শেষ অবধি কেন মৌলবাদীরা জিতছে?

গণজাগরণ মঞ্চের ছেলে মেয়েরা হারিয়ে যায়নি, তবে তারা বিচ্ছিন্ন, হতাশাগ্রস্থ এবং নানানভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। অন্যদিকে এই গণজাগরণের বিপরীতে জামায়াত- বিএনপি যে হেফাজতে ইসলামী গড়ে তোলে তারা এখনও শুধু সংঘবদ্ধ নয়, তাদের অনেক কিছু সমাজকে মেনে নিতে হচ্ছে। তাদের হুমকিতে নানান স্থানে পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠান সংকুচিত হয়েছে। তাদের প্রচারের কারণে, অনেকে বিশ্বাস করতে শুরু করেছে পহেলা বৈশাখ একটি বিশেষ ধর্মের অনুষ্ঠান, এটি আমাদের বাঙালির জাতীয় উৎসব নয়। সারা দেশে বিভিন্ন স্থানে ধর্মীয় অনুষ্ঠানের নামে এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে হেফাজত ও জামায়াতের লোকজন পহেলা বৈশাখের বিরুদ্ধে অবাধে অপপ্রচার চালিয়েছে এবার। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ারও যেমন শক্তি নেই সমাজের, তেমনি সমাজ থেকে তার কোন প্রতিরোধও আসেনি। এমনকি, মৌলবাদীদের এই অপপ্রচারের দাঁতভাঙ্গা জবাব যেটা ছিলো, সবাইকে রাস্তায় নেমে এসে পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠানে মানুষের ঢল নামানো- তাও নামেনি। তাই বলা যায়, এখানে একটু হলেও হেফাজত জিতে গেছে, জিতে গেছে জামায়াত- বিএনপি। ঠিক এমনিভাবে শিক্ষাসহ নানান ক্ষেত্রে হেফাজতের দাবী মেনে নিতে হচ্ছে। সর্বোপরি, দেশের মানুষের মনোজগতে ঢুকে যাচ্ছে, মুনতাসীর মামুনের ভাষায় একশ্রেনীর ‘হেজাবি’ ( হেফাজত- জামায়াত- বিএনপি) মানসিকতা। এখানেই মৌলবাদীদের সব থেকে বড় বিজয়। তারা মানুষের মনোজগতে ঢুকে যেতে পারছে। মানুষ বদলে যাচ্ছে। আর এই বদলে যাচ্ছে বলে, এই হেফাজতিরা হাজার হাজার মানুষের সামনে গার্মেন্টস কর্মী মেয়েদের নিয়ে জঘন্য সব বক্তব্য রাখছে দেশের নানান স্থানে; সেগুলো আবার জামায়াত- শিবির সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার করে যাচ্ছে। তারা অবাধেই এগুলো প্রচার করছে। যে গার্মেন্টস কর্মীদের নিরলস পরিশ্রম বা এক ধরনের আত্মত্যাগের ফলে আমাদের অর্থনীতির বড় অংশ দাঁড়িয়ে আছে, যাদের অর্থে মূলত পরোক্ষভাবে এই হেফাজতি, জামায়াতিরা আরাম আয়েস করছে, তাদের বিরুদ্ধে চালাচ্ছে জঘন্য অপপ্রচার। আর এগুলো ঠেকানোর জন্যে প্রগতিশীলদের সেভাবে কোন উপস্থিতি নেই, সংঘবদ্ধতা নেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ও বাস্তব মাঠে। অন্যদিকে অনেক সময় দেখা যায়, প্রগতিশীল রাজনীতিবিদদের আয়োজিত অনুষ্ঠানে ধর্মীয় লেবাস পরে এরা নারীরা যাতে সাবলম্বী হতে না পারে, তারা যাতে অর্থনীতিতে, সমাজে কোন অবদান রাখতে না পারে এই লক্ষ্যে নানান কথা বলছে। কলঙ্কিত করছে তাদের চরিত্রকে।
