আমাদের বিচিত্র সুশীলেরা

আমাদের সময় যারা বুদ্ধিজীবী নামে পরিচিত ছিলেন তাদের নাম এখন সুশীল । এই নাম কেন কে জানে। বাংলা অভিধানে সুশীল শব্দের অর্থ দেখলেই বোঝা যাবে কত নিরীহ হবার কথা এদের। অথচ এখন সুশীল মানে যারা কাজ কম কথা বেশী তেমন কিছু মানুষ। যাদের আরেক নাম সমালোচক। আপনি ডান হাতে ভাত খেলে যারা ভাবে বাঁ হাতের অপমান করা হয় আর বাঁ হাতে খেলে বলে ডান হাত কি অচল? তারাই সুশীল।

নিয়মের বাইরে কথা বলার অধিকার পাওয়া এদের কাণ্ড আমরা সবসময় দেখি। আজ দেখলাম মুক্তিপ্রাপ্ত মাহমুদুর রহমান বলেছেন খালেদা জিয়ার মুক্তির আন্দোলন নাকি দ্বিতীয় মুক্তিযুদ্ধের সূচনা। মহান মুক্তিযুদ্ধের এই অবমাননার নাম ও সুশীল কর্ম। কেন কি কারনে ইনি মুক্ত আমরা জানিনা। তবে এটুকু জানি এই মুক্ততার দায় চুকাতেই হবে একদিন। আরো জানি সুশীলেরা মুক্তিযুদ্ধ বলতেই ভাবেন বিতর্কিত কিছু। শফিক রেহমান থেকে ফরহাদ মজহার সবাই কোন না কোন সময় ছিলেন বিপ্লবী। সেই বিপ্লব কখন যে সুশীলের ছায়ায় অন্ধকার হয়ে ডান বাম ভুলে একরোখা হয়ে গেছে তারা নিজেরাও টের পাননি। একটা মজার বিষয় এদের সব কাজের মূলে আছে আওয়ামী লীগ বিরোধিতা। আর মুক্তিযুদ্ধের প্রতি অসম্মান। শহীদের সংখ্যা থেকে ভারত, ভারত থেকে পাকিস্তান এসব মিলিয়ে সুশীলের ব্যবসা জমজমাট। এই ব্যবসায়ীরা রাতের আঁধারে সরকারের সুযোগ সুবিধা নিলেও দিনের বেলায় সরকার বিরোধী।

আওয়ামী লীগের কাছে সবার এত চাওয়া কেন? যারা এর ঘোর বিরোধী যাদের অন্তরে জামাত, ভোটে ধানের শীষ, তারাও দেখি চায় আর চায়। দেশের নাগরিক হিসেবে চাওয়ার অধিকার আছে বৈকি। কিন্তু কতটা?

আপনি সারাদিন সারারাত শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে কথা বলবেন, নৌকা ডোবানোর কাজ করবেন আর হা হুতাশ করবেন এই সরকারের কাছে চাওয়া ছিলো, কিন্তু পেলাম না। এটা কি স্ববিরোধিতা না? মাননীয়া প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বড়গুণ তিনি স্পষ্টভাষী। যা তাঁর অন্তরে তাই তাঁর মুখে। নব্য সুশীলেরা এটা মানতে পারেন না । কেন? কারণ তাঁরা নিজেরাই হিপোক্রেট।  কেন জানিনা এরা সমাজে পপুলার। ধারণা করি মধ্যবিত্তের দোদুল্যমান মন এদের দিকে ঝুঁকে থাকার কারণ ককটেল রাজনীতি। এরা মনে মনে পাকিদের ভালোবাসে। মুখে মুক্তিযুদ্ধের কথা বলে।

ধ্যান ধারণায় আধুনিক দেখায় বা বলে। আর কাজে নারীভোগী। টাকা পয়সার ধান্দায় জীবন কাটিয়ে কেউ বাম কেউ বা ডান। এদের আমরা হাড়ে হাড়ে চিনলেও কেন জানি এড়াতে পারিনা। আসিফ নজরুলের কথাই ধরুন জীবনভর আওয়ামী লীগের মাথা খাবার ধান্দা আর মুখে বড় বড় কথা। দেশ ও দেশের মানুষের কল্যাণে তিনি কী কী ত্যাগ করেছেন বিবাহিতা স্ত্রীদের ছাড়া? এ হিসাব কেউ করেনা। এমন বুদ্ধিজীবীরাই আজ শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে। এদের কথা শুনলে দেশ কোনদিন ও এগোতে পারবেনা।

সরকারী দলের সাথে সুশীলদের মতবিরোধের খবর  প্রায়ই চোখে পড়ে। দেশে  দেখলাম সুশিলদের একাংশ নীরব। যারা নীরব তারাই আওয়ামী লীগের বুদ্ধিজীবী। এদের নীরবতার কারণ দুটো। এক, যাঁরা বলতে চান বা বলার ব্যাপারে আগ্রহী তাঁরা সম্মুখসারিতে নাই। বাকীরা সরকারের নামে কামানোর কাজে ব্যস্ত। অন্যদিকে এইসুযোগে আর এক  অংশ যারা এখন জনপ্রিয় কিংবা আলোচিত তারাই সরব।

