নতুনের সামনে চ্যাম্পিয়নের হাতছানি

ক্রীড়া প্রতিবেদক>
উন্নতির ক্রম ধারবাহিকতায় ফাইনালে ক্রোয়েশিয়া। ১৯৯৮তে সেমিফাইনাল থেকে বিদায় নিলেও এবার প্রথমবারের মতো ফাইনালে। অনেকই দেখছেন নতুন চ্যাম্পিয়ন হিসেবে। ১৯৫৮ সালে ব্রাজিল, ১৯৭৮ সালে আর্জেন্টিনা, ১৯৯৮ সালে ফ্রান্স এবং ২০০৮ সালে প্রথমবারের মতো নতুন চ্যাম্পিয়ন হয় স্পেন। সে ধারবাহিকতায় এবার অনেকেই নতুন চ্যাম্পিয়ন হিসেবে ভাবছেন ক্রোয়েটদের। হয়তো ২১তম আসরে বিশ্বকাপ ফুটবলের শিরোপা জয়ীদের ক্লাবে নতুন এক সদস্যের অন্তর্ভুক্তি ঘটতে যাচ্ছে। ক্রেয়োশিয়ার সাফল্যের নেপথ্যে অনেক বিষয়ই উঠে আসছে বিশ্ব মিডিয়ায়।

এবারের ফুটবল বিশ্বকাপের শেষ ষোলো, কোয়ার্টার ফাইনাল ও সেমিফাইনালে প্রথমে গোল হজমের পরও শেষ পর্যন্ত ম্যাচ জয়ে বিশ্বরেকর্ড গড়লো ক্রোয়েশিয়া। বিশ্বকাপের ইতিহাসে এমনটি আগে কখনো ঘটেনি। ১৯৮৬ সাল থেকে বিশ্বকাপে শেষ ষোলো পর্ব চালু হয়। এরপর থেকে শেষ ষোলো, কোয়ার্টার ফাইনাল ও সেমিফাইনালে কোনো দল প্রথম গোল হজমের পর আর ম্যাচই জিততে পারেনি। অথচ এবারের বিশ্বকাপে শেষ ষোল, কোয়ার্টার ফাইনাল ও সেমিফাইনালে প্রথমে গোল হজমের পর ঠিকই ম্যাচ জিতে নিয়েছে ক্রোয়েশিয়া। ফলে বিশ্বকাপের ইতিহাসে পিছিয়ে পড়েও ম্যাচ জয়ের অনন্য এক রেকর্ড গড়লো ক্রোয়েশিয়া।

২১তম আসরের ‘ডি’ গ্রুপে ছিল ক্রোয়েশিয়া। নাইজেরিয়া, আর্জেন্টিনা ও আইসল্যান্ডকে হারিয়ে শেষ ষোলোর টিকিট পায় তারা, টানা তিন জয়। শেষ ষোলোতে ডেনমার্কের মুখোমুখি হয় ক্রোয়েশিয়া। ম্যাচের প্রথম মিনিটে গোল করে ডেনমার্ক। তিন মিনিট গোল পরিশোধ করে ক্রোয়েশিয়া। ফলে ১-১ সমতা রেখেই ম্যাচের নির্ধারিত ৯০ ও অতিরিক্ত ৩০ মিনিট লড়াই করে ডেনমার্ক ও ক্রোয়েশিয়া। শেষ পর্যন্ত টাইব্রেকারে ৩-২ গোলে জিতে কোয়ার্টার ফাইনালে উঠে ক্রোয়েশিয়া। শেষ আটে ক্রোয়েশিয়ার প্রতিপক্ষ ছিল স্বাগতিক রাশিয়া। ম্যাচের ৩১ মিনিটে প্রথম গোল করে রাশিয়া। ৩৯ মিনিটে সেই গোল পরিশোধ করে ক্রোয়েশিয়া। নির্ধারিত ৯০ মিনিট ১-১ সমতা থাকায় ম্যাচ গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে। সেখানে ১০১ মিনিটে গোল করে লিড নেয় ক্রোয়েশিয়া। ১১৫ মিনিটে আবারো ম্যাচে সমতা আনে রাশিয়া। ১২০ মিনিট শেষে ২-২ সমতা বিরাজ করে ম্যাচে। ফলে টাইব্রেকারে গড়ায় ম্যাচটি। সেখানেও অদম্য ক্রোয়েশিয়া। ৪-৩ গোলে ম্যাচ জিতে নেয় তারা। এই জয়ে ২০ বছর পর আবারও বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে উঠে ক্রোয়েশিয়া।

সেমিফাইনালে বুধবার রাতে ইংল্যান্ডের মুখোমুখি হয় ক্রোয়েশিয়া। শেষ আট ও কোয়ার্টার ফাইনালের পর এই রাউন্ডেও প্রথমে গোল হজম করে ক্রোয়েশিয়া। ম্যাচে ৫ মিনিটে ক্রোয়েশিয়ার জালে বল পাঠিয়ে ম্যাচে লিড নেয় ইংল্যান্ড। তবে ম্যাচের ৬৮ মিনিটে সমতা পায় ক্রোয়েশিয়া। ফলে ১-১ সমতা নিয়ে ম্যাাচের ৯০ মিনিট শেষ করে ক্রোয়েশিয়া ও ইংল্যান্ড। তবে অতিরিক্ত সময়ের ১০৯ মিনিটে গোল করে ম্যাচে প্রথমবারের মতো লিড নেয় ক্রোয়েশিয়া। শেষ পর্যন্ত ২-১ গোলে ম্যাচ জিতে ক্রোয়েশিয়া। আগের দুম্যাচে পেনাল্টিতে জিতলেও এবার অতিরিক্ত সময়েই ম্যাচের নিষ্পত্তি করে ক্রোয়েশিয়া। তাই এই জয়ে প্রথম দল হিসেবে বিশ্বকাপের নক আউট পর্বে প্রথমে পিছিয়ে পড়েও ম্যাচ জিতে নেয় ক্রোয়েশিয়া।

