বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের পথে বাংলাদেশ

বাল্যকাল থেকেই তিনি যে রাজনৈতিক দীক্ষায় দীক্ষিত হয়েছিলেন, সেটি সব সময় ছিল মানুষের পক্ষে। তিনি স্বপ্ন দেখতেন মানব মুক্তি আর শোষণহীন সাম্যের সমাজ প্রতিষ্ঠার। তার চিন্তা জগতের অপরিহার্য ছিল, তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানকে (বর্তমান বাংলাদেশ) পাকিস্তানি শোষণ থেকে মুক্তি।  বঙ্গবন্ধুর এই মুক্তির আন্দোলনের শুরু হয় ১৯৪৭ সালের পর থেকেই যদিও চূড়ান্ত রূপটি আসে আরও পরে। সাম্প্রদায়িক দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে দেশভাগের পর থেকেই এক নতুন অধ্যায়ের পথে যাত্রা শুরু করে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ। কেননা পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হলেও বাঙালি তার আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার লাভ করতে পারেনি, পাকিস্তানি শাসকদের বিরামহীন বঞ্চনার শিকারে পরিণত হয় বাংলার কোটি কোটি জনতা।

ভাষা আন্দোলন এবং ৫৪ সালের যুক্তফ্রন্টের নির্বাচন বাঙালিদেরকে সাময়িক সুযোগ সৃষ্টি করে দিলেও পাকিস্তানি শাসকদের নগ্ন অপ-রাজনৈতিক খেলার দাবার গুটির চাল থেকে তখনও মুক্ত হতে পারেনি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান। জনগণের রায়কে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে সামরিক জান্তা আইয়ুব খানের ক্ষমতা দখলের মাধ্যমে পুরো পাকিস্তানের রাজনীতির অঙ্গনে এক নতুন মাত্রা রূপ পায় যা কিনা বাঙালির অত্যাচারের স্টিম রোলারকে আরও বেশি বেগবান করে । ১৯৬৬ সালে এমনি এক পরিস্থিতির ওপর দাঁড়িয়ে বাঙালি জাতির ত্রাণকর্তা রূপে আবির্ভূত হন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। জাতির এই ক্রান্তিকালে বঙ্গপিতা ঘোষণা করেন বাঙালি জাতির মুক্তির সনদ ঐতিহাসিক ছয় দফা। পরবর্তীতে ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান, জেল-জুলুম এর পরেও লাগাতার আন্দোলন এবং  সত্তরের নির্বাচন। ১৯৭০ সালের জাতীয় নির্বাচনে জনতা বেছে নেয় বঙ্গবন্ধুর নৌকা প্রতীককে। কিন্তু প্রশাসনের টালবাহানায় রাজপথেই সমাধান খুঁজতে হয় গোটা জাতিকে।  জাতির অবিসংবাদিত নেতারূপে অভিষিক্ত হন তিনি, গোটা জাতিকে করেন ঐক্যবদ্ধ। শুরু হয় এক অভূতপূর্ব আন্দোলন, অসহযোগ আন্দোলন। দেশের মানুষকে তিনি মুক্তি ও স্বাধীনতার লক্ষ্যে ঐক্যবদ্ধ করেন। এরই এক পর্যায়ে আসে একাত্তরের সাতৈ মার্চ। সেদিন ঢাকার ঐতিহাসিক জনসমুদ্রে তিনি যে ভাষণ দেন, সেটাও হয়ে ওঠে দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে এক মাইলফলক। তিনি ঘোষণা করেন, “এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম”। এক তর্জনীর সাহসে তিনি একাই পাল্টে দিয়েছিলেন একটি জাতির ইতিহাস। তিনি অসম সাহসিক নেতৃত্বের মাধ্যমে জাতিকে পৌঁছে দিয়ে গেছেন স্বাধীনতার স্বর্ণ তোরণে।

১৯৭১ সালের অনিশ্চয়তা ভরা দিনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বজ্রকণ্ঠ ভাষণ  যেভাবে উদ্দীপ্ত করে তুলেছিল তৎকালীন পূর্ব বাংলার মানুষকে, তা ঠিক কিভাবে উপলব্ধি করছে এই প্রজন্ম? যে ভাষণ বিপৎসংকুল পথে এগিয়ে যাওয়ার পথরেখা দিয়েছিলো এতো বছর পরেও তা আমরা কিভাবে নিয়েছি নিজেদের যাপিত জীবনে। অনেকেই ভাবি, এই প্রজন্ম বোধ হয় খুব একটা বঙ্গবন্ধুকে বা তার রাজনৈতিক সংগ্রামকে উপলব্ধি করতে পারে না, কিন্তু আমাদের এই ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। কেন ভুল তা বিস্তারিত আপনাদের বলছি।

