অমর একুশে

নিজস্ব প্রতিবেদক>
অনুধাবন হয়তো অনেকে করেছিলেন; কিন্তু শিক্ষাবিদ আবুল ফজলই সম্ভবত প্রথম লিখেছিলেন ‘একুশ মানে মাথা নত না করা।’ প্রশ্ন হচ্ছে, একুশ মানে কি নিছকই মাথা নত না করা? নাকি একুশ মানে আসলে মাথা নত করা তো নয়ই; সগৌরবে মাথা উঁচু করা। গত চার দশকের ব্যবধানে একুশ হয়ে উঠেছে বাংলাদেশের ভেতরে-বাইরে বাংলা ভাষা ও বাঙালি জাতির একই সঙ্গে সার্বজনীন ও একান্ত গৌরবের উৎস। শুধু বাংলা ভাষা বা বাঙালি জাতি নয়; একুশে ফেব্রুয়ারি এখন গোটা বিশ্বের মাতৃভাষা উদযাপনের দিন।

মায়ের ভাষার জন্য জীবন বাজি রাখার অনন্য ইতিহাসকে শ্রদ্ধা জানিয়ে ১৯৯৯ সালে ইউনেস্কো ২১ ফেব্রুয়ারি দিনটিকে ঘোষণা করে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে। বাঙালির একান্ত গর্ব ও শোকের ঘটনাটি কেবল বাংলা ভাষা নয়, আদায় করে বিশ্বের সব মাতৃভাষার জন্য স্বীকৃতি। যে দিবস বিশ্বে ছড়িয়ে থাকা বাঙালিরাই পালন করত, এখন তা যথাযোগ্য মর্যাদায়

পালিত হয় জাতিসংঘের সব সদস্য রাষ্ট্রে। স্মরিত হন বাংলা ভাষার জন্য শহীদ ও সংগ্রামীরা। বাংলা ভাষার শহীদ মিনার স্থান পেয়েছে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা সংক্রান্ত জাতিসংঘের অফিসিয়াল সাইটে। নিজের মাতৃভাষার প্রতি সম্মান দেখানোর পাশাপাশি বিশ্বের সব জাতি এখন মনে রাখে বাংলা ভাষাকেও।

কেবল কি একুশ তারিখ? গোটা ফেব্রুয়ারি মাসই কি এখন বাংলার ভাষার মাস নয়? ফেব্রুয়ারিজুড়েই মুখর থাকে ঢাকা, কলকাতা, আগরতলা, শিলচরের মতো বাঙালির কেন্দ্রভূমিগুলো। মুখর থাকে দূরদেশের বাঙালি অধ্যুষিত জনপদগুলোও। একুশ যদি মাথা উঁচু করার দিন হয়, তাহলে ফেব্রুয়ারি মাসও নিশ্চয়ই মাথা উঁচু করার মাস। ফেব্রুয়ারি আদতে বাংলা ভাষার ফাগুন, বাংলা ভাষার বসন্ত দিন।

ফেব্রুয়ারির একুশ তারিখ আসতে আসতে বাংলার ঋতুতেও সত্যিকারের বসন্ত এসে হাজির হয়, আমরা জানি। ফেব্রুয়ারি যদিও শুরু হয় মাঘের মাঝামাঝি; ২১ ফেব্রুয়ারি যখন আসে, তখন বাংলা পঞ্জিকায় মুখর ফাগুন। আমরা দেখতে পাইথ ফাগুনেরই রূপ, রস, শোভা সঞ্চারিত হয় ফেব্রুয়ারিজুড়ে, বাংলা ভাষার মাধ্যমে, বাঙালির উদযাপনে, বিশ্বব্যাপী। এমনকি বসন্ত জাগে বিশ্বের সকল মাতৃভাষায়থ বললেও অত্যুক্তি হয় কি?

