদিন অনেকের প্রার্থীতা সংবাদ শিরোনাম হচ্ছে। কাকে মনোনয়ন দেয়া উচিৎ, কাকে ভোট দেয়া উচিৎ এসব নিয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষণ সবখানে।

মনোনয়নে দিতে রাজনৈতিক দলগুলো অনেক লাভ-ক্ষতি যাচাই করবে, ভোটের দিন নাগরিকেরাও তাদের রায়টা জানাবে। কিন্তু উত্তর ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন সংকটের খেসারত হিসেবে তুরাগ নদী দূষিত হচ্ছে এমন অভিযোগ নিরসনে সফল হতে পারবেন কি আগামির নগরপ্রধান? আর এখানেই রাজনৈতিক দলগুলো এবং নাগরিকদের আবারো স্মরণ করিয়ে দিতে হয় যে নগরবাসীর নগরপ্রধান নির্বাচনের যোগ্যতা যেন হয় একজন নদীমুখী নগরপ্রধান।