‘মুক্তির গান’ আমাদের কয়েকজনের প্রচেষ্টায় গড়া একটি অনলাইন প্লাটফর্ম। একাত্তরের মহাকাব্যিক মুক্তিযুদ্ধের মৌল চেতনাকে সামনে রেখে আমরা কাজ করছি। মুক্তিযুদ্ধ যে কেবলই নয় মাসের একটি সশস্ত্র যুদ্ধ নয়; বরং হাজার বছরের বাংলার ইতিহাসের যে ঐশ্বর্যমণ্ডিত ও একই সঙ্গে রক্তস্নাত পথপরিক্রমা তা আমরা বর্তমান প্রজন্মের মাঝে ছড়িয়ে দেবার জন্য কাজ করছি। বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ যে প্রকৃত অর্থেই অভিন্ন ও একাত্ম; সেই জায়গাটি ঠিক কিভাবে উপলব্ধি করছে আমাদের শিশুরা তা বুঝতে ও জানতে আমরা যাচ্ছি শিশুদের মাঝে, শিক্ষার্থীদের কাছে। বাংলাদেশের কথা বলতে গিয়ে অনিবার্যভাবে যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কথা আসবে সেই ইতিহাস আমরা তুলে ধরছি এই প্রজন্মের মাঝে। সেই কাজের ধারাবাহিকতায় গত ফেব্রুয়ারি মাসে আমরা একটি প্রতিযোগিতার আয়োজন করি, শিশুর কণ্ঠে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ প্রতিযোগিতা ‘সেই অবিনাশী উচ্চারণ’ নামে। মূলত জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্ম শতবর্ষ উদযাপনের লক্ষ্যে বছরব্যাপী কর্মসূচির উদ্বোধন হতে যাচ্ছে ‘সেই অবিনাশী উচ্চারণ’ এর মাধ্যমে। ৫-১৪ বছর বয়সসীমার শিশুদের কণ্ঠে বঙ্গবন্ধুর অবিনাশী সাতই মার্চের ভাষণ ভিডিও করে আমাদের কাছে পাঠানোর আহবান জানাই। আমাদের ধারণা ছিল হয়তো খুব বেশি ভাষণ আসবে না এই অল্প সময়ে। কিন্তু আমাদের অবাক করে দিয়ে মাত্র ১ মাসের ব্যবধানে প্রায় ৬ হাজার ৮৫৭টি ভাষণ আমাদের কাছে জমা পরে। আমরা আরো বেশি অবাক হই বাছাইপর্বে গিয়ে। এই বিপুল সংখ্যক প্রতিযোগী থেকে শীর্ষ ৫০ নির্ধারণ করা এবং সেখান থেকে ‘সেরা সাত’ নির্ধারণ সত্যি দুরূহ কাজ ছিল। উল্লেখ্য শহর এবং মফস্বল এলাকা উভয় জায়গা থেকেই সমানতালে এই ভাষণ এসেছে যা ছিলো অভূতপূর্ব। একই সাথে স্কুলের সাথে সমানতালে পাল্লা দিয়ে মাদ্রাসা থেকেও ভাষণ এসেছে।  আমরা যখন স্কুল ক্যাম্পেইনে গিয়েছি তখন একটি বিষয় লক্ষ্য করেছি যে, ভাষণের মর্মার্থ তারা কম উপলব্ধি করতে পারছে। কিন্তু তাদের মধ্যে যে আগ্রহ দেখেছি, বঙ্গবন্ধুর মতো ভাষণ উপস্থাপন করতে চাওয়ার যে প্রবণতা দেখেছি তা আমাকে এক নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখিয়েছে। অথচ ১৯৭৫ সালের ১৫ অগাস্ট জাতির পিতাকে সপরিবারে হত্যার পর তার হত্যার বিচার করা যাবে না মর্মে ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারি করেছিলো তৎকালীন রাজনৈতিক কাপুরুষেরা। বঙ্গবন্ধুর নাম ইতিহাস থেকে বাদ দেয়াই শুধু নয়, রাষ্ট্রীয় প্রচার মাধ্যম থেকে তার নাম বা তার কথা প্রচার বন্ধ করে দেয়া হয়। এক কথায় মানুষের মন থেকে বঙ্গবন্ধুর কথা, তার স্মৃতি, তার অবদান মুছে ফেলার যাবতীয় অপচেষ্টা করা হয় সে সময়। কিন্তু তারা যে ভুল ছিল সময়ের পরীক্ষায় সুস্পষ্টভাবে আজ  তা প্রমাণিত হয়েছে।

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মদিনেই আমরা আয়োজন করতে যাচ্ছি এক আনন্দ উৎসবের। রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে উপস্থিত থাকবে হাজারো শিশু। ১৭ মার্চ রবিবার বিকেল ৪টায়  শিশুদের হাত ধরেই মুক্তির গান এর বছরব্যাপী ‘বঙ্গবন্ধু বর্ষ’ উদযাপনের কার্যক্রম শুরু হতে যাচ্ছে। এই আয়োজনে বিডিনিউজ টুয়েন্টিফোর ডটকম, দৈনিক সমকাল এবং একাত্তর টেলিভিশনকে আমরা পেয়েছি গণমাধ্যম সহযোগি হিসেবে। সকলের প্রতি আমাদের আন্তরিক আহবান, আগামী ১৭ মার্চ জাতীয় শিশু দিবসে মানিক মিয়া এভিনিউয়ে আসুন। দুর্মোখদের ইতিহাস বিকৃত করা, বঙ্গবন্ধুর নাম মুছে ফেলা, তার ভূমিকাকে খাটো করে দেখানোর অপচেষ্টাগুলো যে সম্পূর্ণ ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে সেটা নিজ চোখে দেখুন। শুনুন শিশুর কন্ঠে জাতির জনকের ঐতিহাসিক সাতই মার্চের ভাষণ।

জয় বাংলা।