চুড়িহাট্টা অগ্নিকাণ্ড: আমলাদের কাজ নিয়ে প্রশ্ন হাই কোর্টের

নিজস্ব প্রতিবেদক >নয় বছর আগে নিমতলীর আগুনে ১২৪ জনের প্রাণ হারানোর পর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটির দেওয়া ১৭ দফা সুপারিশ বাস্তবায়ন না হওয়ার জন্য আমলাদের দুষল উচ্চ আদালত।

“এত বছরেও একটি সুপারিশ বাস্তবায়ন করতে পারেননি। এই অদক্ষ আমলাদের দিয়ে আমরা কী করব?” বলেছেন একজন বিচারক।

চক বাজারের চুড়িহাট্টার অগ্নিকাণ্ডে নিহতদের ক্ষতিপূরণ, কেমিকেল গুদাম সরিয়ে নেওয়া ও নিমতলীর ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়নসহ বেশি কিছু নির্দেশনা চেয়ে জনস্বার্থে করা এক রিট আবেদনের শুনানিতে বিচারকের এই মন্তব্য আসে।

বিচারপতি এফ আর এম নাজমুল আহাসান ও বিচারপতি কে এম কামরুল কাদেরের হাই কোর্ট বেঞ্চে মঙ্গলবার প্রাথমিক শুনানিতে রুলও জারি করে।

নিমতলীর আগুনের পর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটির দেওয়া ১৭ দফা সুপারিশ বাস্তবায়ন এবং চকবাজারে একই ধরনের ঘটনা ঠেকাতে ব্যর্থতা কেন বেআইনি ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চাওয়া হয়েছে রুলে।

বিস্ফোরক পদার্থ, কেমিকেল, পেট্রোলিয়াম জাতীয় পণ্য ও জ্বালানি উৎপাদন, মজুদ, বিপণন, বহনে কার্যকর আইন ও নীতিমালা দ্রুত প্রণয়ন করে তা কঠোরভাবে প্রয়োগ করার নির্দেশ কেন দেওয়া হবে না, তাও জানতে চেয়েছে আদালত।

মন্ত্রিপরিষদ সচিব, আইন সচিব, স্বরাষ্ট্র সচিব, শিল্প সচিব, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ সচিব, বিসিআইসি’র চেয়ারম্যান, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়রসহ ১০জন বিবাদীকে চার সপ্তাহের মধ্যে আদালতের প্রশ্নগুলোর জবাব দিতে হবে।

গত ২০ ফেব্রুয়ারি পুরান ঢাকার চকবাজারের চুড়িহাট্টায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে অন্তত ৬৭ জন ঘটনাস্থলেই মারা যান। পাঁচটি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয় এই অগ্নিকাণ্ডে। এসব ভবনের মধ্যে থাকা রাসায়নিক ও দাহ্য পদার্থের গুদাম আগুনকে ভয়াবহতা দিয়েছিল বলে ফায়ার সার্ভিস জানিয়েছে।

২০১০ সালে নিমতলীতে অগ্নিকাণ্ডের পর পুরান ঢাকা থেকে সব ধরনের রাসায়নিকের গুদাম ও কারখানা সরিয়ে নেওয়ার সুপারিশ করেছিল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটি, কিন্তু তা বাস্তবায়িত হয়নি বলে তার পুনরাবৃত্তি ঘটেছে বলে সংশ্লিষ্টরা দাবি করছেন।

বুধবার রাতে চকবাজারের চুড়িহাট্টা এলাকায় অগ্নিকাণ্ডে ধ্বংসস্তুপে রূপ নেয় আশপাশের সব সড়ক। ছবি: আব্দুল্লাহ আল মমীন

বুধবার রাতে চকবাজারের চুড়িহাট্টা এলাকায় অগ্নিকাণ্ডে ধ্বংসস্তুপে রূপ নেয় আশপাশের সব সড়ক। ছবি: আব্দুল্লাহ আল মমীন

এরপর বিভিন্ন নির্দেশনা চেয়ে রোববার হাই কোর্টে চারটি রিট আবেদন ও একটি সম্পূরক আবেদন করা হয়। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ইউনুছ আলী আকন্দ, আইনজীবী নূর মুহাম্মদ আজমী ও খন্দকার কাওসার, জেড আই খান পান্না এবং পুরান ঢাকার বাসিন্দা মো. জাবেদ মিয়া আবেদনগুলো করেন।

রিট আবেদনকারী পক্ষের কৌঁসুলি রুহুল কুদ্দুস কাজল বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আজ শুধু ব্যারিস্টার নূর মুহাম্মদ আজমী ও খন্দকার কাওসারের করা রিটের উপর রুল জারি করেছেন (আদালত)। বাকি তিনটি রিটের আদেশ ও শুনানি চার সপ্তাহের জন্য মুলতবি রেখেছেন।”

শুনানিতে চকবাজারের অগ্নিকাণ্ডে নিহতদের পরিবারকে কোনো ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়েছে কি না, তা অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলমের কাছে জানতে চায় আদালত।

