লাশের অপেক্ষায়

নিজস্ব প্রতিবেদক>ধারণা করা হয়েছিল আজ লাশ আসবে। এখন শোনা যাচ্ছে দেরি হবে। কেউ বলছেন, তিন-চার দিন লাগবে। কেউ বলছেন, সাত দিন লেগে যেতে পারে। আর এতে নিহতদের লাশ ফিরে পেতে উদ্বেগের মধ্যে রয়েছেন স্বজনরা। এদিকে বিমান দুর্ঘটনার তিন দিন পর বৃহস্পতিবার একদিনের রাষ্ট্রীয় শোকদিবস ঘোষণা করেছে সরকার।

গত সোমবার দুপুরে নেপালের ত্রিভুবন বিমানবন্দরে ইউএস-বাংলার বিমান বিধ্বস্ত হয়ে নিহত হন ২৬ বাংলাদেশিসহ ৫১ জন। আহত ২০ জন চিকিৎসাধীন রয়েছেন দেশটির বিভিন্ন হাসপাতালে।

নেপালে ইউএস-বাংলার একটি বিমান বিধ্বস্তের ঘটনায় নিহত বাংলাদেশিদের কবে দেশে ফিরিয়ে আনা হবে, সেই সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় আছেন স্বজনরা। লাশ হস্তান্তর নিয়ে দীর্ঘসূত্রতার আশঙ্কা করছেন তারা। দ্রæত সময়ের মধ্যে লাশগুলো শনাক্ত করে হস্তান্তরের দাবি উঠেছে তাদের পক্ষ থেকে। হস্তান্তর প্রক্রিয়া প্রসঙ্গে নেপালে ত্রিভুবন বিমানবন্দরে গতকাল বুধবার বিমানমন্ত্রী এ কে এম শাহজাহান কামাল বলেছেন, ‘ময়নাতদন্ত ও ডিএনএ টেস্ট করে লাশ শনাক্তের পর স্বজনদের কাছে হস্তান্তর প্রক্রিয়া শুরু হবে।’

ঠিক কতদিন সময় লাগবে, এমন প্রশ্নে নেপালে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মাশফি বিনতে শামস বুধবার সাংবাদিকদের বলেন, ‘বিধ্বস্তের ঘটনায় যাদের শনাক্ত করা গেছে, তাদের লাশ ফেরত দিতে কমপক্ষে চার দিন সময় লাগবে। এর মধ্যে ময়নাতদন্ত শেষ করতে প্রয়োজন তিন দিন। আর একদিন যাবে লাশ শনাক্ত করতে।’

নেপালের ত্রিভুবন ইউনিভার্সিটি টিচিং হাসপাতালে গত ১২ মার্চ থেকে নিহতদের ময়নাতদন্ত শুরু হয়েছে। নেপালে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মাশফি বিনতে শামসের ভাষ্য- ‘ময়নাতদন্ত ও লাশ শনাক্তকরণে আরও চার দিন লাগবে। এরপর শুরু হবে হস্তান্তর প্রক্রিয়া।’

স্বজনদের আশঙ্কা, হস্তান্তর প্রক্রিয়া শুরু হতে আরও অন্তত পাঁচ দিন থেকে এক সপ্তাহ চলে যাবে। লাশ ফেরত আনার জন্য প্রায় এক সপ্তাহ সময় অপেক্ষা করা খুবই কষ্টকর বলে উল্লেখ করেছেন তারা। দ্রুত সময়ের মধ্যে লাশ হস্তান্তর করার দাবি জানিয়েছেন নিহত ক্রু খাজা শফির বোন বাসিমাহ সাইফুল্লাহ। তার কথায়- ‘স্বজনদের আনাই হয়েছে লাশ শনাক্তকরণের জন্য। কিন্তু এখানে (হাসপাতাল) আমাদের একটি ফরম ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে। আমরা এখনও কোনো লাশ দেখতে পারিনি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের একই কথায় সবার ফরেনসিক টেস্ট শেষ হলে দেখতে দেওয়া হবে।’

বাংলাদেশি নিহতদের স্বজনদের পাশাপাশি লাশ হস্তান্তর প্রক্রিয়া দ্রুত করতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হস্তক্ষেপ চেয়েছেন ইউএস-বাংলা কর্তৃপক্ষ। বুধবার প্রেস ব্রিফিংয়ে এ কথা উল্লেখ করেন ইউএস-বাংলার জনসংযোগ বিভাগের মহাব্যবস্থাপক কামরুল ইসলাম। তার ভাষ্য- ‘নেপালের সঙ্গে আমাদের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। আমাদের বিমানমন্ত্রী সেখানে (নেপাল) আছেন। আমরা আশা করছি, এ দীর্ঘ প্রক্রিয়া দদ্রুত সম্পন্ন করতে নেপালের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলবেন আমাদের প্রধানমন্ত্রী। এ বিষয়ে আমরা তার হস্তক্ষেপ কামনা করছি।’

