যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের পদ ছাড়লেও ‘হিস্যা ছাড়ছেন না’ এক কর্মকর্তা

বিল্লাল হোসেন>
বহু বিতর্কের পর যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতাল ছেড়ে যাওয়া এক কর্মকতার হিস্যা নেয়া বন্ধ হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। মাস শেষ হলেই সরকারি এ হাসপাতালের বিভিন্ন বিভাগ থেকে তার কাছে পৌঁছে দেয়া হচ্ছে মোটা অংকের টাকা। তার হিস্যার টাকা পরিশোধ করতে গিয়ে ওইসব বিভাগে দায়িত্বরতরাও আর্থিক অনিয়মে জড়িয়ে পড়ছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে , চাকরি জীবনে এই কর্মকর্তার অনিয়ম ও দুর্নীতির শেষ নেই। যে কর্মস্থলেই তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন সেখানেই বিতর্কিত হিসেবে তিনি পরিচিতি পেয়েছেন। ১৯৯৫-৯৮ অর্থবছরে যশোর জেলা সিভিল সার্জন অফিসের মেডিকেল অফিসার থাকাকালীন দরপত্রে জালিয়াতির কারনে ৭ বছরের জন্য বহিষ্কারও হয়েছিলেন। ওই সময় তাকে ১০ লাখ ২৮ হাজার ৫শ’ ৩ টাকা ১৫ পয়সা জরিমানাও করেছিলেন ৮ম ও ৯ম জাতীয় সংসদে সরকারি হিসাব সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি (পিএ কমিটি)। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রনালয় এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে একজন দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিতি পাওয়ায় তিনি গ্রহণযোগ্যতাও (ডিডিও শিপ) হারিয়েছিলেন। পরে চার দলীয় জোটের আমলে শার্শার এক প্রভাবশালী নেতাকে মোটা অংকের টাকায় ম্যানেজ করে তিনি চাকরি ফিরে পান।। ওই সময় জরিমানার টাকা আদায় করার জন্য গত ২০১২ সালের ৯ জুলাই স্বাস্থ্য মন্ত্রনালয়ের উপসচিব শাহনাজ সামাদ স্বাক্ষরিত একটি পরিপত্র স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, যশোর জেলা প্রশাসক, সিভিল সার্জনসহ বিভিন্ন দপ্তরে পাঠানো হয়। কিন্তু জরিমানার টাকা এখনো পরিশোধ করেননি তিনি। অথচ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ অজ্ঞাত কারনে তার বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি।। সূত্রে জানা গেছে, সিভিল সার্জন অফিসের মেডিকেল অফিসার থেকে বদলি হয়ে ওই কর্মকর্তা যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে রেডিওলজিস্ট হিসেবে যোগদান করেন। পর আবাসিক মেডিকেল অফিসারের (আরএমও) দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ফলে পদাধিকার বলে তিনি দরপত্র কমিটির সদস্য সচিব হিসেবে থাকার নিয়ম। কিন্তু তাকে দরপত্র কমিটিতে না
রাখার জন্য ২০১২ সালের ৫ জুন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের পক্ষে পরিচালক (প্রশাসন) ডা.