নড়াইলে সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের ৬ মাস পর পেট থেকে গজ ব্যান্ডেজ উদ্ধার

বিল্লাল হোসেন>
নড়াইলে সার্জারী বিভাগের জুনিয়র কনসালটেন্ট ডাঃ নুরুজ্জামানের ত্রুটিপূর্ণ সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারে শারমিন খতুনের (২৫) জীবন সংকটাপন্ন হয়ে উঠেছে। তার স্বজনরা জানিয়েছেন, অস্ত্রোপচারের সময় রোগির পেটে গজ ব্যান্ডেজ থেকে যাওয়ায় এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। বিষয়টি গোপন রাখতে রোগির অন্যত্র চিকিৎসা নিতেও বাঁধা দেয়া হয়েছে। সাড়ে ৩ মাস নিজেদের কব্জায় রেখে চিকিৎসাসেবার নামে ৮০ থেকে ৮৫ হাজার টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। রোগির অবস্থা বেগতিক হলে তার ছাড়পত্রটিও কৌশলে নিয়ে নেয়। পরে শনিবার (৬ জানুয়ারি) যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে রোগির পুনরায় অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে গজ ব্যান্ডেজ বের করা হয়েছে বলে তার স্বজনেরা দাবি করছেন। তবে বিষয়টি কিছু বলতে নারাজ সরকারি হাসপাতালের অস্ত্রোপচারকারী চিকিৎসকেরা।
স্বজনেরা জানিয়েছেন, ২০১৭ সালের ২৯ জুলাই সকালে মাগুরার শালিখা উপজেলার দরিখাটোর গ্রামের মাসুদ মোল্যার স্ত্রী অন্তঃসত্ত্বা শারমিন খাতুনের প্রসব যন্ত্রনা শুরু হয় পিতার বাড়িতে। তাৎক্ষনিকভাবে তাকে ভর্তি করা হয় নড়াইল সদর হাসপাতাল রোডে অবস্থিত ফ্যামিলি কেয়ার হাসপাতালে। ওইদিন বিকেলে সেখানে রোগির সিজারিয়ান অস্ত্রোপচার করেন নড়াইল সদর হাসপাতালে সার্জারি বিভাগের জুনিয়র কনসালটেন্ট ডাঃ জিএম নূরুজ্জামান।
শারমিন জানান, ৮ হাজার টাকা চুক্তিতে সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে ছেলে সন্তান প্রসবের ৬ দিন পর তিনি বাড়ি ফিরে যান। দেড় মাস পার হতেই তার পেটে হালকা যন্ত্রনা শুরু হয়। অস্ত্রোপচারের ২মাস পর পেটে প্রচন্ড যন্ত্রনা শুরু হলে তিনি ডা. জিএম নূরুজ্জামানের সাথে যোগাযোগ করেন। ওই সময় চিকিৎসক তাকে জানান, ইনফেকশনের কারনে এমনটা হচ্ছে। চিকিৎসা দিচ্ছি ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু তার পেটের যন্ত্রনা মোটেও কমেনি। প্রতি সপ্তাহে একদিন করে তিনি চিকিৎসার জন্য আসলে ডা. জিএম নূরুুজ্জামানের ফ্যামেলি কেয়ার হাসপাতালস্থ চেম্বারে আসলে তাকে অল্ট্রাসনো করিয়ে বলা হয় ইনফেকশন অনেকটা কমে গেছে। এভাবে তার ১৫ থেকে ১৬ বার আল্ট্রাসনো করা হয়েছে। কিন্তু প্রতিটি আল্ট্রাসনো রিপোর্ট তাকে না দিয়ে চিকিৎসকের কাছে রেখে দিয়েছেন। পরে তিনি মারাতœক অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে ফ্যামেলি কেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে দীর্ঘদিন তার চিকিৎসাসেবা দেয়া হলেও পেটের ব্যথা কমেনি।
