রাজনীতিতে এখন কাকের গোশত কাকে খায়

কে বলেছে রাজনীতি থিতিয়ে আছে? বড় দলগুলো পারুক আর না পারুক এখন নিজেরা নিজেরা বা দূর্বলের ওপর সবলের অনাচার সমানে চলছে। উপাচার্য পদটি এখনো সম্মানের বলেই বিবেচিত। লেখাপড়ার মান যাই হোক দেশে উপাচার্যদের একটা মান মর্যাদা আছে। কিন্তু সেটাও এখন রাজনৈতিক পদ। বড় বড় নাম ও পদবীধারী উপাচাযর্রা দলে উপদলে বিভক্ত।

বিএনপির যেমন এমাজ উদ্দীন সাহেব আওয়ামী লীগের আরেফিন সাহেব। কেউ কারো চেয়ে কম না। কেউ দল ছাড়েননা আর কেউ বাড়ী। এবার দেখি নতুন উপাচার্যের ডাকে সাড়া দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছে ছাত্রলীগ। ছাত্রলীগ বলতে কিন্তু শুধু ছেলে বা ছাত্রদের বোঝায় না। উভয়লিঙ্গ ছাত্রলীগ। ছাত্রদল বা ছাত্রলীগে মেয়েরাও আছে। এবার দেখলাম তারাও তাণ্ডবে অংশ নিয়েছে। তাদের তাণ্ডবকে ছোট করে দেখার সুযোগ নাই। মনে আছে যখন বিএনপি’র রমরমা তখন ছাত্রদলও এমন করতো। সে কি তাণ্ডব। সে কি মারামারি! সেদিন এখন অতীত। ‘বাঘের বল বারো বছর’- বলে একটা কথা আছে। এখন এই ছাত্রলীগকে দেখে মনে হয় এর পরিণামও তাই হবে একদিন।

সে যাই হোক। আমাদের এখন ভয়টা নানা কারণে। এ কোন সমাজ, এ কোন বাস্তবতা? যেখানে উপাচার্য পুলিশ না ডেকে ছাত্রলীগকে ডেকে আনেন। সেই কবে আহমদ ছফা গাভী বৃত্তান্ত লিখেছিলেন। আজো দেখছি সেই গরুবাছুরের খেলা। বিষয়টা উভয়দিক থেকে জটিল। যারা বিদ্রোহের নামে তালা ভেঙে বা কলাপসিবল গেইট ভেঙে উৎপাত করে তারাও বেপরোয়া। এই বেপরোয়া ভাব আজ সমাজের সর্বত্র। একটা সময় আমরা জানতাম নারীরা হয় ধৈর্য আর সংযমে অনন্যা। সেদিন আর নাই। ছবিতে দেখলাম নারীর হাতে লাঞ্ছিত নারীর পোশাক নিয়ে টানাটানি। এখন আর পোশাক টানাটানিরর জন্য পুরুষের দরকার পড়েনা। এরাই নাকি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী!

যুবসমাজের এই অধ:পতন রোধ অসম্ভব। এর নেপধ্য কারণ কি আমাদের অজানা? এখন সবকিছু দেবে আর নেবে মিলাবে মিলিবে। এই পাওয়ার গেমের কারণে কারো মনে নৈতিকতা বা অপরাধবোধ কাজ করে না। সমাজে যা কিছু বা যেকিছু রাজনীতি করার কথা যা কিছু পুলিশের কাজ যা কিছু মানুষের কাজ সব উল্টেপাল্টে একাকার। যার মারখাবার কথা সে মারছে। যার মুখ লুকানোর কথা সে মুখ বড় করে তাকিয়ে থাকে। আর যার মুখ উজ্জ্বল হবার কথা সে আছে গুটিয়ে। এর নাম ডিজিটাল?

ছাত্রলীগকে নিয়ে আওয়ামী লীগের বিপদের শুরু তিয়াত্তর থেকে। সেই জাসদ বাসদ থেকে আজকে নিজেদের ভেতর বিভক্ত মারমুখো ছাত্রলীগের রাজনীতি দলটিকে আগের মত বলিষ্ঠ রাখেনি। এবারের ঘটনায় যারা উপাচার্যকে বন্দী করে বা ঘেরাও করে বিপদ ডেকে আনছিলো তাদের দায় নিজেরা নিয়ে আরো একধাপ পিছিয়ে পড়লো ছাত্রলীগ। মনে রাখতে হবে দেশে সাধারণ রাজনীতি বা নিরাপদ রাজনৈতিক বাতাবরণ না থাকলে এমন হবেই। তখন কাক কাকের গোশত খাবে। মানুষ মানুষকে মারবে। মেরে পার পেয়ে যাবে।  এই বিপদ থেকে বাঁচার কাজটা সহজ না। কারন এই আক্রমণ বা এই বাস্তবতা এখন বড়দের ভেত ও কাজ শুরু করে দিয়েছে।

