ইতিহাসে ক্রোয়েশিয়া, রূপকথার মাঝে শুধু ফ্রান্স

স্পোর্টস ডেস্ক>
এই প্রথম ক্রোট জাতীয় সঙ্গীত বাজবে বিশ্বকাপ ফাইনালের আগে।
এই প্রথম ক্রোট জাতীয় সঙ্গীত বাজবে বিশ্বকাপ ফাইনালের আগে।

প্রয়াত ববি রবসনের স্ত্রী লেডি এলসি ক’দিন আগে বলেছেন, এবার তার স্বামীর যাবতীয় ইচ্ছে আশীর্বাদ হয়ে ঝরে পড়বে এই ইংল্যান্ড টিমের ওপর। ঝরে পড়ল কই? ইংল্যান্ড আজও সেই অভিশাপবিদ্ধ থেকে গেল। অভিশাপ মুক্তির ম্যাচে আরও বড় শাপমুক্তি ক্রোয়েশিয়ার। আরও বড়, আরও অনেক বড় ইতিহাস গড়ে তারা বিশ্বকাপ ফাইনালে। এই প্রথম ক্রোট জাতীয় সঙ্গীত বাজবে বিশ্বকাপ ফাইনালের আগে। জাগ্রেব বৃহস্পতিবার সারা রাত জাগবে। শুধু এক দিন নয়, আগামী তিন দিন। ১৯৯০ বিশ্বকাপে ববি রবসন তখন ইংল্যান্ড কোচ। কী সব নাম টিমে। পিটার শিল্টন, গ্যারি লিনেকার, টেরি বুচার, ব্রায়ান রবসন, ক্রিস ওয়াডল, পিটার বার্ডসলে, ডেভিড প্লাট, পল গাসকোয়েন, স্টুয়ার্ট পিয়ার্স। এদের নিয়ে সেমিফাইনালে উঠে হেরে যান রবসন। ওই যন্ত্রণা শেষ দিন পর্যন্ত ভোলেননি।

