আবেগের চেয়ে আইন বড়

বিশ্বকাপ ফুটবল উন্মাদনা চারিদিকে উত্তাপ ছড়াচ্ছে। প্রতিদিন উষ্ণতা বাড়ছে পৃথিবীর। আগামী ১৪জুন ২০১৮ নাগাদ সেই উষ্ণতা ১০০ডিগ্রী সেলসিয়াসে পৌঁছালেও অবাক হওয়ার কিছু নেই! বিশ্বের শতকোটি মানুষ আজ ক্ষণ গণনা শুরু করেছে। দিন, ঘণ্টা, মিনিট, সেকেন্ড। রাশিয়া বিশ্বকাপ ফুটবল উপলক্ষ্যে চারিদিকে সাজসাজ রব। বাড়ির ছাদ থেকে শুরু করে লঞ্চের মাস্তুল। গাড়ি থেকে শুরু করে মুদির দোকান। সব জায়গায় বাহারি রঙয়ের পতাকা। বহুতল ভবনের চিলেকোঠায় এই আয়োজনটা একটু বাড়াবাড়ি রকমের। ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, জার্মানি অথবা ইটালি। কার পতাকা কত বড় হতে পারে সে আয়োজনে ব্যস্ত সবাই। কোন্ ভবনে কতপ্রকার বিদেশি পতাকা উত্তোলন করা যেতে পারে সেই প্রতিযোগিতাটা আজ সর্বতুঙ্গে। দেওয়ালে লেখা হচ্ছে প্রিয় দেশের নাম, আঁকা হচ্ছে সে দেশের জাতীয় পতাকা। বিষয়টা এতোটা হতাশার যে, কখনো কখনো অবনত মস্তক ছাড়া কোনো বিকল্প নেই।

একটি দেশ মানে একটি মানচিত্র। মানচিত্র মানে মানুষ। আর এই মানচিত্র ও মানুষের প্রতীকী উপস্থাপন পতাকা। একটি পতাকা সে দেশের সংস্কৃতি ও সভ্যতাকে ধারন ও বহন করে। প্রতিটি পতাকার একটি ইতিহাস আছে। একটা ঐতিহ্যের গল্প আছে। নানান অনুভূতির মিশ্রিত রূপের বহিঃপ্রকাশ একটি পতাকা। কোন পতাকাকে হাতে বহন করা মানে, সে দেশের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে সমর্থন জানানো। একটি পতাকা হাতে নিলেই স্মৃতিপটে জ্বলজ্বল করে সেই পতাকা অর্জনের ইতিবৃত্তি। মনে পড়ে সেই পতাকার নেপথ্য গল্প। কেউকেউ মন্তব্য করেন, কোনো পতাকাকে ভালোবাসা মানে সে দেশের ফুটবল কিংবা শুধু ক্রিকেটকে ভালোবাসা। কিন্তু এটা হতে পারে না। এটা হাস্যকর। এমন আত্মসাংঘর্ষিক মন্তব্য অবাঞ্ছনীয়। আজকের ফুটবলবিশ্বের অনেক সমর্থন কিছুটা অন্ধ। আমরা ভুলে যাই আমাদের কিছু সমর্থন স্বদেশপ্রীতিকে অবমাননা করে। আমাদের অজান্তে, উদাসীনতার কারণে অথবা সচেতনতার অভাবে অথবা বাড়াবাড়ি রকমের সমর্থন প্রক্রিয়ায় আমরা প্রতিনিয়ত হেয় করছি রক্তের দামে কেনা লাল-সবুজের পতাকাকে।