এখন থেকে যদি সমাজ সচেতন না হয়, রাজনীতিকরা সচেতন না হন, সর্বোপরি যদি প্রগতিশীল তরুণ সমাজ, যাদের হাতে আগামী দিনের রাষ্ট্রের ও সমাজের ভার তারা সচেতন না হয়- তাহলে ভবিষ্যতে এই দেশে আবার নারীরা গৃহবন্দী হবে। তারা তাদের স্বাধীন রোজগারের অধিকার, তাদের যোগ্যতার পরিচয় দেবার অধিকার হারাবে। গার্মেন্টেসের মেয়েদের বিরুদ্ধে ধর্মীয় লেবাসে যেভাবে অপপ্রচার চালাচ্ছে, এ যদি এখনই বন্ধ করা না হয়, তরুণ সমাজ যদি এদের প্রতিকার করতে না এগিয়ে আসে তাহলে অদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশের গার্মেন্টস শিল্প বিপর্যয়ের মুখে পড়বে। আর এই সকল  মৌলবাদীরা যে কারো না কারো এজেন্ট হিসেবে এই কাজ করছে তার প্রমাণ হলো- কখন তারা একটি বিশেষ সময়ে এ ধরনের প্রচার চালাচ্ছে? কারণ, এ মুহূর্তে চায়নায় শ্রমিকের মুজুরি অনেক বেড়ে গেছে, তারা গার্মেন্টস, জুতো, খেলনা প্রভৃতি শ্রমঘন (লেবার ডেনস) শিল্প চালাতে পারছে না। তাদের ইচ্ছে ছিলো মায়ানমার তাদের একটি বিকল্প স্থান হবে। বাস্তবে মায়ানমারের অবকাঠামো এখনো শিল্পের জন্যে সহায়ক নয়। এর বিপরীতে গত নয় বছরে শেখ হাসিনা বাংলাদেশে বিদ্যুত, রাস্তা, পোর্ট প্রভৃতি গড়ে তুলে দেশকে সত্যিকার অর্থে একটা শিল্পায়নের অবস্থানে নিয়ে এসেছেন। অন্যদিকে বাংলাদেশে আছে তরুণ কর্মশক্তি। তাই স্বাভাবিকভাবে চায়নাসহ ফার ইস্টের এবং সাউথ ইস্টের সকল দেশের শ্রমঘন শিল্প এখন বাংলাদেশে চলে আসবে। তারা ওই সকল স্থান থেকে তাদের কারখানা বাংলাদেশে শিফট করবে। তাই বাংলাদেশের অতি বড় নিন্দুকও বলবেন, বাংলাদেশে এখন এশিয়ায় বিনিয়োগের একটি হাব হতে চলেছে। কোন দেশ যখন বিনিয়োগের পীঠস্থান হয়ে ওঠে তখন ওই দেশে নারীরা প্রায় সমহারে কাজে বেরিয়ে আসে। এই মৌলবাদীরা মূলত বাংলাদেশের এই অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঠেকাতেই সংঘবদ্ধভাবে নারীদের পিছনে উঠে পড়ে লেগেছে। যাতে নারীরা ঘর থেকে বের হতে না পারে, যাতে দেশ প্রয়োজনীয় শ্রমশক্তি না পায়, দেশ যাতে উন্নত না হয়। তারা যে দেশের কোন উন্নয়ন চায় না তা তাদের একটি দল বিএনপি’র মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের একটি বক্তব্য থেকেই বোঝা যায়। বাংলাদেশ যে সময়ে নিজস্ব স্যাটেলাইট যুগে প্রবেশ করছে, মহাকাশে বাংলাদেশের স্যাটেলাইট সফল উৎক্ষেপন হয়েছে -তার পর পরই অর্থাৎ ১২ মে শনিবার প্রেসক্লাবের একটি আলোচনা সভায় মির্জা ফখরুল বলেন, “ এটা আগে ঘুরুক, আবর্তন করুক পৃথিবী, পরিক্রমা করুক, তখন দেখা যাবে।” একেবারে গ্রামীন সেই গল্পের মতো, চাকরি পেলে কী হয়, বেতন পাবে না। বেতন পেলেও সে টাকায় চলবে না। তবে কথা তাদের গ্রামীন ওই পরশ্রীকাতর ব্যক্তির মত হয়েছে ঠিকই কিন্তু বাস্তব উদ্দেশ্য দেশের উন্নয়ন ঠেকিয়ে রাখা। দেশের মানুষের নিশ্চয়ই মনে আছে বাংলাদেশের গার্মেন্টস রফতানির ওপর নিষেধাজ্ঞা দেবার জন্যে খালেদা জিয়া ওয়াশিংটন টাইমসে চিঠিপত্র কলামে নিজ নামে চিঠি লিখেছিলেন। তাই গার্মেন্টেসের মেয়েদের বিরুদ্ধে যে সব হেফাজতি, জামায়াতি তথাকথিত মৌলনারা অশ্লীল কথা বলছে, মির্জা ফখরুলের স্যাটেলাইট নিয়ে দেয়া বক্তব্য আর খালেদা জিয়ার সেদিনের ওয়াশিংটন টাইমসের চিঠি সবই একই সূত্রে গাঁথা। সব কিছুর মূল উদ্দেশ্য দেশের উন্নয়ন ঠেকিয়ে রাখা। আর দেশের উন্নয়ন ঠেকিয়ে রাখার একটি বড় পথ হলো নারীদেরকে গৃহবন্দী করা।