জবাবে অ্যাটর্নি জেনারেল এক লাখ টাকা করে দেওয়া হয়েছে বলে জানান।

আদালত তা ‘অপর্যাপ্ত’ উল্লেখ করে পাঁচ লাখ টাকা করে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কথা বললে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, এ দুর্ঘটনার জন্য তো সরকার দায়ী না, পাঁচ লাখ টাকা বেশি হয়ে যাবে।

তখন আদালত মানবিক দিক থেকে বিবেচনা করে ক্ষতিপূরণের টাকার পরিমাণ বাড়াতে অ্যাটর্নি জেনারেলকে সরকারের উচ্চ মহলের সঙ্গে আলোচনা করে জানাতে বলে।

শুনানিতে ‘নিমতলী টু চকবাজার’ শিরোনামে গণমাধ্যমে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন তুলে ধরে কাজল বলেন, নিমতলীর ঘটনায় শিক্ষা নিলে চকবাজারের ঘটনা ঘটত না। কিন্তু বিবাদীরা (সরকারের সংশ্লিষ্টরা) কোনো দায়-দায়িত্ব নিচ্ছে না।

তখন আদালত জানতে চায়, নিমতলীর ঘটনার পর সুপারিশ কীভাবে হয়েছিল। হাই কোর্টের আদেশ অনুযায়ী ওই সুপারিশ হয়েছিল কি না?

জবাবে কাজল বলেন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নিজ উদ্যোগে তদন্ত কমিটি করেছিল। সেই কমিটি ১৭ দফা সুপারিশ করেছিল।

বিচারক তখন বলেন, “ঘটনা ঘটার পর তদন্ত কমিটি হয়, সুপারিশ হয়, কিন্তু সুপারিশ আলোর মুখ দেখে না। এক্ষেত্রে সিটি কর্পোরেশন ও মন্ত্রণালয়গুলোর সমন্বয় দরকার। সুপারিশ বাস্তবায়ন হলে সমস্যার ৮০ ভাগ সমাধান হয়ে যেত।”

রিট আবেদনকারী আইনজীবীদের শুনানি শেষ হলে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম চুড়িহাট্টার ঘটনার পর গঠিত একাধিক কমিটির কার্যক্রম তুলে ধরতে থাকেন।

তখন বিচারক বলেন, “সরকারের উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন কমিটি ১৭ দফা সুপারিশ করেছিল। এগুলোর বাস্তবায়নে সরকারের সংশ্লিষ্টদের কোনো পদক্ষেপ নেই। এগুলো বাস্তবায়নে সিটি কর্পোরেশন ও সরকারের উদ্যোগ দরকার।

“নিমতলীর ঘটনার পর প্রধানমন্ত্রী অনেক আন্তরিক ছিলেন। দুটি মেয়ের দায়িত্ব নিয়েছিলেন। সবকিছু প্রধানমন্ত্রীর একার পক্ষে করা সম্ভব না। এখন সাবেক শিল্পমন্ত্রীরা একে অপরের ওপর দায় চাপাচ্ছেন। এতে সরকারের প্রতি জনগণের ধারণা কোথায় যায়?”

রাসায়নিকের গুদাম রাখার পক্ষেই চকবাজারের ব্যবসায়ীরা

রাসায়নিকের গুদাম রাখার পক্ষেই চকবাজারের ব্যবসায়ীরা

এরপরই আমলাদের কাজ নিয়ে মন্তব্য করেন বিচারক। তিনি আরও বলেন, “সুপারিশগুলো বাস্তবায়ন না করে একশটি কমিটি করেও কোনো লাভ হবে না।”

এ পর্যায়ে অ্যাটর্নি জেনারেল জমি অধিগ্রহণ ছাড়াও পুরান ঢাকার ঘনবসতি, ব্যবসা-বাণিজ্যের নানা প্রতিকূলতা তুলে ধরে বলেন, ১৭ দফা বাস্তবায়ন সমসাপেক্ষ ব্যপার।

তখন আদালত বলে, ব্যবসা-বাণিজ্য-শিল্প যেমন লাগবে, তেমনি মানুষের নিরাপত্তাও লাগবে।

অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, “আলাদা কেমিকেল জোন তৈরি একটি দূরদর্শী (ওয়াইজ) সাজেশন। কিন্তু জায়গা রিক্যুয়ার করা অনেক সময়ের ব্যাপার।”

তখন বিচারক বলেন, “আমলাদের অবহেলা আছে, আবার ব্যবসায়ীদেরও আছে। প্রধানমন্ত্রী এত সময় নেই যে তাকেই সব বিষয়ে হস্তক্ষেপ করতে হবে।”

চুড়িহাট্টা অগ্নিকাণ্ডের পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রাসায়নিকের কারখানা-গুদাম সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগের কথা তুলে ধরে বলেছিলেন, ব্যবসায়ীরা সরতে চান না, যা দুর্ভাগ্যজনক।

নিমতলীর ঘটনার পর সরকার পুরান ঢাকা থেকে রাসায়নিকের গুদাম সরাতে উদ্যোগী হলেও মালিকরা তা না মানার বিষয়টি ‘দুর্ভাগ্যজনক’ বলে মন্তব্য এসেছে চুড়িহাট্টার অগ্নিকাণ্ডের পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছ থেকে।