দুর্নীতির ব্যাপকতা ও দুদকের চমৎকারিত্ব

জনগণ দেখছেন এক শ্রেণির রাজনীতিকদের সীমাহীন দুর্নীতি। এমন কি, নির্বাচনকালে যে সম্পদ তালিকার বিবরণ নির্বাচনী কর্তৃপক্ষের কাছে তাঁরা দাখিল করেছেন নির্বাচিত হওয়ার পর বছর বছর তাঁদের সম্পদের পাহাড় যেন শিখর-চূড়া স্পর্শ করছে দিনদিনই যেন অজ্ঞাতসারে তা স্ফীত কলেবর হয়ে উঠছে। দেশের সংবাদপত্রগুলি এ সংক্রান্ত খবর একাধিক রাজনৈতিক নেতা সম্পর্কে প্রকাশ করলেও তা যেন দুদকের নজরেই পড়ে না।

প্রশ্ন করতে ইচ্ছে জাগে, তারা কি সংবাদপত্র পড়েন না? সবকয়টা সংবাদপত্র অফিসে রাখার তহবিল কী সরকারীভাবে তাদের বরাদ্দ দেওয়া হয় না? না দিলেই বা কি? ইন্টারনেটে তো সব কিছুই দেখা যেতে পারে। সে ব্যাপারে অবশ্য উদ্যোগের প্রয়োজন।

পত্র-পত্রিকায় প্রায়শই দেখা যাচ্ছে, ব্যাংকিং সেক্টরের ভয়াবহ দুর্নীতির কথা। মানুষ আতঙ্কিত বোধ করছেন ওই অবিশ্বাস্য খবরগুলি দিনের পর দিন জানতে পেরে। অর্থনীতি বিশেষজ্ঞরা, অবসরপ্রাপ্ত নামকরা ব্যাংকের (বিশেষ করে বাংলাদেশ ব্যাংকের) সাবেক কর্মকর্তারা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ছেন ব্যাংক ব্যবস্থার ভবিষ্যত নিয়ে। এসব উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার মূল কারণই হলো এই ভয়াবহ দুর্নীতি যা আমাদের জাতীয় অর্থনীতি গোটা ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে ধ্বংসের কিনারায় নিয়ে যাচ্ছে তার জন্যে দায়ী অপরাধীরা কেন আইনের আওতায় আদৌ আসছে না!

ব্যাপকভাবেই আলোচিত হচ্ছে, ব্যাংকগুলির পরিচালকেরাই বিশাল আতঙ্কের ঋণ নিয়ে তা ফেরত না দিয়ে নিজ নিজ পরিচালনাধীন ব্যাংকগুলিকে পঙ্গু করে ফেলেছে- কিন্তু তা যেন ‘সহনীয়’ বলেই বিবেচিত হচ্ছে দুর্নীতি দমনের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের কাছে। টু শব্দটি নেই-কারও গায়ে কাঁটার আঁচড়টুকুও লাগছে না। কিন্তু কেন?

জানা যায়, একটি অখ্যাত বেসরকারী ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও পরিচালকেরা বিশাল অংকের টাকা নিজেদের পরিচালনাধীন ব্যাংক থেকে তুলে নিয়েছেন ঋণ হিসেবে কিন্তু দীর্ঘদিন চলে গেলেও সেই বিশাল অংকের টাকা তাঁরা ফেরত না দেওয়ায় ব্যাংকটি এতটাই পঙ্গু হয়ে পড়েছে যে ব্যাংকটির সাধারণ গ্রাহকেরা বা হিসাবধারীরা (Account holders) নিজ নিজ রক্ষিত টাকা তুলতে গেলে জবাব পাচ্ছেন ‘ব্যাংকে টাকা নেই’। কী ভয়ানক কথা! কতজনের কত টাকা এভাবে মার খেল তাহার কোন হিসাব আছে কি? এমন মারাত্মক খবর প্রকাশের পর সরকারিভাবে গৃহীত ব্যবস্থা এ যাবত যা গৃহীত হয়েছে বলে জানা যায় তা হলো ওই চেয়ারম্যানসহ আরও দু’তিন জনকে অপসারণ করে নতুন পরিচালক বা চেয়ারম্যান নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। ব্যস- এ পর্যন্তই।

শাস্তির ধরন দেখে তো বোঝাই যায় চেয়ারম্যান ও অন্য অপরাধীরা কোন কেউকেটা ব্যক্তি। চেয়ারম্যান নিজে একজন সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী-স্বভাবতই সরকারী দলভূক্ত একজন নেতা। তাই এমন ‘কঠোর’ শাস্তি! দুদকের হাত অতোদূর পৌঁছাতে যেন সাহসই পাচ্ছে না। বুক কাঁপছে কী দুদকের?