তারপর থেকে সেমিফাইনাল নামক দেওয়াল পেরোতে পারেনি ইংল্যান্ড সিনিয়র টিম। ইউরো ১৯৯৬ সেমিফাইনালে হার জার্মানির কাছে। এ বারও তাই। এক গোলে এগিয়েও তারা গুলিবিদ্ধ পাখি। স্বপ্ন মৃত। ম্যাচ শেষে পুরো ইংল্যান্ড টিম মাটিতে মুখ গুঁজে কাঁদছিল। মদ্রিচ, মান্দজুভিচরা কোচকে ফেলেই দিলেন মাটিতে। আধঘণ্টা মাঠেই চলল নাচ। তারুণ্য, গতি, তাড়া করা এবং সেটপিস সম্পদ করে গ্যারেথ সাউথগেট টিমটাকে এত দূর এনেছেন। বিদায় নিয়েও তিনি জাতীয় নায়ক। তার গায়ের ওয়েস্ট কোট এখন বিখ্যাত। অনেক সংস্থা তাকে আজীবন ওয়েস্ট কোট দিতে চায়। অনেক ফ্যান তার মতো ওয়েস্ট কোট পরে আসছেন মাঠে। তাতে কী লাভ হলো?
ট্রিপিয়ারের অসামান্য ফ্রিকিক গোলটার পর একবার হাত ঝাঁকিয়েই তিনি উৎসব সেরে ফেললেন। আবেগ ভিতরে রাখতে পারেন ইংরেজ কোচ। ট্রিপিয়ারের ফ্রিকিক গোলটার মধ্যে এক অনায়াস ব্যাপার গ্যালারিকে আচ্ছন্ন করে দিয়ে যায়। বারি শহরে জন্ম বলে সমর্থকরা ট্রিপিয়ারের নাম দিয়েছেন ‘বারি বেকহ্যাম’। চমকপ্রদ তথ্য হল, বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের হয়ে শেষ ফ্রিকিক গোলটা করেছিলেন বেকহ্যাম। ২০০৬ সালে ইকুয়েডরের বিরুদ্ধে। তার পর আবার এই।
সাউথগেট প্রথম থেকে বিশ্বকাপে সেটপিসের ওপর নজর দিয়েছেন। যত দিন গিয়েছে, তত আরও বাড়িয়েছেন সেটপিসে গোল করা এবং গোল বাঁচানোর ট্রেনিং। তিনি দেখেছিলেন, এই বিশ্বকাপে প্রচুর গোল হচ্ছে সেটপিসে। ৫২ বছরের পুরোনো ‘পর্বত’ পেরোনোর পথে তার দরকার ছিল আঠাশ বছরের অভিশাপ ভাঙা। সেটা সেটপিসেই ভাঙবে মনে হচ্ছিল। ওই গোলে ক্রোয়েশিয়ার রিয়াল মাদ্রিদ (মদ্রিচ), বার্সেলোনা (রাকিতিচ), জুভেন্তাস (মান্দজুকিচ), ইন্তার মিলান (পেরিসিচ), লিভারপুলের (লভরেন) পঞ্চ মিনারের আত্মবিশ্বাস কিছুটা টলে গেল। তারা অবিশ্বাস্য উঠে দাঁড়াল পেরিসিচের অবাক গোলটার পর। কাইল ওয়াকারের মাথার উপর দিয়ে চমৎকার স্ট্যাবে ১-১। এর পর ক্রোটরা তাদের অভিশাপ মু্ক্তির চেষ্টা শুরু করল। এতক্ষণে মদ্রিচ মদ্রিচের মতো। সাউথগেটকে দেখে দশ বছর আগে আর্সেন ওয়েঙ্গার বলেছিলেন, এই ছেলেটি জাতীয় টিমের উপযুক্ত ম্যানেজার। তখনও সাউথগেটের মিডলসবোরো ক্লাব ম্যাঞ্চেস্টার সিটিকে আট গোলে হারাননি।
এই তরুণ ইংল্যান্ড টিমে সাউথগেট এমন বাঁধুনি ও ছটফটানি এনেছেন, যা দেখে ফ্রান্সও ভয় পাবে। কিন্তু একটা সময় তারা বশ্যতা মেনে নিল অভিজ্ঞতার কাছে। ম্যাচ শেষ হওয়ার পাঁচ মিনিট বাদেও তারা গোলপোস্টের কাছে দাঁড়িয়েছিল। বিশ্বাস হচ্ছিল না। ইংরেজদের দেখে একটা সময় কলকাতায় অনূর্ধ্ব ১৭ বিশ্বকাপের ফডেন, ব্রিউস্টার, স্যাঞ্চোদের মনে পড়ে যাচ্ছিল। এক রকম গতি, এক রকম স্বতঃস্ফূর্ততা। এক গোল দিয়ে কখনও পুরো ডিফেন্সিভ খেলেননি ইংরেজরা। ১-১ এর পর তারা গেমপ্ল্যান হারিয়ে ম্যাচ তুলে দিলেন মদ্রিচদের হাতে।
লুঝনিকি স্টেডিয়ামে অবশ্য ইংরেজ ফুটবলারদের থেকেও চমক দিল তাদের সমর্থক দল। কোথা থেকে যে নিঃশব্দে কাতারে কাতারে ইংরেজ চলে এলেন, কে জানে! মদ্রিচ-রাকিতিচরা একটু স্কোয়ার পাস, ব্যাকপাস করলেই তারা বিদ্রুপে ভরিয়ে দিচ্ছিলেন ক্রোটদের। হ্যারি কেনদের উৎসাহ দিতে এত চিৎকার, তা যেন মস্কোভা নদী, ভল্গা নদী পেরিয়ে পৌঁছে যাবে টেমস নদীর পারে। দুটো টিমের ওয়ার্ম আপের সময় দুটো টিমের গান চালানো হয় স্টেডিয়ামে।
সেখানে হঠাৎ শুরু হল, ইদানীং বহু আলোচিত ‘ফুটবল ইজ কামিং হোম’। যে কোনও ইংরেজের রক্ত গরম হয়ে যাওয়া উচিত। তাই হল ট্রিপিয়ারদের। কিন্তু ম্যাচ শেষে সে গান ব্যঙ্গের মতো শোনাচ্ছে। ফুটবল আর ‘হোম’ এ ফিরল কোথায়? এখন তারা জাগ্রেবে। ম্যাচ শুরুর এক ঘণ্টা আগে স্টেডিয়ামের চারপাশে উঠে এসেছিল পুরো বিশ্ব। যে সব দেশ ছিটকে গিয়েছে, তাদের সমর্থকেরা জাতীয় টিমের জার্সি পরে হাজির। তারা বেশ উত্তেজক ম্যাচ দেখলেন। এখন আলোচনার কেন্দ্রে শুধু গ্রিয়াজমান-এমবাপে বনাম মদ্রিচ-রাকিতিচ। দুটো টাইব্রেকার, একটা অতিরিক্ত সময়ের বিশাল জংশন পেরিয়ে ক্রোটরা এখন রক্তের স্বাদ পাওয়া বাঘ-সিংহ।