কথা ও কাজে অসংযত রাজনীতি মানুষ প্রত্যাখ্যান করলেও তাদের জোর করে গেলানো হচ্ছে রাজনৈতিক বটিকা। রাজনীতির এমন হাল আগে কোনদিন দেখা যায়নি। কোন সাধারণ মানুষের মনে কোন দলের প্রতি শ্রদ্ধা দূরে থাক বিন্দুমাত্র সম্মানবোধ নাই। তবু নেতারা মনে করেন তারাই সম্মানিত। মানুষের মনে মনে যে আবেগ আর যে দ্রোহ তার সাথে এদের কোন পরিচয় নাই। থাকলে কবেই পদ ছেড়ে বনে চলে যেতেন। এখন আমরা দেখি সবকিছু মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে সামলাতে হয়। ভাগ্যিস তিনি বঙ্গবন্ধু কন্যা। তাঁর স্মরণশক্তি পরিশ্রম করা আর দেশচালানোর এমন সাহস আছে। না হলে দলের লোকেরাই তাঁকে ক্লান্ত আর বিধ্বস্ত করতে যথেষ্ট। ঘটনা দেখুন- তাহলেই বুঝবেন তাঁর পরবর্তী পদ মানে দলের সেক্রেটারির সামনে কি হচ্ছে।

অকারণে হোক আর কারণে হোক আবার তেতে উঠেছে তারা। কারা? আওয়ামী লীগের দ্রোহীরা। তাদের হাতে মিডিয়ার ভাষায় নাজেহাল সম্পাদক অবশ্য বললেন- কর্মীরা বিজয় মিছিল করলেও মিডিয়া নাকি তা নিয়ে অন্য কথা বলে। একথা বলতে না বলতে আবারো তোপের মুখে পড়লেন ওবায়দুল কাদের। এবং আমরা ভিডিও ফুটেজে যা দেখলাম তাতে মনে হবে এমন বিজয় মিছিল বা আনন্দ হবার চাইতে না হওয়াটাই ভালো। মূল বিষয় আড়াল হলে কারো লাভ নাই। মূল বিষয় কিন্তু কর্মীরা সাফ সাফ বলে দিয়েছেন। তারা দেখছে তাদের কোনো চাওয়াই মূল্য পাচ্ছেনা। তাদের ভাষায় টাকা আর পাওয়ার গেইমে তারা বাদ পড়ে সামনে চলে আসছে সব দলছুট বা দলের না এমন মানুষজন। এ কথা কি আসলে মিথ্যা?

কে না জানে সরকারি দল করে এমন একদল মানুষ সবসময় ক্রিম খায়। এরা থাকে আড়ালে আবডালে। সুখের সময় পাবেন দু;খ বা কষ্টের সময় উধাও এরা। আওয়ামী লীগের সহায় ও সম্বল মূলত তার তৃণমূল কর্মীরা । সেই বঙ্গবন্ধুর আমল থেকে এরাই দলকে চাঙ্গা করে রেখেছে। আজ যখন দল বহুবছর ধরে গদীতে তাদের আসন একটু একটু করে টলছে।  এখন এমন হাল সে জায়গাটা হয়ে গেছে প্রতিবাদের। আশ্চর্য কথা বলতে পছন্দ করেন এমন সম্পাদকও তা মানলেন না। অথচ কিছুদিন আগে তিনি বলেছিলেন- দলে কাউয়া ঢুকেছে। কাউয়া এখন কাউয়ার গোশত খেলে তিনি কিভাবে চোখ বুজে থাকবেন?

আমি সরেজমিনে দেখেছি দলের অবস্থান আগের মত নাই। সুবিধাভোগীদের জ্বালায় অতিষ্ঠ কর্মিরা কোনওভাবে টিকে আছে। আর মানুষের মনে মনে নেগেটিভ প্রভাব ফেলছে স্বার্থপরেরা। সকালের কথার সাথে বিকেলের কথার মিল নাই। সাথে আছে লুটপাট। বাণিজ্যের কাছে পরাস্ত শুভবোধে আওয়ামী লীগের সামনের পথ আসলেই কঠিন। মুশকিল হলো মাঠে কোন বিরোধী দল নাই। যারা সরকারের চোখে আঙ্গুল দিয়ে সব দেখিয়ে দেবে। এমনও নাই যারা সরকারকে চ্যালেঞ্জ জানাবে। তাই আজ চ্যালেন্জ আসছে ভেতর থেকে।

অন্যদিকে বিএনপিতে দেখলাম পুরুষরা নিস্তেজ হবার পর নারীরাই মারমুখো। মির্জা ফখরুল ত্রাণ বিতরণ করতে এসে তার মত করে মিষ্টি কথা বলে যাবার পর শুরু হয়ে গেছে মারামারি। নারীদের এই রণরঙ্গিনী মূর্তি আগে দেখিনি। কি উৎসাহ কি আনন্দ ঝাঁপিয়ে পড়ায়! এর  একশ ভাগের একভাগও যদি তারা গঠনমূলক কাজে লাগাতো আজ দেশের অনেককিছুতেই পরিবর্তন আসতে পারতো। কীভাবে মানুষ ভাববে দেশ তাদের কাছে নিরাপদ?

আসলে এটাই এখন দেশ ও সমাজের আসল চেহারা। সাধারণ সম্পাদকেরা নিজেদের মত করে বলে যান যাবার পর কর্মীরা জানেন এগুলো মনগড়া কথা। তাই তারা তাদের জায়গা তাদের আসল তাদের পাওনা আদায়ে মারমুখো হয়ে ওঠেন। এটাই এখন রাজনীতি।

আদর্শহীন মূল্যবোধহীন এই সমাজে আজ তাই মানুষ ঘুমিয়ে। জাগলে সে হারিয়ে যায়- নয়তো মারা পড়ে। তাই আর কেউ জাগেনা । তবে এর মধ্যেই আছে অশণি সংকেত। আওয়ামী লীগ বিএনপি উভয়েই এখন কাকের মাংস কাকে খায়। কে কাকে বাঁচায় এই সমাজে আজ?