স্বল্প শিক্ষিতা বা স্বাক্ষর নন এমন নারীদেরকে যেমন জামায়াতি ও হেফাজতিদের দিয়ে বন্দী করার চেষ্টা চলছে; তেমনি, শিক্ষিত নারী সমাজ যাতে আর সরকারি চাকুরিতে আগের মত বেশি না যেতে পারে সে কাজ তারা করলো এবার কোটা বিরোধী আন্দোলনের মাধ্যমে। চিহ্নিত ছাত্র শিবিরের ছেলেদের নেতৃত্বে হওয়া এই কোটা বিরোধী আন্দোলনে মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের যতটা পারা যায় ততটাই তারা অপমান করেছে। পাশাপাশি মৌলবাদীদের যে মূল উদ্দেশ্য- নারীদের গৃহবন্দী করা, নারীরা যাতে সমাজের কোন ক্ষেত্রে নেতৃত্বে না আসে সেটা রোধ করার কাজটি তারা সফলভাবে করেছে। কেন কোটা বিরোধী আন্দোলনের দিনে কয়েকটি মেয়ে নারী কোটার বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলো তা সত্যিই বোধগম্য নয়। তবে এটুকু বোঝা যায়, তাদের নেত্রী খালেদা জিয়া যদি দেশের রফতানির ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়ার জন্যে লবিস্ট ধরে ওয়াশিংটন টাইমসে চিঠি ছাপানোর ব্যবস্থা করতে পারে তাহলে তার কর্মীরা নারী হয়েও নারী কোটার বিরুদ্ধে রাজপথে নামতে পারে। যাহোক, ওই আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রী সরকারি চাকরিতে সব ধরনের কোটা বাতিল করেছেন। এই সব ধরনের কোটা বাতিলের ফলে ১০% নারী কোটাও বাতিল হয়েছে। এই নারী কোটা বাতিলের কারণে এখন যে সরকারি চাকরিতে নারীদের অংশগ্রহণ কমে যাবে তাতে কোন সন্দেহ নেই। বাস্তবে সরকারি চাকরিতে নারী ও পুরুষের অনুপাত হওয়া উচিত ছিলো ৫০ঃ৫০। অর্থাৎ নারী পঞ্চাশ ভাগ পুরুষও পঞ্চাশভাগ;  এখন সেখানে দশভাগও নারী নেই। তারপরে এই নারী কোটা বাতিল হলে এর অনুপাত আরো কমে যাবে। সরকারি চাকরি থেকে এভাবে নারীদেরকে হটিয়ে দিতে পেরে মূলত জিতে গেল মৌলবাদীরা। কারণ, তারা সব সময়ই নারীদের চাকরি করার বিপক্ষে। তারা নানানভাবে নারীদের চাকরি থেকে বিরত রাখার চেষ্টা সব সময়ই করে আসছে। এবার সাধারণ ছাত্র সমাজকে চাকরির কথা বলে বিভ্রান্ত করে এই ছদ্মবেশি মৌলবাদীরা সরকারী চাকরি থেকে নারী কোটা বাতিল করাতে পেরে মূলত তাদের উদ্দেশ্য অর্থাৎ জামায়াত হেফাজতের উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করতে যাচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রী সকল প্রকার কোটা বাতিল করেছেন। তাই তিনি তার সিদ্ধান্ত বদল করবেন কিনা আমরা জানিনা। তবে দেশের প্রগতিশীল নারী সমাজ, তরুণ সমাজের এখন অবশ্যই নারী কোটার পক্ষে কথা বলতে হবে। প্রধানমন্ত্রী বরাবর যাতে তারা কথা বলতে পারেন, সেভাবেই তাদের নামতে হবে। কারণ, সরকারি চাকরি থেকে নারীদের ঘরে পাঠানোর এই প্রক্রিয়ায় যদি মৌলবাদীরা শেষ পর্যন্ত জিতে যায় -তাহলে তারা পরবর্তীতে নারীদেরকে আরো কঠোরভাবে বন্দী করার পথে নামবে। দেশটাকে তারা তালেবানী আফগানিস্তানের মতই একটি দেশ সৃষ্টির দিকে নিয়ে যাবে। কারণ, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এদের যে সব বক্তব্য শুনি তাতে মনে হয় না এরা কোন মায়ের পেট থেকে এসেছিলো, মনে হয় না এদের মা বোন আছে। নারী এদের কাছে কেবল ভোগ্যপণ্য মাত্র। তাই দেশের সচেতন নারী সমাজ, তরুণ সমাজ যদি এখনও বসে থাকে তাহলে অনেক বড় ক্ষতি হয়ে যাবে এই সমাজের ও সভ্যতার।