শারমিন দাবি করছেন, ডা. জিএম নূরুজ্জামান ও ফ্যামেলি কেয়ার হাসপাতালের পরিচালক কথিত ডাঃ মুকুল হোসেন চিকিৎসাসেবার নামে কয়েকমাসে ৮০ থেকে ৮৫ হাজার টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। শারমিনের পিতা নড়াইল সদর উপজেলার ধুনধান গ্রামের মনি মিয়া জানিয়েছেন, তার মেয়ের অস্ত্রোপচারের সময় পেটে গজ ব্যান্ডেজ থেকে যাওয়ার ঘটনাটি গোপন করতে ডা. নূরুজ্জামান ও হাসপাতালের মালিক মুকুল হোসেন রোগিকে চিকিৎসাসেবার নামে নিজেদের কব্জায় রেখে দেন দীর্ঘদিন । অন্যত্র থেকে রোগির চিকিৎসা নেয়ার কথা বলা হলেও তারা যেতে দেননি। অথচ রোগির শারীরিক অবস্থার ক্রমেই অবনতি হতে থাকে। রোগির অবস্থা গেতিক বুঝতে পেরে গত ২০ ডিসেম্বর শারমিনকে অন্যত্র নেয়ার পরামর্শ দেন ডা. জিএম নূরুজ্জামান। ২১ ডিসেম্বর উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ভর্তির রেজিস্ট্রেশন নম্বর ৫৫১৭১/৪৭।
মনি মিয়া আরো জানান,শারমিনকে ফ্যামেলি কেয়ার হাসপাতাল থেকে নিয়ে আসার সময় রোগির ২য় বারের ছাড়পত্র দেয়া হয়নি। এছাড়া সিজারিয়ান অস্ত্রোপচার করে বাড়ি ফেরার সময় দেয়া ছাড়পত্রটিও কৌশলে নিয়ে নেন ডাঃ জিএম নূরুজ্জামান।
ননদ কাকলী আক্তার জানান, ডাঃ শারমিন নাহার পলির পরামর্শে শহরের একটি বেসরকারি হাসপাতাল থেকে আল্ট্রাসনো করার পর তারা জানতে পারেন রোগির পেটের মধ্যে শক্ত কি যেন রয়েছে। ৬ যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে অস্ত্রোপচার করেন গাইনী বিভাগের চিকিৎসক রীনা ঘোষ ও শারমিন নাহার পলির নেতৃত্বে শারমিনকে পূণরায় অস্ত্রোপচার করা হয়। ওই সময় তারা রোগির পেট থেকে গজ ব্যান্ডেজ বের করেনন। বর্তমানে শারমিন খাতুন গাইনী ওয়ার্ডের ৫ নম্বর শয্যায় চিকিৎসাধীন রয়েছেন। বিষয়টি সম্পর্কে ডা. শারমিন নাহার পলির কাছে জানতে চাইলে তিনি সাংবাদিকদের কিছু জানাতে চাননি। সন্ধ্যায় ডা. রীনা ঘোষের ব্যক্তিগত মুঠোফোনে কল দেয়া হয়।
রিসিভ করে তার সহকারি পরিচয়ে এক নারী জানান, ম্যাডাম অপারেশন কাজে ব্যস্ত রয়েছেন। এখন কথা বলতে পারবেননা। নড়াইলের ফ্যামেলি হাসপাতালের পরিচালক কথিত ডা. মুকুল হোসেন জানিয়েছেন, তার হাসপাতালে ডা. জিএম নূরুজ্জামান রোগি শারমিনকে ৬ মাস আগে সিজারিয়ান অস্ত্রোপচার করেছিলেন। তার ক্ষতস্থানে ইনফেকশন হয়ে যাওয়ায় ২ মাস পর চিকিৎসার জন্য রোগিকে আনা হয়। ডাঃ নূরুজ্জামানের পরামর্শে রোগিকে কয়েকদিন ভর্তি রেখে আমি নিয়মিত ড্রেসিং করেছি। রোগির অবস্থার অবনতি হলে অন্যত্র রেফার্ড করা হয়েছে। রোগির সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের সময় গজ ব্যান্ডেজ থাকলে ৬ মাসে তার অবস্থা খারাপ হয়ে যাওয়ার কথা।
এদিকে নড়াইলে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জিএম নূরুজ্জামান নড়াইল সদর হাসপাতালের সার্জারি বিভাগের জুনিয়র কনসাল্টেন্ট। কিন্তু তিনি বেসরকারি বিভিন্ন স্বাস্থ্য কেন্দ্রে সিজারিয়াসহ গাইনী রোগিদের বিভিন্ন অস্ত্রোপচার করছেন।