দলগত পারফরম্যান্স আর মানসিক আত্মবিশ্বাসই তাদের ফাইনালে নিয়ে গেছে বলে মনে করেন কোচ জলাতকো দালিচ। এমনটা খেলতে পারলে ফাইনালেও স্বপ্ন পূরণ সম্ভব বলে মনে করেন ক্রোয়েশিয়ার কোচ। ম্যাচ শেষে সংবাদ সম্মেলনে জলাতকো দালিচ বলেন, ছয় সপ্তাহ আগে যখন আমি এই দলটাকে দেখি তখনই বলেছিলাম, তারা খুব ভালো খেলে এবং দল হিসেবে তারা অসাধারণ। বিশ্বকাপে সময় যত গড়িয়েছে তাদের আত্মবিশ্বাস ততই বেড়েছে। সেটা শারীরিকভাবে হোক বা মানসিকভাবে। সর্বশেষ তিন ম্যাচে প্রতিবারই শুরুতে পিছিয়ে পরেও, পরবর্তীতে ম্যাচ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে ওরা। মোটকথা ম্যাচ জিততে হলে মাঠ আপনার দখলে নিতে হবে, আর আমার ফুটবলাররা তাই করে দেখিয়েছে। এখন ফাইনালের অপেক্ষা।
নেপথ্যে প্রেসিডেন্ট কিতারোভিচ!

ক্রোয়েশিয়ার ফাইনালে পৌঁছার নেপথ্যে দ্বাদশ খেলোয়াড় হিসেবে অনেকেই মনে করেন সে দেশেরই প্রেসিডেন্ট কোলিন্ডা গ্র্যাবার কিতারোভিচকে। বিশ^ মিডিয়ায় কোলিন্ডাকে অনেকেই পৃথিবীর সবচেয়ে আবেদনময়ী প্রেসিডেন্ট বলে থাকেন। ২০১৫ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি ক্রোয়েশিয়া প্রজাতন্ত্রের চতুর্থ প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন তিনি। দেশটিতে তিনিই প্রথম নারী প্রেসিডেন্ট। অনেকেই বলছেন, প্রেসিডেন্টের অনুপ্রেরণায় নাকি ক্রোয়েশিয়ার সাফল্যের টোটকা। কোলিন্ডা যেভাবে ক্রোয়েশিয়া দলকে অনুপ্রাণিত করছেন তা নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার। যদিও দেশটির বিরোধী পক্ষ বলছেন, সামনের বছর নির্বাচন রয়েছে। জনপ্রিয়তা বাড়াতেই এমন কৌশল অবলম্বন করেছেন কোলিন্ডা।

চলতি বিশ্বকাপের শুরু থেকেই রাশিয়ায় আছেন কোলিন্ডা। খেলোয়াড়দের অনুপ্রেরণা জোগাতে জার্সি পরে গ্যালারিতে হাজির থাকছেন। এমনকি দলের জয়ের পর সোজা চলে যাচ্ছেন ড্রেসিংরুমেও। শেষ ষোলোতে ডেনমার্ককে হারায় ক্রোয়েশিয়া। ম্যাচশেষে কাউকে কিছু না জানিয়েই সোজা ড্রেসিংরুমে চলে যান কোলিন্দা। সে সময় খেলোয়াড়রা তাদের পোশাক পাল্টাননি। অনেকে গোসল করার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। কারও পরণে ছিল শুধু শর্টস, কেউ আবার শুধু অন্তর্বাস পরে ছিলেন। প্রেসিডেন্ট যে এভাবে হুট করে ড্রেসিংরুমে চলে আসবেন তা খেলোয়াড়দের কল্পনাতেও ছিল না! শুধু ড্রেসিংরুমে যাওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেননি কোলিন্ডা। তিনি কোচ থেকে শুরু করে দলের সব খেলোয়াড়কে আলিঙ্গন করেন। ভালো খেলার জন্য দেন বাহবা।

আকর্ষণীয় রূপ আর শারীরিক সৌন্দর্যের জন্য আলোকচিত্রীদের ক্যামেরা সব সময় তার পিছু নেয়। সৈকতে তার বিকিনি পরা ছবি সোশ্যাল মিডিয়ায় ঝড় তোলে। ১৯৯৬ সালে জ্যাকভ কিতারোভিচের সঙ্গে বিয়ে হয় কলিন্ডা গ্র্যাবারের। তাদের দুই সন্তান- মেয়ে ক্যাটারিনা (১৭) এবং ছেলে ল্যুকা (১৫)। কলিন্ডা ক্রোয়েশিয়ান ছাড়াও ইংরেজি, স্প্যানিশ ও পর্তুগিজ ভাষায় কথা বলতে পারেন। এছাড়া জার্মান, ফ্রেঞ্চ ও ইতালিয়ান ভাষা বুঝতে পারেন।