চোখ বুঁজে রায় শোনেন খালেদা, আদালতে পড়েন নামাজ

প্রকাশ বিশ্বাস, জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক >
বিচারক যখন সাজার রায় পড়ছিলেন, তখন চোখ বুঁজে তা শুনছিলেন খালেদা জিয়া; তার আগে আদালত কক্ষে নামাজও পড়েন তিনি।

জিয়া এতিমখানা ট্রাস্টের ২ কোটি টাকা আত্মসাতের এই মামলায় বৃহস্পতিবার সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে ৫ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছে ঢাকার জজ আদালত।

জিয়া এতিমখানা ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলার রায় ঘোষণার আগে বৃহস্পতিবার গুলশানের বাসভবন থেকে বকশীবাজারের বিশেষ আদালতের পথে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। ছবি: বাবুল তালুকদারপুরান ঢাকার বকশীবাজারে কারা অধিদপ্তরের মাঠে স্থাপিত বিশেষ এজলাসে বিচারক আখতারুজ্জামান রায় পড়ে শোনানোর পর বিএনপি চেয়ারপারসনকে নিয়ে যাওয়া হয় নাজিমউদ্দিন সড়কের পুরনো কারাগারে।

রায় শুনতে বেলা ১১টা ৪৫ মিনিটে নিজের গাড়িতে গুলশানের বাড়ি থেকে রওনা হন খালেদা; পথে পথে দলের নেতা-কর্মীদের মিছিল পরিবেষ্টিত হয়ে ১টা ৫২ মিনিটে আদালতে পৌঁছান তিনি।

আদালতের পথে খালেদা জিয়ার গাড়িবহর ঘিরে মিছিলে বিএনপি নেতাকর্মীরা। ছবি: বাবুল তালুকদার

আদালতের পথে খালেদা জিয়ার গাড়িবহর ঘিরে মিছিলে বিএনপি নেতাকর্মীরা। ছবি: বাবুল তালুকদার

জনাকীর্ণ আদালত কক্ষে বিচারকের ডায়াসের খুব কাছের একটি চেয়ারে বসেন ঘিয়ে রঙের শিফন শাড়ি পরা খালেদা জিয়া।

বিচারক আসন গ্রহণের আগে এজলাসে নামাজের ঘরে জোহরের নামাজ পড়েন তিনি। এরপর ফিরে আসেন আগের জায়গায়।

বিচারক রায় পড়ে শোনানোর আগে খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত নিরাপত্তারক্ষীদের তার কাছ থেকে সরে যেতে বলেন।

রায় পড়ার শুরুতে বিচারক বলেন, “রায়টি ৬৩২ পৃষ্ঠার, কিন্তু আমি সংক্ষিপ্ত আকারে তা পড়ে শোনাব।”

বিচারক ট্রাস্ট গঠন, লেনদেনে অনিয়ম, আত্মসাতের ইতিহাস, মামলা দায়ের, অভিযোগপত্র, অভিযোগ গঠন, রাষ্ট্রপক্ষের ৩২ সাক্ষীর জবানবন্দি, আসামিপক্ষ থেকে জেরা বিষয়গুলো তুলে ধরেন।

এসময় চেয়ারে বসা খালেদা জিয়া চোখ বুঁজে শুনছিলেন।

সাবেক প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে রায় দেওয়ার সময় জজ আখতারুজ্জামানকে এদিন গম্ভীর দেখাচ্ছিল; অন্যদিন তিনি থাকতেন হাসিখুশি; আসামিপক্ষ ও রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীদের সঙ্গে কোনো কথাও বলেননি তিনি।

১১টি বিচার্য বিষয়ের উপর এই মামলায় সিদ্ধান্ত টানার কথা জানিয়ে ২০ মিনিটের মধ্যে রায় পড়ে আসন ছেড়ে খাসকামরায় চলে যান বিচারক।

রায়ের আগে আদালতের পথে গাড়িতে থাকা খালেদা জিয়াকে শুভেচ্ছা জানাচ্ছেন এক সমর্থক

রায়ের আগে আদালতের পথে গাড়িতে থাকা খালেদা জিয়াকে শুভেচ্ছা জানাচ্ছেন এক সমর্থক

রায়ের পরপরই নারী পুলিশ সদস্যরা চার দিক থেকে ঘিরে ফেলে খালেদা জিয়াকে। কোনো আইনজীবী কিংবা সাংবাদিক কথা বলতে পারেননি তার সঙ্গে।

রায় শুনে খালেদার আইনজীবী মাহবুবউদ্দিন খোকন, বোরহান উদ্দিন, খোরশেদ আলম মিয়াকে চোখ মুছতে দেখা যায়। খানিকক্ষণ পর নয়া পল্টনে দলীয় কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে এসেও কেঁদে ফেলেছিলেন বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী।

এজলাসে থাকা খালেদার আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন, রেজাক খান, জয়নুল আবেদীনকে মুষড়ে পড়তে দেখা যায়। ‘ফলস’, ‘সব ফলস’ বলে চেঁচিয়ে ওঠেন মাহবুবউদ্দিন খোকন।

রেজাক খান বলে ওঠেন, “এজলাসে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর এত উপস্থিতিতেই বোঝা গেছে, কী রায় হতে পারে।”

রায়ের পর খালেদার গৃহপরিচারিকা মোসাম্মৎ ফাতেমাকে কারাগারে তার সঙ্গে রাখার আবেদন জমা দেওয়া হয় আদালতে।

বিকাল পৌনে ৩টার দিকে খালেদা জিয়াকে আদালত থেকে বের করে কারাঅধিদপ্তরের মূল ফটকের বিপরীতে মসজিদ এবং উপ কারামহাপরিদর্শক কার্যালয়ের সামনে দিয়ে ‘স্পেশাল জেলে’ নেওয়া হয়।

কারা অধিদপ্তরের উপ মহাপরিদর্শক তৌহিদুল ইসলাম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “খালেদা জিয়াকে আপাতত পুরাতন কারাগারের প্রশাসনিক ভবনে রাখা হয়েছে। পরে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আমরা এখন এটাকে ‘স্পেশাল জেল’ বলছি।”

বকশীবাজারের বিশেষ জজ আদালতের অস্থায়ী এজলাস থেকে হাঁটা দূরত্বে পুরনো কারাগার ভবনে খালেদাকে নেওয়া হয় উপ-কমিশনার ফরিদা রহমানের গাড়িতে করে। চারপাশ থেকে ওই গাড়ি ছিলেন সশস্ত্র পুলিশ ও র‌্যাব সদস্যরা। সামনে ও পেছনে আরও কয়েকটি গাড়ি ছিল।

ফরিদা রহমান বসেছিলেন গাড়ির সামনের আসনে। আর খালেদা জিয়া ছিলেন পেছনের আসনে, একা।

দুপুরের দিকে কারাগারের একটি গাড়িতে করে লেপ তোষকও নিতে দেখা যায় কারাগারের ভেতরে।

কারা কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, পুরনো কারাগারের মূল ভবনের নিচতলার একটি কক্ষে খালেদা জিয়াকে রাখা হয়েছে। ওই কক্ষ এক সময় একজন কারা কর্মকর্তা ব্যবহার করতেন। সামনে একটি খোলা জায়গাও আছে। তবে যে কোনো সময় তাকে অন্যত্র স্থানান্তর করা হতে পারে।