ইউএস-বাংলার জনসংযোগ বিভাগের মহাব্যবস্থাপক আরও বলেন, ‘মঙ্গলবার থেকে নেপালে লাশগুলোর ময়নাতদন্তের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বলে আমরা জানতে পেরেছি। তবে লাশ শনাক্তে কিছুটা জটিলতা দেখা দিতে পারে। কারণ বেশিরভাগ লাশই আগুনে পুড়ে গেছে। তাই শনাক্তকরণ প্রক্রিয়া অনেক দীর্ঘ হতে পারে। এখানে বলে রাখা প্রয়োজন, হাসপাতালে ১৫ পাতার একটি ফরম পূরণ করতে হয়। সেটি দেখে লাশ শনাক্ত করা না গেলে ডিএনএ টেস্ট প্রয়োজন হবে। সেক্ষেত্রে নিহত ব্যক্তির স্বজনের সেখানে উপস্থিত থাকা জরুরি। তা না হলে ডিএনএ টেস্টও সম্ভব হবে না। ফলে লাশ হস্তান্তরে দীর্ঘসূত্রতার আশঙ্কা থাকছে।’

নিহতদের লাশ হস্তান্তরের বিষয়ে বিমানমন্ত্রীর ভাষ্য- ‘নাম-পরিচয় দিয়ে স্বজনরা আমাদের দূতাবাসের মাধ্যমে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে একটি ফরম পূরণ করে দেবেন। আমরা রাষ্ট্রদূতকে দায়িত্ব দিয়েছি। তিনি এ ব্যাপারে তৎপর থাকবেন। যে লাশ আগে শনাক্ত হয়ে যাবে কিংবা যার চেহারা বোঝা যাবে, আমাদের রাষ্ট্রদূত সেই বিষয়ে পদক্ষেপ নেবেন। লাশ হস্তান্তরের প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত থাকবে আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। ডিএনএ টেস্ট প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও চিকিৎসকদের নেপালে পাঠাবেন।’
নেপালের ত্রিভুবন বিমানবন্দরে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স বিধ্বস্ত হওয়ার পর থেকেই চলছে স্বজনদের মাতম। হতাহতদের স্বজনদের নিয়ে গত মঙ্গলবার সকালে এয়ারলাইন্সটির একটি বিশেষ ফ্লাইট যায় নেপাল। কিন্তু সেই ফ্লাইটে যাওয়া হয়নি দুর্ঘটনায় নিহত পিয়াসের পাসপোর্টবিহীন বাবা-মার। যে ছেলে কদিন পরেই হতেন চিকিৎসক, এখন তার মরদেহ কীভাবে আসবে, কখন আসবে, তা নিয়ে উদ্বেগ কাটছে না তাদের। পিয়াস রায়ের বাবা সুখেন্দু বিকাশ রায় বলেন, সায়রা খাতুন মেডিকেল কলেজে সে পড়ত। পরীক্ষা শেষে সে ওখানে নেপাল ঘোরার জন্য গেছে। নেপালের উদ্দেশে প্লেনে ওঠার আগে ফেসবুকে পোস্টও দিয়েছিল বলে জানান তিনি।

মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় নিহত অবসরপ্রাপ্ত যুগ্ম সচিব হাসান ইমাম সরকার ও শিক্ষিকা বিলকিস বানু দম্পতির নিকটাত্মীয়রাও উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা নিয়ে ছুটে এসেছেন ইউএস-বাংলা অফিসে, অন্তত দ্রুত যেন নিয়ে আসা হয় তাদের স্বজনদের মরদেহ।

এদিকে বিমান দুর্ঘটনায় আহতদের চিকিৎসা দিতে নেপাল যাচ্ছে বাংলাদেশের চিকিৎসকদের একটি দল। এজন্য আজ বৃহস্পতিবার ঢাকা ছাড়বে সাত চিকিৎসকের প্রতিনিধি দলটি। গতকাল বুধবার বিকালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটের সমন্বয়কারী ডা. সামন্ত লাল সেন এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

সামন্ত লাল সেন বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে এ সাত সদস্যের চিকিৎসকদলকে নেপালে পাঠানো হচ্ছে। আগামীকাল (আজ) বেলা ১১টায় নেপালের উদ্দেশে বাংলাদেশ ছাড়বেন তারা। চিকিৎসকদের দলে রয়েছেন ঢামেক বার্ন ইউনিটের তিনজন, জেনারেল ওয়ার্ডের নিবিড় পরিচর্যা ইউনিটের (আইসিইউ) দুজন বিশেষজ্ঞ এবং জাতীয় অর্থোপেডিক্স হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানের (পঙ্গু হাসপাতাল) দুজন চিকিৎসক।