মতি উদ্দিন আহমেদ স্বাক্ষরিত একটি আদেশপত্র পাঠানো তৎকালিন তত্ত্বাবধায়ক ডাঃ সালাউদ্দিন আহমেদের কাছে। আর্থিক দুর্নীতির বিষয়টি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখে দরপত্র কার্যক্রমে তাকে সংশ্লিষ্টতার জন্য তিনি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে আবেদন করলেও তাকে সুযোগ দেয়া হয়নি। যে কারনে তিনি তৎকালিন তত্ত্বাবধায়ক ডাঃ সালাউদ্দিন আহমেদ ও ডাঃ ইয়াকুব আলী মোল্লার সময় কোন দরপত্র কমিটিতে থাকতে পারেননি। পরবর্তীতে তিনি যশোর সদর উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকতার দায়িত্ব পেলেও দুর্নীতিবাজ হিসেবে চিহ্নিত হওয়ায় পদাধিকার হিসেবে তখনও সিভিল সার্জন অফিসের কোন দরপত্র কমিটির সদস্য সচিব হিসেবে থাকতে পারেননি। পরে তিনি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সহকারি পরিচালক হিসেবে পদোন্নতি পান। এ পদে তাকে সংযুক্তি দেয়া হয় যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে। এদিকে ডাঃ শ্যামল কৃষ্ণ সাহা অবসরে যাওয়ার পর ২০১৭ সালের ১৮ মাচ ওই কর্মকর্তা যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে যোগদান করেন।
১৩ এপ্রিল তার তত্ত্বাবধায়কের সংযুক্তি আদেশ বাতিল করে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রনালয়। যার স্মারক নম্বর ৪৫.১৪৩.০১৯.০৩.০০.০০১.২০১৬-২৩১। স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ পার-২ অধিশাখার যুগ্নসচিব একেএম ফজলুল হক স্বাক্ষরিত আদেশপত্রে তাকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের উপপরিচালক (ওএসডি) হিসেবে যোগদান করতে বলা হয়। বিগত দিনের আর্থিক দুর্নীতির তথ্য গোপন করে হাসপাতালের সংযুক্তি তত্ত্বাধায়কের পদ বাগিয়ে নেয়ার তথ্য ফাঁস হয়ে যাওয়ায় তার বিরুদ্ধে এ ব্যবস্থা গ্রহন করা হয় বলে একটি সুত্র জানায়। কিন্তু তিনি তত্ত্বাধায়কের পদ ছেড়ে যেতে নারাজ ছিলেন। স্বাস্থ্য মন্ত্রনালয়ের আদেশ না মেনে তিনি অবৈধভাবে ৮ মাস তত্ত্বাবধায়কের পদ দখলে রেখেছিলেন। তার তত্ত্বাবধায়ক পদের কোন বৈধতা না থাকায় তার স্বাক্ষরে যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের ইন্টার্ণ চিকিৎসক ও কর্মচারিদের বেতন ভাতা দিতে নারাজ যশোর জেলা হিসাব রক্ষণ কর্মকর্তা জাকির হোসেন। দুমাস তাদের বেতনভাতা বন্ধ ছিলো। ৩০ জানুয়রি তিনি তত্ত্বাবধায়কের পদ ছেড়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের উপপরিচালক পদে ফিরে যান। এসময় ভারপ্রাপ্ত তত্ত্বাবধায়কের দায়িত্ব দিয়ে যান সার্জারি বিভাগের সিনিয়র কন্সালটেন্ট ডা. আব্দুর রহিম মোড়লকে। অভিযোগ উঠেছে, ওই কর্মকর্তা হাসপাতাল ছেড়ে গেলেও বিভিন্ন বিভাগ থেকে তার হিংসা নেয়া বন্ধ হয়নি। হাসপাতালে আর্থিক লেনদেনের অধিকাংশ বিভাগের দায়িত্বে রয়েছে বিতর্কিত ওই কর্মকর্তার পছন্দের লোক। তারাই সরকারের অর্থ লোপাট করে একটি অংশ তার কাছে পৌঁছে দেন মাস শেষে। এতে রাজস্ব কমে যাচ্ছে । অভিযোগ উঠেছে, তিনি হাসপাতালে রেডিওলজিস্টের পাশাপাশি আরএমও দায়িত্বে থাকায় নিজেই পরিচালনা করতেন হাসপাতালের আল্ট্রাসনো ও প্যাথলজি বিভাগ। যে কারনে হিসাবে নয় ছয় করে অর্থ হাতানোর সব পথ তার চেনা। তাই তিনি হাসপাতালে থাকুক আর না থাকুক তাকে হিস্যা দিতেই হবে। ফলে কোন মাস বন্ধ থাকেনি ওই কর্মকর্তার হিস্যার টাকা নেয়া।