বলা হয় তারা মন খুলে কথা বলতে পারেননা। পারলে তাদের  উধাও হয়ে যেতে হয়। যখন ফিরে আসেন তখন নাকি আর কথা বলেননা। হতে পারে। তবে প্রশ্ন আছে। যখন তারা মুখ খোলেন তখনি তারা আসলে সামান্য শিষ্টাচারও মানেন? জানিনা কি কারণে আমাদের দেশে এখন কথার জয়জয়াকার।  এখন সবাই বলে। শোনার মানুষের সংখ্যা দিনদিন কমছে। আর এই চান্সে তারা সরকার বিরোধিতা আর রাষ্ট্র বিরোধিতা গুলিয়ে মহাআনন্দে রাজাকারী চেতনা ফেরি করেন। আপনি যদি ভালো করে হিসেব মিলিয়ে দেখেন রুটিন মাফিক কথা বলা ছাড়া এদের কোনও ভূমিকা নাই। শেখ হাসিনা যে বলেন তাঁর কাজই তাঁর দুশমন কথাটা আসলেই সত্য। এরা কাজের আলো নিতে নাপারা প্যাঁচার মত। রাত হলে বেরিয়ে আসে আর অশুভ ডাক দিয়ে সমাজকে আতঙ্কিত করে তোলে।

যেটা চোখে লাগে যিনি বা যারাই বলতে আসেন মনে হয় তেতে আছেন। রাতদুপুরে বা মধ্যরাতের কিছু আগে এই আয়োজনগুলোর ভেতর তৃতীয় মাত্রা বা এজাতীয় কয়েকটি অনুষ্ঠান বাদে বাকীগুলোতে দেখি প্রায় ই ঝগড়া ঝাটি লেগে আছে। থাকলেও আপত্তি ছিলো না। কিন্তু একটা বিষয় ভুলে গেলে চলবে না দর্শকদের ভেতর রুগ্ন নরম হার্টের মানুষ ও আছেন। যারা মাঝরাতে এই হৈ চৈ নিলে গুরুতর শারিরীক সমস্যার কবলে পড়তে পারেন। সেসব ভুলে বাকযুদ্ধে লিপ্ত সুশীলেরা আসলে কী বলেন বা কী বলতে চান বহুলভাবে সেটাই ধোঁয়াসা।

এই  কথা বলার রেওয়াজ এখন রাজনৈতিক নেতাদের বেলায় লাগাম ছাড়িয়ে গেছে। সরকারী দলের নেতারা যখন যা খুশি বলেন । একেবারে টপ লেভেলের মানুষ যখন লাগাম রেখে  কথা বলেননা তখন বাকীরাও কাছকাছি যাবেন বৈকি। যে কথা বলছিলাম বিশেষ করে আওয়ামী লীগ সরকারে গেলেই বুদ্ধিজীবী বা সুশীলদের ভেতর একধরণের প্রতিক্রিয়া তৈরী হয়। বিশেষত একদা চীনা পন্থী বাম বা আওয়ামী বিরোধী সবশক্তি চাঙ্গা হয়ে ওঠে। এদের বদ্ধমূল ধারণা দেশ বিক্রি হয়ে যাচ্ছে। কে কার কাছে কতবার বেঁচলো তার হিসেব নিলে এরা আর মুখ দেখাতে পারবেননা। তবু এই ভাঙ্গা রেকর্ড বাজছেই।

বাস্তবে বুদ্ধিজীবীরাও বিভ্রান্ত। তাদের বাড়িতে বাড়িতে হিন্দি সিনেমা আর সিরিয়ালের  ছড়াছড়ি। ঘরে চলছে জি বাংলার জয়জয়কার। দোষ কী মানুষের? বিনোদন বাক্স যদি সারা দিনরাত খালি কথার ফাইটিং আর নেতাদের মুখ দেখাতে থাকে তারা যাবে কোথায়? বিশেষ দূরে যাবার দরকার নাই মানুষকে সারেগামাপা আর সৌরভ গাঙ্গুলির দাদাগিরির কথা বললেই বুঝবেন তারা কী চায়? সেদিকটা মাটি চাপা দিয়ে রাতদিন ওবায়দুল কাদের রিজভী বা মীর্জা ফখরুল কিংবা এরশাদ সাহেবকে দেখালে মানুষ কাঁহাতক নেবে এসব?