ইউএস-বাংলার জনসংযোগ বিভাগের মহাব্যবস্থাপক কামরুল ইসলাম গতকাল সাংবাদিকদের আরেকটি তথ্য জানান। তিনি বলেন, ঢাকা-কাঠমান্ডু-ঢাকা রুটে আমাদের ফ্লাইট পরিচালনা অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ রয়েছে। তবে কাঠমান্ডু ফ্লাইট আপাতত বন্ধ রাখলেও অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক রুটগুলোয় ইউএস-বাংলার ফ্লাইটগুলো স্বাভাবিকভাবেই চলছে বলে জানান এ কর্মকর্তা।

রাষ্ট্রীয় শোক
নেপালের কাঠমান্ডুতে বিমান বিধ্বস্তে হতাহতের ঘটনায় বৃহস্পতিবার সারা দেশে একদিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করা হয়েছে। এছাড়া শুক্রবার মসজিদ-মন্দিরসহ সব ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এবং উপাসনালয়ে দোয়া ও প্রার্থনা করা হবে। প্রধানমন্ত্রীর উপপ্রেস সচিব আশরাফুল আলম খোকন গণমাধ্যমকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, বৃহস্পতিবার সারা দেশে একদিনের শোক ঘোষণা করা হয়েছে। এছাড়া শুক্রবার মসজিদ, মন্দির, গির্জা, প্যাগোডাসহ সব ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এবং উপাসনালয়ে দোয়া ও প্রার্থনার কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে। দুর্ঘটনার পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার সিঙ্গাপুর সফর সংক্ষিপ্ত করে একদিন আগেই মঙ্গলবার দেশে ফিরে আসেন। এরপর সংশ্লিষ্টদের নিয়ে বুধবার সকালে তিনি নিজের কার্যালয়ে জরুরি বৈঠকে বসেন।

সংস্কার করা হবে ঝুঁকিপূর্ণ ত্রিভুবন বিমানবন্দর
পাহাড়ঘেরা নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন বিমানবন্দরটি কাঠমান্ডু উপত্যকায় এবং শহরের কেন্দ্র থেকে প্রায় ছয় কিলোমিটার দূরে। একের পর এক বিমান দুর্ঘটনার কারণে এ বিমানবন্দরটির নিরাপত্তা নিয়ে প্রায়ই আলোচনা হয়।

বিশ্লেষকরা বলছেন, নেপালে বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হওয়ার অভিযোগে বিভিন্ন সময়ে তাদের সমালোচনা হয়েছে। নেপালের সিভিল অ্যাভিয়েশন কর্তৃপক্ষ এখন বলছে ছয় বছর আগে ন্যাশনাল প্রাইড নামে যে প্রকল্পের আওতায় বিমানবন্দরের পরিসর বাড়ানোর কাজ শুরু হয়েছিল, সেটা দায়িত্বপ্রাপ্ত কোম্পানির অবহেলার কারণে সম্পূর্ণ হয়নি।

স্প্যানিশ একটি কোম্পানি সানহাআস কন্সট্রাক্টরের সঙ্গে তিন মাস আগেই চুক্তি বাতিল করে নেপালের সরকার। ওই কোম্পানি ছয় বছরে মাত্র ২০ শতাংশ কাজ সম্পন্ন করতে পেরেছে। কিন্তু এসব তথ্য এতদিন প্রকাশ্যে আসেনি। এখন দেশটির বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ বলছে বন্দরের চারটি অংশে তারা সংস্কারের কাজ করবে এবং ভিন্ন একটা কোম্পানির সঙ্গে কাজ শুরু করে দিয়েছে তারা।

অ্যাভিয়েশন অথরিটির মহাপরিচালক সানজিভ গৌতম বিবিসিকে বলেছেন, চীনা একটা কোম্পানি তিন মিটার দৈর্ঘ্য ট্যানেল, টার্মিনাল ভবন, টার্মিনাল ভবনের অবকাঠামো নির্মাণের কাজ করছে। ২০১২ সালে ত্রিভুবন বিমানবন্দরের পরিসর বাড়ানোর জন্য যে প্রকল্প নেওয়া হয়, সেটাতে এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক ৬ বিলিয়ন রুপি সহায়তা করেছে। মূল পরিকল্পনায় এয়ারক্রাফট পার্কিংয়ের জন্য আরও ১৩টা স্থান বাড়ানোর প্রস্তাব রয়েছে।

বিমানবন্দরটিতে প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিক কোনো বিমান অবতরণের পর থেকে এ পর্যন্ত ৭০টিরও বেশি দুর্ঘটনা ঘটেছে। বলা হচ্ছে, এসব দুর্ঘটনায় ৬৫০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। বিমানের পাশাপাশি সেখানে হেলিকপ্টারও বিধ্বস্ত হয়েছে। আর সর্বশেষ দুর্ঘটনার শিকার হলো ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের বিমানটি।