২ দিন না যেতেই হারের শঙ্কায় বাংলাদেশ!

ক্রীড়া প্রতিবেদক :

২ দিন না যেতেই হারের শঙ্কায় বাংলাদেশ!

একটা দলের জন্য সর্বোচ্চ যতটা খারাপ দিন যেতে পারে তার সবটাই হলো শুক্রবার। টাইগারদের জন্য চরম বাজে একটি দিন। চাপে থেকেই দিনের শুরু। এদিন চাপ কমাতে পারা তো দূরের কথা, উল্টো বড় বিপদে স্বাগতিকরা। মাত্র ৩ রান তুলতেই শেষ ৫ উইকেট হারিয়েছে দলটি সেই সকালে। ১১০ রানে শেষ প্রথম ইনিংস! গত এক দশকে ঘরের মাঠে টাইগারদের সবচেয়ে বাজে ইনিংস। টাইগারদের বিপদ আরও বাড়িয়ে তোলে শ্রীলঙ্কার দ্বিতীয় ইনিংস। ৮ উইকেটে ২০০ রান সংগ্রহ করেছে দলটি। বেশ কিছু সহজ ক্যাচের মাশুল গুনে দিন শেষে ৩১২ রানে পিছিয়ে আছে বাংলাদেশ। সামনে আছে আরও তিনটি দিন। টাইগারদের সামনে এই উইকেটে সফরকারীরা যে বেশ বড় টার্গেট দাঁড় করাতে যাচ্ছে সেটা খুব স্পষ্ট মিরপুর টেস্টের দ্বিতীয় দিন শেষেই। তার মানে, ম্যাচের দুই দিন না যেতেই হারের শঙ্কা চোখ রাঙাচ্ছে টাইগারদের।

আসলে মিরপুর শেরে বাংলা স্টেডিয়ামের রেকর্ডে চোখ রাখলে বলতে হবে ‘বাংলাদেশ’ চতুর্থ ইনিংসে ব্যাট করতে নামার আগেই হেরে বসে আছে। কারণ, এই মাঠে ৩০০ এর বেশি রানের টার্গেট তাড়া করে জেতার রেকর্ড নেই কারো। ২০১০ সালে বাংলাদেশের দেওয়া ২০৯ রানের টার্গেট অবশ্য বেশ সহজেই অর্জন করেছিল ইংল্যান্ড। ওটাই চতুর্থ ইনিংসে ঢাকায় সর্বোচ্চ রান তাড়া করে জেতার রেকর্ড হয়ে আছে। সেখানে শ্রীলঙ্কার লিড ৩০০ পেরিয়েছে। তৃতীয় সকালে তারা চাইবে আরো কিছু রান যোগ করতে। তাহলে? খেলাটা মহান গৌরবময় অনিশ্চয়তার ক্রিকেট বলেই চূড়ান্ত কিছু এখনই বলে দেওয়ার উপায় নেই মোটেও। যদিও সাদা চোখে বাংলাদেশের হারটা বেশ দেখা যাচ্ছে।

প্রথম দিনের শেষ সেশনে ৫৬ রান তুলতেই শীর্ষ ৪ উইকেট হারিয়েছিল বাংলাদেশ। তবে উইকেটে ছিলেন চট্টগ্রামের শেষ ইনিংসে ৯৪ রানের দুর্দান্ত ইনিংস খেলা লিটন কুমার দাস। তার ব্যাটের দিকেই তাকিয়ে ছিলো বাংলাদেশ। কিন্তু এদিন সাত-সকালে ডুবিয়েছেন তিনিই। সকালে দলের স্কোর ১৭ রান যোগ করতেই যেন অলসতায় পেয়ে বসে লিটনকে! ঠিক কি শট খেলেছেন বলতে পারবেন না হয়তো নিজেও। ক্রিকেটিয় ব্যাখ্যায়ও নেই। জায়গায় দাঁড়িয়ে ঝাড়ুর বাড়ি মারার মতো কিছু একটা করে যেন বাইরের বলকে উইকেটে এনে বোল্ড হলেন। ২৫ রানে শেষ তার ইনিংস। তার কাছে থেকেই যেন পরের ব্যাটসম্যানরা প্রতিপক্ষকে উইকেট উপহার দেওয়ার দীক্ষা নিয়ে নেন!