বাংলাদেশের রাজনিতিতে সুশীলরা একসময় সমালোচনা আর আলোচনায় পজিটিভ ভুমিকা রাখতেন। এখন তাদের টার্গেট কেবলই শেখ হাসিনা। কৃপা পাবার জন্য বা নাপাবার জন্য তার সমালোচনা আর নিন্দা এখন আর মানুষ খায়না। কারণ মানুষ মতিঝিল থেকে সরকারের দাপট সবদেখে এটা বুঝে গেছে। তার জীবনে শীলদের দরকার থাকলেও সুশীলের দরকার অতটা নাই। যদি এদেশে আহমদ ছফা কিংবা সরদার ফজলুল করিমের মত মানুষেরা উঠে আসেন যারা কারো মুখের দিকে তাকিয়ে বলেন না বা লেখেন না তবেই হয়তো মানুষ আবার শ্রদ্ধাশীল হয়ে উঠবে।

সুশীলেরা ভালোই বুঝেছেন দিনের আলোয় সরকার বিরোধিতা করে চোখে পড়লে রাতে আরামে থাকা যায়। সংস্কৃতি ধ্বংসের শেষ পেরেকটি ঠুকতে আমলাতন্ত্র ও সিন্ডিকেটের সাথে রাজনীতি চলছে সমান তালে। আর সে কফিনে হাতুড়ি মারছে সুশীলেরা। দেশে রাজনীতি মোকাবেলা করার জন্য রাজনীতি নাই। দল নাই। এমনকি সংস্কৃতিও এখন আধমরা। সুশীলেরা সেদিকে মনোযোগ দিলেই ভালো করবেন।  এই যে সেতু নিয়ে বড়বড় বাকযুদ্ধ এইযে অসম উন্নয়নে এখন তেলও আমদানী করতে হবে এনিয়ে সত্য বা সাহসের সাথে কথা বলার কেউ আছেন আসলে? কেউ ফেলানীর কথা বলবেনা। কেউ সেতুর আসল গুণ বা দোষ নিয়ে বলবেনা। ভারত বিরোধিতা মুখে পাসপোর্ট বা ভিসা অফিসে গিয়ে আগে নিজের ভিসাটা নিয়ে আসবেন জনাব সুশীলেরা। পাগলের মত বলবে, সেতুতে না উঠতে। তেলের সংকটের জন্য আসলে দেশের তেলখাত দায়ী? একটুও না। এত তেল দিনে রাতে দিতে থাকলে বা  খরচ করলে সঙ্কট তো হবেই।

সবাই জানেন বোঝেন কিন্তু মেনে নিতে বাধ্য হন। এই আমাদের সমাজ। আওয়ামী লীগের দুর্ভাগ্য দেশে দেশের বাইরে অজস্র সুশীল মেধাবী ও পরিণত মানুষের সমর্থন থাকার পর ও তাকে স্তাবকেরা ঘিরে থাকে। বিএনপির সৌভাগ্য ঘটে বিদ্যা বুদ্ধি না থাকার পরও ম্যাডামের জন্য জান দিতে রাজী কথিত সুশীলের দল। সেটা আমরা সর্বাধিক প্রচারিত দৈনিকের সম্পাদককে দেখলেই বুঝি। একদা বাম কিভাবে ডিগবাজী খেয়ে সং এ পরিণত হতে পারেন। শেখ হাসিনা তেল ও পানির তফাৎ বোঝেন । তাই তাঁর কাছে ভিড়তে না পারার বেদনাও অনেককে বিদ্রোহ করে তোলে বৈকি। একবার ভেবে দেখতে বলি, এই ভদ্রমহিলা- বঙ্গবন্ধু কন্যা না থাকলে, কোথায় কথা বলবেন? কোন সেতু নিয়ে বাকযুদ্ধ করবেন? খালি খাম্বায় কি লড়াই জমে? অথচ সেই খাম্বাবাজের জন্য দুর্নীতির বরপুত্রের জন্য সুশীলদের যত মায়াকান্না।

যারা চায় বাংলাদেশ এগিয়ে যাক, যারা চায় এদেশ ও সমাজ মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বড় হোক, যারা চায় দেশ ও জাতি উন্নতির পথে থাক, তারা সুশীলদের কথায় কান না দিলেই ভালো করবেন। নারায়ণগঞ্জের মারামারি আইভি বনাম ওসমান বা আর্থিক খাতের ব্যাপারে যে অসন্তোষ কিংবা যশোর রোডের গাছ কাটা নিয়ে যে বিতর্ক সে নিয়ে গঠনমূলক কথা হোক। সরকারকে সাবধান করা হোক। সামনের নির্বাচনে পজেটিভ ভূমিকা রাখুক তাঁরা। সেগুলো না করে সবকিছুর দায় আওয়ামী লীগ তথা শেখ হাসিনার ওপর চাপিয়ে দেয়া সুশীলদের কথা না শুনেই এতটা এগিয়েছে সরকার ও দেশ। একথা ভুলে গেলে চলবেনা।

বাক স্বাধীনতা আর বাকযুদ্ধ, বাক মুক্ততা আর বাক সংযমের পার্থক্য বুঝেই তার সীমানা নির্ধারণ করা উচিৎ। সভ্য সমাজে সেটাই দেখি আমরা। আমাদের সুশীলেরা এত বাকপটু তাঁরা সকাল তো সকাল রাত দুপুরেও থামেননা। ফলে সংযম আর সীমানা পেরিয়ে মহাআনন্দে চলছে সুশীল ইজম। একমাত্র শেখ হাসিনাই তাদের পরোয়া করেন না দেখলাম। বঙ্গবন্ধুর কন্যা তো।