ক্রাইম ডায়রি> যশোর এমএম কলেজের আসাদ হল কি ‘টর্চারসেল’?

নিজস্ব প্রতিবেদক>
যশোর সরকারি এমএম কলেজের শহিদ আসাদ হলটি মুক্তিপণ আদায়ের নিরাপদ ঘাঁটি হিসাবে দেখছে লোকজন। অনেকে ‘টর্চারসেল’ হিসাবে নামকরণ করছেন। কারণ আসাদ হলে অনেক মানুষকে আটকে রেখে নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে। সাধারণ শিক্ষার্থী এমনকি রাজনৈতিক কর্মী পর্যন্ত নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন সেখানে। এখন প্রশ্ন উঠেছে নির্যাতনকারী কারা? আর কেনই বা তাদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেয়া হয় না। কয়েকমাস ধরে এখানে নির্যাতনের খবর ছড়িয়ে পড়ছে।
কিন্তু অনেকে সাহস পাচ্ছে না এর প্রতিবাদ করতে। কারই এরা এতটায় সংঘবদ্ধ ও শক্তিশালী যে প্রতিবাদ করলে উল্টো হয়রানির শিকার হতে হয়। নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিকে নানা অজুহাতে পুলিশের হাতে তুলে দেয় চক্রের সদস্যরা। আবার যারা ছাড়া পায় তাদের গুনতে হয় মোটা অংকের অর্থ।
গত ১১ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে এমএম কলেজের আসাদ হলের গেটের সামনে থেকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয় আমিন নামে এক যুবককে। আমিন বেনাপোলের রঘুনাথপুর গ্রামের আজিজুর রহমানের ছেলে। তিনি একটি সরকারি বাহিনীর সিভিল টেকনিশিয়ান হিসেবে চাকরি করেন। তাকে হলের দোতলার প্রথম রুমে আটকে রেখে তার পরিবারের কাছে মোবাইল ফোনের সাহায্যে দুই লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়। মুক্তিপণ না দিলে তাকে হত্যা করা হবে বলে হুমকি দেয়া হয়। পরে পরিবারের লোকজন কোতয়ালি থানায় একটি অভিযোগ দিলে পুলিশ হলে গিয়ে তাকে উদ্ধার করে। কিন্তু যারা তাকে আটকে রেখে মুক্তিপণ দাবি করে তাদের কাউকে আটক করা হয়নি। এঘটনায় এক ব্যক্তি পুলিশকে সহযোগিতা করায় ওই হলে থাকা নেতা নামধারী এক শিক্ষার্থী তাকে মোবাইল ফোনে গালিগালাজ করে। যার রেকর্ড রয়েছে।
এর আগে গত ১ জানুয়ারি রাত ১০টার দিকে যশোর জাতীয় গণতন্ত্রিক ফ্রন্টের দুই কর্মী মুকুল ও জুয়েলকে ডিসি অফিসের সামনে থেকে ৪/৫ জন যুবক ধরে নিয়ে আসাদ হলে মধ্যে নিয়ে যায়। তাদের বলা হয় ‘নাহিদ ভাই ডাকছে।’ এরপর হলের মধ্যে নিয়ে গিয়ে বেধড়ক মারপিট করা হয়। পরে তাদের মুক্তি দেয়া হলে আহত অবস্থায় যশোর ২৫০ শয্যা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
কিছুদিন আগে আরও এক যুবককে ধরে নিয়ে যাওয়া হয় হলের দিকে। ওই যুবক দৌঁড়ে পালানোর চেষ্টা করলে পিছু ধাওয়া করে অধ্যক্ষের রুমের সামনে নিয়ে গিয়ে রাতের আঁধারে ছুরিকাঘাত করা হয়। তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। তারও আগে বেশ কয়েকজন যুবককে সেখানে নিয়ে গিয়ে নির্যাতন করা হয়েছে বলে অভিযোগ আছে। অনেক নির্যাতিত ভয়ে পুলিশে অভিযোগ দেয়নি। সংবাদকর্মীদের কাছে নাম বলতে ভয় পান।
এখন প্রশ্ন হলো নির্যাতনকারী কারা? হলে থাকা শিক্ষার্থী ;না-কি বহিরাগতরা সেখানে অবস্থান নিয়ে ভাড়াটে হিসাবে কাজ করে থাকে?
ওই এলাকার একটি সূত্র জানিয়েছে, যে কোন সমস্যা সমাধানে ওই হলে অবস্থানকারীরা করে থাকে। কাউকে শায়েস্তা করতে চাইলে হলে থাকা যুবকদের হাতে টাকা গুজে দিলেই ধরে হলে নিয়ে নির্যাতন করে সমস্যা সমাধান করে দেয়া হয়। এক শ্রেণির দুর্বৃত্ত শিক্ষার্থীর আড়ালে ওই কাজের কনট্রাক্ট নিয়ে থাকে। আসাদ হলটিকে তারা নিরাপদ ঘাটি হিসেবে ব্যবহার করছে। সচারচর পুলিশি অভিযান সেখানে হয় না। এই কলেজের এই ছাত্রাবাসে বহিরাগতরাও বসবাস করে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ বিষয়ে কথা হয় এমএম কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর আবু তালেব মিয়ার সাথে। তিনি বলেছেন, সব ঘটনা আমার জানা থাকে না। কিছু দিন আগে আমিন নামে এক ছেলে ঝামেলায় পড়েছিল। তিনি সেখানে গিয়েছিলেন তার এক ভাইয়ের সাথে দেখা করতে। তার বন্ধুরা টাকা পয়সা নিয়ে কী একটি ঝামেলায় পড়ে। ছেলেটির মা আমার কাছে আসলে আমি সেটির সমাধান করে দিই।
তিনি বলেছেন, কলেজে প্রতিনিয়ত এই ধরনের ঘটনা ঘটে এটি আমার জানা ছিল না। আমার কাছে কেউ অভিযোগ দেয়নি। অভিযোগ পেলে দেখতাম। তিনি বলেছেন, মাস দু’য়েক হলো আসাদ হলে একজন সুপার নিয়োগ দেয়া হয়েছে। রাষ্ট্র বিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মুকুল হায়দার দেখভাল করছেন। তার কাছেও কোন অভিযোগ আসেনি বলে আমার জানা। তবে বিষয়টি আরো গুরুত্বের সাথে দেখা হবে বলে তিনি জানিয়েছেন।
এবিষয়ে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (হেডকোয়ার্টার) জুয়েল ইমরান জানিয়েছেন, আসাদ হলে নিয়ে গিয়ে নির্যাতনের সংবাদ আমার জানা নেই। অভিযোগ না পেলে পুলিশ কিছু বুঝতে পারবে না। তবে সমস্যার সমাধান আছে। স্থানীয় থানার ওসিকে সাথে নিয়ে আসাদ হল সম্পর্কে খোঁজ খবর নেয়া হবে। প্রয়োজনে এসপি সাহেবের সাথে কথা বলে প্রতিকারের ব্যবস্থা করা হবে।