টপ অর্ডারের ৫ উইকেট হারনোর পর বাংলাদেশের সব আশা ভরসা হয়ে ছিলেন ভারপ্রাপ্ত অধিনায়ক মাহমুদউল্লাহ (১৭)। মেহেদী হাসান মিরাজ (অপরাজিত ৩৮) ব্যাটসম্যান হিসেবে নিজেকে টেস্টে প্রমাণই করতে পারছেন না সেভাবে। এদিন রুখে দাঁড়ালেন অধিনায়কের সাথে। ৩৪ রানের জুটিটা প্রতিরোধের গল্প লেখারই আভাস দিচ্ছিল। চট্টগ্রামে কি কাণ্ডটাই না করে এসেছেন মাহমুদউল্লাহ। সেটা তো সবার মনে গেঁথে আছে। তবে এই জুটি টাইগারদের দলীয় রান ১০০ পার করিয়ে দিল বটে, তারপরই তাসের ঘর স্বাগতিক ইনিংস!

১০৭ রানে আউট হন অধিনায়ক। অফ স্টাম্পের বাইরে থাকা বল এক পা এগিয়ে রক্ষণাত্মক ঢঙেই খেলতে গিয়ে মিস করলেন। স্পিন করে বল আঘাত হানে উইকেটে। কার্যত সেখানেই শেষ বাংলাদেশের ইনিংস। এরপর আর রান হয়েছে ৩টি। খেলেছেন ২১টি বল। শেষ ৫ ব্যাটসম্যান আউট।

মাহমুদউল্লাহ আউট হওয়ার পর দলের শেষ স্বীকৃত ব্যাটসম্যান হিসেবে মাঠে নেমেছিলেন সাব্বির রহমান। এই সিরিজের দলেই ছিলেন না। পরে এই ম্যাচের জন্য ডাক পেয়ে তার প্রমাণের ছিল অনেক কিছু। কিন্তু কোথায় কি! মাত্র ৩ বল টিকলেন। একটিও রান করতে পারলেন না। ড্রাইভ করতে গিয়ে শর্ট মিড উইকেটে ক্যাচ তুলে দেন তিনি। বল কিছুটা নিচু হয়েছিল। তবে তা লুফে নিতে কোন অসুবিধাই হয়নি লঙ্কান অধিনায়ক দিনেশ চান্দিমালের। আর তাতে মোসাদ্দেক হোসেন সৈকতকে বাদ দিয়ে সাব্বিরকে নেওয়ার সিদ্ধান্তের বিতর্কটা আরও বাড়ে। এরপর একে একে আউট আব্দুর রাজ্জাক (১), তাইজুল ইসলাম (১) ও মোস্তাফিজুর রহমান (০)। বাংলাদেশ চোখের পলকে ৫ উইকেটে ১০৭ থেকে ১১০ রানেই শেষ!

একপ্রান্তে বাংলাদেশের ধ্বংসযজ্ঞ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখা ছাড়া আর কিছুই করার ছিলো না মিরাজের। অপরাজিত থেকেই মাঠ ছেড়েছেন। আহা, কেউ যদি সঙ্গ দিতে পারতেন তাকে! চট্টগ্রামে প্রথম ইনিংসে লেজের প্রতিরোধে বিরাট কিছু হলো সেই লেজেই এখানে লেজেগোবরে অবস্থা। এদিন দুই অঙ্কের কোটা ছুতে পেরেছেন কেবল অধিনায়ক মাহমুদউল্লাহই। শ্রীলঙ্কার পক্ষে ৩টি করে উইকেট নিয়েছেন সুরঙ্গা লাকমাল ও অভিষিক্ত স্পিনিং অল রাউন্ডার আকিলা ধনাঞ্জয়া। ২টি উইকেট পেয়েছেন দিলরুয়ান পেরেরা।

প্রথম ইনিংসে ১১২ রানে পিছিয়ে থাকার পর টাইগারদের প্রয়োজন ছিলো শ্রীলঙ্কার দ্বিতীয় ইনিংসের শুরুতে আঘাত। দলীয় ১৯ রানে সেটা করে দেন রাজ্জাক। যেমনটি করেছিলেন এই ম্যাচের প্রথম ইনিংসেও। ফর্মের তুঙ্গে থাকা কুশল মেন্ডিসকে আউট করেন তিনি। কিন্তু এরপর ছোট ছোট জুটিতে ঠিকই এগিয়ে যায় লঙ্কানদের ইনিংস। গুছিয়ে উঠতে থাকে। এক পর্যায়ে ৫ উইকেটে ১৭০ রান ছিল অতিথিদের। তবে এরপর দ্রুত ৩টি উইকেট তুলে ম্যাচে ফিরে আসার জোর চেষ্টা চালায় টাইগাররা। ৫৬তম ওভারে টানা দুই বলে উইকেট নিয়ে হ্যাটট্রিকের সম্ভবনা তৈরি করেছিলেন মোস্তাফিজুর রহমান। তবে এরপর সুরাঙ্গা লাকমাল তার সে সম্ভাবনাকেই থামিয়ে দেননি, রোশান সিলভার সঙ্গে জুটি বেঁধে লঙ্কানদের ইনিংস নিয়েছেন দুইশর কোটায়। ৮ উইকেটে ২০০ রানে দ্বিতীয় দিন শেষ করে সফরকারীরা।

দলের পক্ষে সর্বোচ্চ ৫৮ রানের ইনিংস খেলে অপরাজিত আছেন রোশান। শুরু থেকেই দারুণ ব্যাট করে বন্ধুর এ উইকেটে ৯৪ বল মোকাবেলা করে খেলেন এ ইনিংস। ৯টি চারের সাহায্যে নিজের ইনিংস সাজান তিনি। শেষ তিন ইনিংসে ব্যর্থতার পর মিরপুর টেস্টে ৩০ রান করেছেন দিমুথ কারুনারাত্নে। ৫৪ বলে অধিনায়ক চান্দিমাল করেন কার্যকরী ৩০ রান। এছাড়া মাত্র ২৪ বলে ধনাঞ্জয়া ডি সিলভার ২৮ রানও বেশ ভুগিয়েছে টাইগারদের। বাংলাদেশের পক্ষে ৩৫ রানের বিনিময়ে ৩টি উইকেট নিয়ে দিনের সেরা বোলার মোস্তাফিজ। উইকেট পেতে পারতেন আরও। তবে তার বলে সহজ ক্যাচ ছেড়েছেন ইমরুল-সাব্বিররা। এছাড়া তাইজুল ইসলাম ও মেহেদী হাসান মিরাজ ২টি করে উইকেট নেন। ১টি উইকেট আব্দুর রাজ্জাকের।

দিনশেষে আসলে দিনের শুরুটাই বাংলাদেশের জন্য ভয়াবহতার কারণ হয়ে থাকলো। আর মাথার ওপর এই যে খরগ ঝুলছে সেটা তো ওই ভুতুরে সকালটির জন্যই।

সংক্ষিপ্ত স্কোর :

দ্বিতীয় দিন শেষে

শ্রীলঙ্কা প্রথম ইনিংস : ২২২/১০ (৬৫.৩ ওভার)

বাংলাদেশ প্রথম ইনিংস : ১১০ (৪৫.৪ ওভার) (তামিম ৪, ইমরুল ১৯, মুমিনুল ০, মুশফিক ১, লিটন ২৫, মিরাজ ৩৮*, মাহমুদউল্লাহ ১৭, সাব্বির ০, রাজ্জাক ১, তাইজুল ১, মোস্তাফিজ ০; লাকমাল ৩/২৫, দিলরুয়ান ২/৩২, আকিলা ৩/২০, হেরাথ ০/৩১)।

শ্রীলঙ্কা দ্বিতীয় ইনিংস : ২০০/৮ (৬২ ওভার) (করুনারত্নে ৩২, মেন্ডিস ৭, ধনাঞ্জয়া ২৮, গুনারত্নে ১৭, চান্দিমাল ৩০, রোশেন ৫৮*, ডিকভেলা ১০, দিলরুয়ান ৭, আকিলা ০, লাকমাল ৭*; রাজ্জাক ১/৬০, মোস্তাফিজ ৩/৩৫, তাইজুল ২/৭২, মিরাজ ২/২৯)।