ন্যূনতম মজুরি: মালিকরা দিতে চায় ৬৩৬০ টাকা

স্পন্দন নিউজ ডেস্ক : পোশাক শিল্প শ্রমিকদের একটি অংশ যেখানে ১৬ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরির দাবিতে আন্দোলন করছে, মালিকরা সেখানে দিতে চান ৬ হাজার ৩৬০ টাকা।

পোশাক শ্রমিকদের জন্য নতুন মজুরি কাঠামো নির্ধারণে গঠিত মজুরি বোর্ডের তৃতীয় সভায় সোমবার গার্মেন্ট মালিকদের প্রতিনিধি হিসেবে বিজিএমইএর সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান এই প্রস্তাব তুলে ধরেন।

মজুরি বোর্ডে শ্রমিক প্রতিনিধি হিসাবে থাকা জাতীয় শ্রমিক লীগের মহিলা বিষয়ক সম্পাদক শামসুন্নাহার ভূঁইয়া ন্যূনতম মজুরি বাড়িয়ে ১২ হাজার ২০ টাকা করার প্রস্তাব দিলেও আন্দোলনে থাকা শ্রমিক সংগঠনগুলো তা প্রত্যাখ্যান করেছে।

ঢাকার সেগুনবাগিচায় মজুরি বোর্ডের কার্যালয়ে যখন এই সভা চলছিল, পোশাক শ্রমিকদের কয়েকটি সংগঠনের কর্মীরা তখন বাইরে অবস্থান কর্মসূচি পালন করছিলেন।

২০১৩ সালের ১ ডিসেম্বর তিন হাজার টাকা মূল বেতন ধরে পোশাক শ্রমিকদের জন্য সবশেষ ৫ হাজার ৩০০ টাকা ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করে সরকার। পরের বছর জানুয়ারি থেকে ওই বেতন পেতে শুরু করেন শ্রমিকরা।

পাঁচ বছর পেরিয়ে এসে নতুন মজুরি কাঠামো নির্ধারণের জন্য শ্রম মন্ত্রণালয় গত ১৪ জানুয়ারি স্থায়ী মজুরি বোর্ড পুনর্গঠন করে দেয়।

বিজিএমইএর সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান মালিক পক্ষের প্রতিনিধি এবং জাতীয় শ্রমিক লীগের মহিলা বিষয়ক সম্পাদক শামসুন্নাহার ভূঁইয়া শ্রমিক প্রতিনিধি হিসাবে এই বোর্ডে রয়েছেন।

গার্মেন্ট মালিকদের প্রস্তাব তুলে ধরে সিদ্দিকুর রহমান সভায় বলেন, “শ্রমিকদের জন্য আমরা আপাতত ন্যূনতম মজুরি ৬ হাজার ৩৬০ টাকা করার প্রস্তাব করছি। এ বিষয়টি চূড়ান্ত হলে এর ওপর ভিত্তি করে অন্যান্য গ্রেডের মজুরি ঠিক করা হবে।”

শ্রমিক ও মালিক দুই পক্ষের ‘স্বার্থ ও বাস্তবতা’ মাথায় রেখেই এ মজুরি প্রস্তাব করা হয়েছে বলে দাবি করেন পোশাক শিল্পের ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠনের এই নেতা।

সিদ্দিকুর রহমান দাবি করেন, মূল্যস্ফীতির পাশাপাশি শ্রমিকের প্রয়োজনীয়তা এবং মালিকের সক্ষমতা বিবেচনায় করেই তাদের এই প্রস্তাব।

অন্যদিকে শ্রমিক প্রতিনিধি হিসাবে শামসুন্নাহার ভূঁইয়া ১২ হাজার ২০ টাকা ন্যূনতম মজুরির প্রস্তাব তুলে ধরে বলেন, এখানে মাসিক মূল মজুরি ধরা হয়েছে ৭০৫০ টাকা।

এছাড়া বাড়ি ভাড়া বাবদ ২৮২০ টাকা, চিকিৎসা ভাতা এক হাজার টাকা, যাতায়াত ভাতা ৫০০ টাকা এবং টিফিন ভাতা ৬৫০ টাকা ধরা হয়েছে শ্রমিক প্রতিনিধির প্রস্তাবে।

শামসুন্নাহার বলেন, “বাংলাদেশে সব পোশাক কারখানার সক্ষমতা এক রকম নয়। ভালো মানের পোশাক কারখানা বা ‘এ’ ক্যাটাগরির পোশাক কারখানা রয়েছে ৩০ শতাংশ। এর বাইরে ‘বি’ ক্যাটাগরি ও ‘সি’ ক্যাটাগরির বিভিন্ন কারখানা রয়েছে।”

বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন যেখানে বোর্ড গঠনের আগে থেকেই ১০ হাজার টাকা মূল বেতন ধরে মোট ১৬ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরির দাবিতে আন্দোলন করে আসছে, সেখানে শ্রমিক প্রতিনিধি কেন ১২ হাজার টাকার প্রস্তাব দিচ্ছেন- তা জানতে চান সাংবাদিকরা।

জবাবে সরকারসমর্থক এই শ্রমিক সংগঠনের নেত্রী বলেন, “আমি নিজে একটা শ্রমিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত, আবার একটা রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত। সব দিক বিবেচনা করে এই মজুরি প্রস্তাব করেছি।”

তিনি বলেন, “যে মজুরির প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, তা ভালোভাবে জীবন যাপনের জন্য মোটেও যথেষ্ট নয়। তবুও আমাদের আশঙ্কা, এর চেয়ে বেশি মজুরির দিকে গেলে অনেক কারখানায় ছাঁটাইয়ের ঘটনা ঘটবে, শ্রমিকরা কর্মহীন হয়ে পড়বে।”

মজুরি বোর্ডের চেয়ারম্যান সৈয়দ আমিনুল ইসলাম সভায় বলেন, “দুই পক্ষের প্রস্তাব যাচাই-বাছাই করে অতি দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। এ নিয়ে কিছু রিসার্চ-গবেষণার প্রয়োজন আছে। আগামী তিন মাসের মধ্যে মজুরির বিষয়ে চূড়ান্ত নেওয়া সম্ভব হবে।”

মজুরি ঘোষণার আগে নিয়ম অনুযায়ী কিছু কারখানা সরেজমিন ঘুরে দেখবেন মজুরি বোর্ডের সদস্যরা। কিন্তু নতুন মজুরি কাঠামো ঘোষণার জন্য সরকারের বেঁধে দেওয়া ছয় মাস সময় এ মাসেই শেষ হচ্ছে।

বাকি কাজ শেষ করার জন্য মজুরি বোর্ড শ্রম মন্ত্রণালয়ের কাছে তিন মাস সময় বাড়ানোর আবেদন করবে বলে জানান আমিনুল ইসলাম।

প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান শ্রমিক সংগঠনগুলোর

মজুরি বোর্ডে শ্রমিক প্রতিনিধির ১২ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরির প্রস্তাব প্রত্যাখান করেছে ১৬ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরির দাবিতে আন্দোলনরত বিভন্ন সংগঠন।

মজুরি বোর্ডের কার্যালয়ের বাইরে গার্মেন্টস শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের অবস্থান কর্মসূচিতে সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক জলি তালুকদার বলেন, “মালিকদের আজ্ঞাবহ শ্রমিক প্রতিনিধিদের এই প্রস্তাব আমরা প্রত্যাখ্যান করছি। ১৬ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরির দাবি পূরণ না করা হলে ২০১০ সালের মত সারাদেশে তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলা হবে।”

গার্মেন্টস শ্রমিক সংহতির সভাপতি তাসলিমা আকতার বলেন, সরকারের ‘পছন্দের’ শ্রমিক প্রতিনিধির সঙ্গে মালিক পক্ষের ‘ষড়যন্ত্রের’ অংশ হিসেবে ওই মজুরি প্রস্তাব করা হয়েছে।

“শ্রমিক প্রতিনিধি হয়ে উনি কেন আগে ১৬ হাজার টাকার কথা বলে এখন ১২ হাজার টাকায় নেমে এসেছেন আমরা সেটা জানতে চাই। আসলে এরা কেউ শ্রমিকের পক্ষে কাজ করেন না। শ্রমিক প্রতিনিধি সরকারকে তোষণ করে কাজ করছেন, আর সরকার পোশাক মালিকদের কথা মত চলছেন।”

ভবিষ্যতে নতুন কর্মসূচি দিয়ে কারখানা অধ্যুষিত এলাকায় আন্দোলন গড়ে তোলা হবে বলে হুঁশিয়ার করেন এ কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া শ্রমিক সংগঠনের নেতারা।

গার্মেন্ট শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের সভাপতি মন্টু ঘোষের সভাপতিত্বে এবং যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ইকবাল হোসেনের পরিচালনায় এ কর্মসূচিতে কাজী রুহুল আমিন, সাদেকুর রহমান শামীম, খাইরুল মামুন মিন্টু বক্তব্য দেন।