সোনালী ব্যাংকের হাজার হাজার কোটি টাকা পাচার হয়ে গেল। কিছুদিন তা নিয়ে চললো ব্যাপক হৈচৈ। সময় গড়িয়ে যাওয়ার এক পর্যায়ে এসে দেখা যাচ্ছে সব থেমে গেছে-সবই নিশ্চুপ। ব্যস্ মিটে গেল। কিন্তু ওই যে টাকাগুলি? যা নেহায়েতই জনগণের? সে টাকা যাঁরা নানা বে-আইনিপন্থায় মেরে দিলো- তাদের কোনই সাজা হবে না? পার পেয়ে যাবে তারা আইনের হাত থেকে? কেন? তারাও কি সবাই সরকারী দলের নেতা বা তার সাথে প্রকাশ্যে পরোক্ষে সংশ্লিষ্ট?

সরকারী দলের হলে হাজারো অপরাধ করলেও তাদের কোন শাস্তি হবে না – আইনে তেমন কোনও কিছু লিখিত আছে কি? দুর্নীতি দমন কমিশন বিষয়টি জানালে জনগণ পরিস্থিতি সম্পর্কে সঠিক ধারণা নিতে পারতেন। আশা করি, দুর্নীতি দমন কমিশন আর কালবিলম্ব না করে ব্যাংকিং সেক্টরের সঠিক পরিস্থিতি এবং সে ব্যাপারে তাঁদের গৃহীত পদক্ষেপ সম্পর্কে দ্রুতই সংবাদ সম্মেলন ডেকে সব কিছু জনগণকে অবহিত করতে এগিয়ে আসবেন।

ঘুষের দৌরাত্ম্যে অনেকেই নাকি সচিবালয়ে ঢুকতে সাহস পান না-জরুরী সমস্যা নিয়ে সেখানে যাওয়ার প্রয়োজনীয়তা থাকা সত্বেও। পুলিশ বিভাগের দুর্নীতি শুরু হয় একেবারে নীচুতলা থেকে। তার ভিডিওচিত্রও অনেক সময় দেখা যায়। এরকম সরকারি বহু বিভাগেই দুর্নীতি রোগে ভয়াবহভাবে আক্রান্ত। কিন্তু দুর্নীতি দমন বিভাগ বা তাঁদের গোয়েন্দা কর্মকর্তারা সেগুলি সম্বন্ধে কোনো প্রকার পদক্ষেপ কদাপি নিয়েছেন বলে শোনা যায়নি।

অপরপক্ষে ব্যাপকভাবে সংবাদপত্রগুলিতে প্রচারিত হলো মাত্র দু’তিন বা চার সপ্তাহ আগে যে রাস্তা-ঘাট সেতুর নির্মাণ ব্যয় বাংলাদেশে সর্বাধিক। এমন কি ইউরোপীয় ও দক্ষিণ এশিয় দেশগুলির তুলনায়ও সর্বাধিক। খবরটি পড়ে তো হতবাক হতে হয়।

কারণ, সবারই জানা যে বাংলাদেশে শ্রমিক অত্যস্ত সুলভ এবং তাদের মজুরি অত্যন্ত কম। তবুও খরচ এত বেশি কেন? সহজেই বোঝা যায় প্রকল্পগুলি গ্রহণ ও তার নকশা দফায় দফায় পরিবর্তন, প্রকল্পের নির্মাণ কাজের সময়সীমা দফায় দফায় বদলানো প্রভৃতির ফলে নির্মাণ ব্যয়ও বেড়ে যায়। এগুলি সবই তো ইচ্ছাকৃত। কারণ নকশা তৈরির সময় সকল কিছু ভেবেই তো তা করার কথা – দফায় দফায় তা বদলাতে হবে কেন? এ ব্যাপারে কোন নকশা প্রস্তুতকারক কদাপি কোন সাজার সম্মুখীন হয়েছেন কি? যে সকল ঠিকাদার নির্মাণ কাজের দায়িত্ব পেয়ে থাকেন তাঁদেরকে কি নির্দিষ্ট সময়কালের মধ্যে নির্মাণ কাজ সমাপ্ত করার বাধ্যবাধকতা নেই? নিশ্চয়ই আছে। কিন্তু ওই সময়ের মধ্যে কাজ শেষ না করার জন্য কোনো ঠিকাদার কদাপি উপযুক্ত শাস্তি পেয়েছেন কি? দুদক কী বলে?

বাংলাদেশের সব নদীগুলো ভরাট হয়ে গেল। তথাকথিত ‘প্রভাবশালীরা’ই নানা বর্জ্য নদীর জলে ফেলে ও তার উভয় পাড়ে বাড়িঘর বে-আইনিভাবে নির্মাণ করে দিব্যি প্রকাশ্য দিবালোকেই তা করেছেন এবং করে চলেছেন। যেন ওই ‘প্রভাবশালীরা’ তা করতেই পারেন আইনে কোনো বাধা নেই। কিন্তু বাস্তবে কী তাই? এগুলি ভয়ংকর অপরাধ। কিন্তু আইন প্রয়োগকারী কর্তৃপক্ষ দেখে এগুলির না দেখার ভান করে-দুদক নির্বিকার থাকে। তাই তা অহর্নিশ ঘটে চলেছে।

হিন্দুদের দেবোত্তর সম্পত্তি। এগুলি বিক্রি বা হস্তান্তরের কোনো আইনগত সুযোগ নেই। কিন্তু বছরের পর বছর ধরে তা হতে হতে আজ আর বাংলাদেশে দেবোত্তর সম্পত্তির অস্তিত্বই নেই বললে খুব একটা অত্যুক্তি হবে না। এ ব্যাপারে এখনও ব্যবস্থা নেওয়া সহজ যদি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ইচ্ছা থাকে। খোঁজ নেওয়া হোক ১৯৪৭ সালের অগাস্টে এই দেশে দেবোত্তর সম্পত্তি সি এস খতিয়ান অনুযায়ী কতো ছিল? আর আজ ২০১৮ সালে ওই সম্পত্তি বর্তমান আর এস খতিয়ানে কত? এই তথ্য বের করলে যে কোনো লোকেরই চোখ কপালে উঠবে।

দুদক কী সে কাজে হাত দেবে? উদ্ধার করবে হারিয়ে যাওয়া সম্পত্তি? নদীগুলির ক্ষেত্রেও একই দাবি।

না। দুর্নীতি দমন কমিশন একেবারেই কিছু করছে না এমন দাবি করলে নেহায়েতই তা অসত্য ভাষণ হবে। দেখছি তো করছে। কী করছে- তাও তো সংবাদপত্রগুলিতে প্রকাশিত হচ্ছে। তারা যে সকল শিক্ষক- ‘কোচিং সেন্টার’ খুলে বসেছেন তাদেরকে চিহ্নিত করতে ব্যাপক অনুসন্ধান কাজে লিপ্ত হয়েছেন।

অপরদিকে বেসিক ব্যাংক, সোনালী ব্যাংক, ড্যাটকো গ্রুপের চেয়ারম্যান মুসা বিন শমসের, জাপা নেতা কাজী ফিরোজ রশীদ, মিডল্যান্ড ব্যাংকের এম ডি আহসানুজ্জামান, শাহ্জালাল ইসলামী ব্যাংকের ডিএমডি মনজুরুল ইসলামসহ আরও অনেক হর্তাকর্তা, বিধাতা দিব্যি আইনকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে চলছেন-পারও পেয়ে যাচ্ছেন অনায়াসেই।

উদাহরণ হাজার হাজার বা ততোধিক পাওয়া যাবে। যত বেশি বহুতল দালান গত দু’টি দশক ধরে সারা দেশে নির্মাণ হয়েছে, যত বেশি জমকালো বিপণী বিতান গড়ে উঠছে ঢাকা-চট্টগ্রাম ও অন্যান্য নগরীতে, সেগুলির টাকার উৎস কোথায়? তার হদিশ মেলা কঠিন হলেও আদৌ অসম্ভব নয় বরং অবশ্যই সম্ভব।

আর তা না করে চুনোপুঁটি মারলে দুর্নীতি আদৌ দমন হবে না বরং দিনে দিনে তা আরও ব্যাপকভাবে সমাজের নানা ক্ষেত্রে বিস্তার লাভ করতেই থাকবে। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হবে না, যদি আইন সবার ক্ষেত্রে সমভাবে প্রয়োগ না করা হয়।

প্রশ্ন তো জাগেই যখন মাঝে-মধ্যে দুদক চেয়ারম্যান দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে সদম্ভ হুংকার ছাড়েন, বলেন তাঁরা দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি নিয়েছেন কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়- ফুস্। যেন নখ দন্তহীন এক বাঘ-হুঙ্কারই ছাড়ে শুধু।

যা হোক, লেখাটি দুদকের নজরে পড়ে? তাঁরা কি বাস্তবে দুর্নীতি দমনে তৎপর হবেন? নাকি দিবস বা সপ্তাহ ঘটা করে পালনেই সীমাবদ্ধ থাকবেন?