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের পতাকা বিধিমালা, ১৯৭২ (সংশোধিত ২০১০) অনুযায়ী আমাদের জাতীয় পতাকা উত্তোলনের নির্দিষ্ট কিছু নিয়মাবলী আছে। এবং একই সাথে বিদেশি পতাকা ব্যবহার করা যাবে কিনা সে বিষয়েও স্পষ্ট কিছু বিধান এই বিধিমালায় বিদ্যমান। কিন্তু ফুটবল ও ক্রিকেট প্রতিযোগিতাকে সামনে রেখে সবসময় আমাদের দেশে বিদেশি পতাকা নিয়ে মাত্রাতিরিক্ত বাড়াবাড়ি করা হয়। ফলে অপমানিত হয় স্বদেশি পতাকা, যার চূড়ান্ত প্রতিরূপ দেশের প্রতি অপমান। বাংলাদেশে বিদেশি পতাকার ব্যবহারের জন্য নির্দিষ্ট কিছু বিধান বিদ্যমান। প্রথমত, বাংলাদেশে অবস্থিত কূটনৈতিক মিশনসমূহের চ্যান্সারী ভবন এবং কনস্যুলার অফিসসমূহ বিদেশের ‘জাতীয় পতাকা’ উত্তোলন করতে পারবে। অধিকন্তু, কূটনৈতিক মিশনসমূহের প্রধানগণ তাঁহাদের সরকারি ভবন এবং মোটর গাড়িতে তাদের দেশের ‘জাতীয় পতাকা’ উত্তোলন করতে পারবেন। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় ভ্রমণকালীন সময়ে বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধান, ভ্রমণরত প্রধানমন্ত্রী, বিদেশি সরকারের মন্ত্রীবর্গ তাদের নিজস্ব পতাকা অথবা নিজস্ব পতাকা না থাকলে তাদের দেশের জাতীয় পতাকা তাদের অফিসিয়াল বাসভবনে এবং মোটর গাড়িতে উত্তোলন করতে পারবেন। সর্বশেষ, বাংলাদেশে অবস্থিত কূটনৈতিক মিশনসমূহ কোন উপল,ে যেমন-জাতীয় দিবসসমূহে কূটনৈতিক মিশন প্রধানের বাসভবন বা চ্যান্সারি ব্যতীত, যে স্থানে সামাজিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হবে, সে স্থানে তাদের জাতীয় পতাকা উত্তোলন করতে পারবে, তবে শর্ত থাকে যে, সেেেত্র বাংলাদেশের জাতীয় পতাকাও সম্মানজনক স্থানে পাশাপাশি উত্তোলন করতে হবে। এই বিধিমালায় স্পষ্ট বিধান, উপরিউক্ত বিধিসমূহের বর্ণনা ব্যতীত, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সুনির্দিষ্ট অনুমোদন ব্যতীত, বিদেশি রাষ্ট্রের পতাকা কোন গাড়িতে বা ভবনে উত্তোলন করা যাবে না।

কিন্তু ভাবতে অবাক লাগে, এই বিধিমালার প্রয়োগ কোথায়? চারপাশে তাকালেই এই বিধানের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন আমাদের নজরে আসে। কারণে-অকারণে, যথেচ্ছা আমরা ব্যবহার করছি বিদেশি পতাকা। বিশ্বকাপ ফুটবল খেলার সময় আমাদের ছাদে পতপত করে ওড়ে ৭১’এর শত্রু আমেরিকার পতাকাও। আর বিশ্বকাপ ক্রিকেটের সময় পাকিস্তান। কী লজ্জা! কোথায় রাখবো এ অপমান?

বাংলাদেশ সরাকারের সামনে দুটো পথ জাতীয় পতাকা বিধিমালা-১৯৭২ (সংশোধিত ২০১০) যথাযথভাবে প্রয়োগ হচ্ছে কিনা তা তদারকি করা। প্রয়োজনে শাস্তির বিধান যথাযথভাবে পরিপালন করা। অন্যথায়, বিশ্বকাপ ফুটবল অথবা ক্রিকেট উন্মাদনাকে উৎসাহিত করতে, খেলা চলাকালীন সময়ে বিদেশি পতাকা ব্যবহারের উপর বিধিনিষেধ শীথিল করা। কিন্তু কোন অবস্থাতেই আমরা আইন অমান্য করে, বিদেশি জাতীয় পতাকা আমাদের ভবনগুলোতে উড়তে দিতে পারি না। গণমাধ্যমে চোখ রাখলেই দেখা যায়, প্রতিনিয়ত আমাদের চারপাশে জাতীয় পতাকা বিধিমালা লঙ্ঘিত হচ্ছে। অনেকে জেনে জাতীয় পতাককে অসম্মান করছেন। আবার কেউকেউ না জেনেই জাতীয় পতাকাকে অসম্মান করছে। অন্যদিকে, জাতীয় পতাকা অবমাননার শাস্তি মাত্র ১০০০টাকা জরিমানা যার পরিমাণ অত্যন্ত অপ্রতুল। মজার ব্যাপার হলো, জাতীয় পতাকা বিধিমালা-১৯৭২ (সংশোধিত ২০১০) যথাযথভাবে পরিপালিত হচ্ছে কিনা তা নজরদারির জন্য কোন আয়োজন আছে বলে নজরে পড়ে না। ফলে প্রতিনিয়ত জাতীয় পতাকাকে অস্মানের মাত্রা বাড়ছে। কেউকেউ আবার জাতীয় পতাকাকে সম্মান দিতে, বাড়ির ছাদে, বিদেশি পতাকার পাশাপাশি লাল-সবুজের পতাকাকেও স্থান দিচ্ছে। সে পতাকা রাত-দিন, সারাক্ষণ পত্পত্ করে উড়ছে আকাশে। কিন্তু আমাদের জাতীয় পতাকা উত্তোলনের বিধান অনুযায়ী, সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পতাকা উত্তোলন করা যাবে। রাতে নয়। ফলে এটাও পতাকাকে আরেক ধরণের অসম্মান করা।