বিষয়টি নিছক উদযাপনেরও নয়; মনে রাখা জরুরিথ বাংলা এখন বিশ্বের কমবেশি ৩০ কোটি মানুষের মুখের ভাষা। বাংলাদেশ ছাড়াও ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, ত্রিপুরা, আন্দামান-নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ, মেঘালয়, বিহার, উড়িষ্যা, অল্প্রব্দপ্রদেশ, ছত্তিশগড়, দিল্লিসহ বিভিন্ন রাজ্যে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে বাংলাভাষী জনগোষ্ঠী। দক্ষিণ এশিয়ায় পাকিস্তান ও নেপালেও রয়েছে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক বাংলাভাষী। শ্রীলংকা, মালদ্বীপ, ভুটান, মিয়ানমার, আফগানিস্তানেও কর্মসংস্থান ও অভিবাসনসূত্রে ছড়িয়ে পড়েছে বাঙালিরা, তাদের সঙ্গে সঙ্গে ‘আ মরি বাংলা ভাষা’। হিমালয় থেকে বঙ্গোপসাগরের সীমানা ছাড়িয়ে বাঙালিরা ছড়িয়ে পড়ছে বিশ্বের প্রান্তে প্রান্তে। দূরপ্রাচ্য থেকে মধ্যপ্রাচ্য হয়ে তারা পাড়ি জমিয়েছে ইউরোপ, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, আফ্রিকায়। সঙ্গে গেছে মায়ের ভাষা। যেখানে কয়েকশ’ বাঙালি একত্র হয়েছে, সেখানেই পৌঁছে গেছে মাতৃভাষার উদযাপন। সংখ্যাটা আরেকটু বাড়লে তৈরি হয়েছে অস্থায়ী শহীদ মিনার। বাঙালির সংখ্যা যখন হাজার ছাড়ায়, তখন সেখানে স্থায়ী শহীদ মিনারের ভিত্তি তৈরির প্রস্তুতি শুরু হয়।

১৯৫২ সালের পর গত ছয় দশকে বাংলা ভাষার মর্যাদা ও মননের প্রধান প্রতীক শহীদ মিনার কীভাবে ছড়িয়ে পড়েছে বাংলাদেশের বাইরে, তা এখন গবেষণার বিষয় নয়। এর উপস্থিতি সাদা চোখেই সমুজ্জ্বল দৃশ্যমান। ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা, আসাম, মেঘালয়, ঝাড়খণ্ড, ছত্তিশগড়ের বিভিন্ন জনপদে শহীদ মিনার আগে থেকেই মাথা তুলে দাঁড়াচ্ছিল; বাকি বিশ্বেও বাংলা ভাষার গৌরব ঘোষণা করছে অনেক শহীদ মিনার। ইতিমধ্যে যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, ইতালি, জাপান, কানাডা, অস্ট্রেলিয়ায় তৈরি হয়েছে স্থায়ী শহীদ মিনার। যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের বিভিন্ন বাঙালি অধ্যুষিত জনপদে ফেব্রুয়ারিতে প্রতিষ্ঠিত হয় অস্থায়ী শহীদ মিনার। এই সংখ্যা কয়েক বছর আগে একশ’ ছাড়িয়েছে।

শহীদ বেদিতে যেহেতু ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানো হয় বাংলা ভাষার দামাল ছেলেদের; বিশ্বজুড়ে শহীদ মিনার ছড়িয়ে পড়ার বিষয়টিকে ‘বাংলা ভাষার শতফুল’ বললেও অত্যুক্তি হয় না। কিন্তু শহীদ মিনার মানে কি নিছক ফুলেল বিষয়? এর কাঠামোর মধ্যেই রয়েছে মাথা নিচু না করার ঋজুতা। অন্য কথায়থ রয়েছে রাজনীতি, অর্থনীতি, কূটনীতিতে মাথা উঁচু করার শপথ। একুশের চেতনায় পরবর্তী সময়ে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ সেই শপথেরই সফল বাস্তবায়ন দেখিয়ে চলেছে।