স্বাগত ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

ওই নূতনের কেতন ওড়ে কালবোশেখি ঝড়, তোরা সব জয়ধ্বনি কর-কবির এ বাণী হদয়ে ধারণ করে নতুন একটি বাংলা বর্ষ সমাগত। পুরনো বছরের জরা ও গ্লানি ঝেড়ে ফেলে এ দিনটিতে আমরা নতুনকে বরণ করব। স্বাগত জানাই ১৪২৫ বঙ্গাব্দকে। খাজনা আদায়ের সুবিধার্থে বাংলা নববর্ষ প্রবর্তন করেছিলেন মুঘল সম্রাট আকবর। তবে তা এখন আর খাজনা আদায়ের হিসাব-নিকাশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। ঋতু পরিক্রমায় বৈশাখকে বিবেচনা করা হয় শস্য রোপণের মাস হিসেবে। বৈশাখে খরতপ্ত মাঠ নবধারাজলে সিঞ্চিত হলে কৃষক হালকর্ষণ শুরু করেন, বীজ বোনেন, আশায় বুক বাঁধেন সোনালি ফসলের। বৈশাখে দোকানি সারাবছরের হিসাব-নিকাশ করতে হালখাতা খোলেন। বৈশাখ আসে বাঙালি জীবনে নতুন শস্যের আবাহন নিয়ে, আসে বাণিজ্যে বসতি লক্ষ্মীর বেশ ধরে। বাংলা নববর্ষকে সামনে রেখে একসময় গ্রামগঞ্জে মেলা বসত, ঘোড়দৌড় হতো, তরুণরা বিচিত্র পোশাকে সঙ সেজে গ্রামের নারী-পুরুষকে আনন্দ দিত। আজ গ্রামীণ জীবনের সেই সাংস্কৃতিক প্রাণপ্রবাহ হারিয়ে যেতে বসেছে। বাংলা নববর্ষের সব আয়োজন যেন সীমিত হয়ে পড়েছে শহরাঞ্চলে। অথচ গ্রামই হল বাংলাদেশের প্রাণ। সেই হারানো উৎসব-ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে হলে গ্রামীণ জীবনেও সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য নিশ্চিত করতে হবে। বাংলা নববর্ষ আমাদের অন্যতম প্রধান জাতীয় উৎসব। ধর্ম-বর্ণ-গোত্র নির্বিশেষে সবার প্রাণের উৎসব। আবহমান বাঙালি জীবনের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ বাংলা নববর্ষ। বাঙালি সংস্কৃতির অন্যতম স্মারক বাংলা নববর্ষের প্রতি পাকিস্তানি শাসকবর্গ বরাবরই ছিল বৈরী। তারা বাংলা নামের সঙ্গে যুক্ত কোন কিছুই সুনজরে দেখত না। প্রথমেই তাই আঘাত এসেছিল বাংলা ভাষার ওপর, এরপর কেড়ে নিতে উদ্যত হয় জনগণের সাংস্কৃতিক সত্ত্বাকে। সে সময়ে পাকিস্তানি শাসকদের চোখরাঙানি উপেক্ষা করে বাংলা নববর্ষ বরণ করতে বাঙালি জাতি আয়োজন করে ব্যাপক কর্মযজ্ঞের। ষাটের দশকে সাংস্কৃতিক সংগঠন ছায়ানট রমনা বটমূলে বর্ষবরণের যে অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিল, তা আজ ছড়িয়ে পড়েছে দেশব্যাপী। পাড়া-মহল্লায় নানা উৎসবের আয়োজন চলে এ দিনটিতে। বাঙালি সংস্কৃতিকে শক্তিশালী করার সরকারি-বেসরকারি ও গণউদ্যোগের বিপরীতে একটি চক্র বিশেষত মৌলবাদী জঙ্গি গোষ্ঠী এর বিরুদ্ধে নানা অপতৎপরতা চালিয়ে আসছে। ২০০১ সালে রমনা বটমূলে ছায়ানটের অনুষ্ঠানে তারাই বোমা হামলা চালিয়ে ১০ জন নিরীহ মানুষকে হত্যা করে। আহত ও পঙ্গু হন অনেকে। রাজধানীর বাইরেও তারা উপর্যুপরি হামলা চালায় যাত্রা প্যান্ডেল, সিনেমা হল ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, এতদিনেও রমনায় বোমা হামলা মামলার নিষ্পত্তি হয়নি। এখন জনগণের জন্য শান্তি, কল্যাণ ও উন্নয়ন নিশ্চিত করতে পারস্পরিক হিংসা-দ্বেষ পরিহার করে একযোগে কাজ করতে হবে। বাঙালির প্রীতি ও সৌহার্দ্যরে সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় হোক। আমাদের প্রাত্যহিক জীবনেও প্রবাহিত হোক এর সুস্থির ধারা। নতুন বছর সবার জন্য সুখ, শান্তি ও সমৃদ্ধি বয়ে আনুক। সবাইকে নববর্ষের শুভেচ্ছা।