লাখো শহীদের রক্তে, অজস্র সম্মান আর ত্যাগের বিনিময়ে আর্জিত আমাদের দেশ। তারই প্রতীকী উপস্থাপন মানচিত্র ও পতাকা। গৃহ, কর্মস্থল ও পরিবহনে বিদেশি পতাকার ব্যবহার সেই লাল-সবুজ পতাকারই অপমান। সে অপমান অসহনীয় যন্ত্রণার। পতাকার পতি অবমাননা কমাতে কিছু বিষয়ে সরকারের আন্তরিক ও দ্রুত নজরদারি আবশ্যক। যে বিধান প্রয়োগ করা সম্ভব নয়, কিংবা যে বিধান প্রয়োগ করতে সরকারের কোন নজরদারি নেই, সে বিধানে কিছু সংশোধনীর কথা ভাবা যেতে পারে। তবে একথা সত্য, পরিবর্তনের আগে চেষ্টা করে দেখতে হবে বিধিমালা যথাযথ প্রয়োগ সম্ভব হয় কিনা। আমরা আরও দেখেছি, বিভিন্ন জাতীয় দিবসে, রিক্সা ভ্যান থেকে শুরু করে অসংখ্য ব্যক্তিগত ও গণপরিবহন এবং বাড়ির ছাদে আমাদের জাতীয় পতাকা উত্তোলিত হয়। এই বিশেষ দিবসগুলোতে গণআবেগের প্রতি সম্মান দেখাতে জাতীয় পতাকা বিধিমালা ১৯৭২ (সংশোধিত ২০১০)-এ পরিবর্তন আনা যায় কিনা তাও ভেবে দেখা যেতে পারে। যদি সরকার মনে করে, বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে পতাকা উত্তোলন আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়, তাহলে জাতীয় পতাকার প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শনপূর্বক বিদেশি পতাকা ব্যবহার শর্তসাপেক্ষে স্বল্পসময়ের জন্য অনুমোদন দেওয়াও যেতে পারে। কিন্তু কোনো অবস্থাতেই জাতীয় পতাকাকে অপমান নয়। আমাদের মনে রাখতে হবে, বিশ্বকাপ ফুটবল আবেগের চেয়ে আইন পরিপালন অধিকতর জরুরি। মনে রাখতে হবে সবার উপরে দেশ। সবার উপরে লাল-সবুজের পতাকা। সবার উপরে আমাদের জাতীয়তা।

একথা সত্য, আইন বানিয়ে কিংবা গণজোয়ারের বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগ করে দীর্ঘমেয়াদি ভালো ফল পাওয়া খুবই কষ্টকর। ফলে, সবার আগে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। মানুষকে আমাদের পতাকার আবেগের প্রকৃত গল্প শোনাতে হবে। প্রচার করতে হবে, পতাকা কী এবং কিভাবে তার মান রাখতে হয়। এই প্রচার কার্যক্রমে সরকারকে অগ্রণী ভূমিকা রাখতে হবে। আর বেসরকারি সংগঠনগুলোকে উৎসাহিত করতে হবে, তারা যেন গণসচেতনতা সৃষ্টিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখে। প্রক্রিয়া যাই হোক, পতাকার অসম্মান বন্ধ করতে হবে। বন্ধ করতে হবে আইনের লঙ্ঘন। এবং তা আজই। আইন ও জাতীয় আবেগের চেয়ে ফুটবল আবেগ কোনো অবস্থাতেই বড় হতে পারে না।

শিক্ষক
অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস্ বিভাগ
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর