তরুণ প্রজন্মকে গা শিউরে ওঠা মুক্তিযুদ্ধের গল্পশোনালেন মুক্তিযোদ্ধা মাহমুদা ও আব্দুস সাত্তার

নিজস্ব প্রতিবেদক>
একাত্তর সাল। চারিদিকে বাজছে যুদ্ধের দামামা। একের পর এক পুড়ে চলেছে শ্যামল বাঙলার শহর গ্রাম। হাট বাজার দোকান পাট। দেশ জুড়ে পাক বাহিনীর গণহত্যার বিভীষিকা। লাখে লাখে মরছে বাঙালি। দেশ ব্যাপী উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠা। এমন দমবন্ধ করা পরিস্থিতিতে সামান্য এক রাজমিস্ত্রীর বউ মাহমুদা বেগম ছুটে ফিরতেন মানুষের বাড়ি বাড়ি। চেয়ে চাল, ডাল, তেল, নুন, তরকারি, আনাজপাতি যা কিছু মিলত, সেগুলি নিয়ে রান্না করতেন। নিজের সন্তানের মতো করে রণাঙ্গনের মুক্তিযোদ্ধাদের মুখে সেসব রান্না খাবার তুলে দিতেন। কোন কোন দিন রেঁধে খাওয়ানোর মতন কিছুই থাকত না। সেদিন ছোলা মসুরি কিংবা গম ভেজে দিতেন। মুক্তিবাহিনীর ছেলেদের পরনের পোশাক ধুয়ে রোদে শুকিয়ে দিতেন।
বয়সের ভারে ন্যুজ্ব হয়ে পড়েছেন মাহমুদা বেগম। ঠিক মতন হাঁটতে পারেন না। কমে এসেছে দৃষ্টি শক্তিও। কিন্তু অশীতিপর এই নারী এখনও ঠিক স্মরণ করতে পারেন একাত্তরের সেই দিনগুলো। কোনরকম এদিক সেদিক হয়না। সোমবার সকালে (২৫ মার্চ) মুক্তিযুদ্ধের সময় ফেলে আসা সেই দিনগুলোয় ফিরে যান মাহমুদা বেগম। তরুণ প্রজন্মের কাছে সেই দিনের গল্প করেন অবলিলায়। আর এই গল্প বলার ও শোনার সুযোগ করে দিয়েছিল যশোরের মুক্তিযুদ্ধ পাঠাগার। সেই সাথে জনউদ্যোগ যশোর। শহরের সদর হাসপাতাল সংলগ্ন ঘোপ নওয়াপাড়া রোডে ইনস্টিটিউট ফর এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট(আইডি) কার্যালয়ে ‘স্মৃতিচারণ ১৯৭১’ অনুষ্ঠানে তিনিসহ আরেকজন মুক্তিযোদ্ধা মহান স্বাধীনতা যুদ্ধকালীন তাদের জীবনের সাথে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে থাকা গল্পের ঝুঁলি খুলে বসেন। আর বাস্তব জীবনের সেই গল্পের ভেতরে মনের অজান্তে ঢুকে যায় স্কুল কলেজ পড়–য়া এই প্রজন্ম। অন্তত গল্প কথনের সময় তরুণদের যে পিনপতন নীরবতা, তাদের গল্প শোনার বিভোরতা সেটাই বলে দেয়। নারী মুক্তিযোদ্ধা মাহামুদার সাথেও যেন সবাই চলে যেতে থাকে সেই অগ্নিগর্ভ একাত্তরে। তখন মে মাসের মাঝামাঝি হবে হয়ত। রবিউল আলম ও কালু নামে দু’জন মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডারসহ কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা আসেন তার বাড়িতে। তখন ভর দুপুর। সেখানে দুপুরের খাবার সারেন তারা। তাদের সঙ্গে আলাপ করে যুদ্ধে যোগ দেন মাহমুদার স্বামী খোরশেদ আলী। সেই সুযোগটি নেন মাহমুদা। তিনিও প্রশিক্ষণ নেন। অংশ নেন মুক্তিযুদ্ধে। গ্রেনেড ছোড়া ও রাইফেল চালানো শেখেন। মুক্তি বাহিনীর প্রতিনিধি হিসেব বাড়ি বাড়ি গিয়ে খাবার সংগ্রহ শুরু করেন। পাগলি সেজে, কখনো বউ সেজে আবার কখনো ভিক্ষুক ও ফেরিওয়ালা সেজে ইনফর্মারের কাজ করতেন।
একাত্তরের স্মৃতিচারণের এক পর্যায়ে তিনি বলেন, একবার পাক সেনাদের আত্মসর্মপণের খবর পাই। এটি জানার পর গোপনে গাছি দা নিয়ে বের হই। আত্মসমর্পণ করার স্থলে গিয়ে কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগে কুপিয়ে হত্যা করি এক পাক সেনাকে।
আশির বেশি বয়সী এই নারী মুক্তিযোদ্ধার সাহসিকতার কথা যশোর সদরের নওয়াপাড়ার মধুগ্রামসহ আশপাশের গ্রামে কিংবন্দন্তীর কাহিনীর মতন মানুষের মুখে মুখে ফেরে।
স্মৃতিচারণ অনুষ্ঠানে একাত্তরের গল্প করেন যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা আবদুস সাত্তার। তিনি বলেন, একাত্তর সালের কোন একদিন স্কুল থেকে বাড়ি ফিরছিলেন তিনি। এসময় দেখেন, তার গ্রামের বাড়ি দেয়াড়ার পাশের গ্রাম ফরিদপুরে পাক বাহিনী আক্রমণ চালায়। গ্রামটিতে আগুন জ্বালিয়ে দিয়ে ৬৮ জনের বেশি মানুষ হত্যা করে পাক বাহিনী। এঘটনার পরপরই তিনি কাশিপুর সীমান্ত হয়ে ভারতের বয়রা রওয়ানা হন। তিনি খয়রাত হোসেন, আব্দুল মান্নানসহ ১৭ জনের একটি দল ভারতে গিয়ে যুদ্ধের প্রশিক্ষণ নেন। এরপর প্রশিক্ষণের দশ দিনের মাথায় ২৯ মে সাতক্ষীরার ভোমরায় নতুন মুক্তিযোদ্ধারা পাকবাহিনীর সাথে সম্মুখ সমরে অবতীর্ণ হন। এ যুদ্ধে মুক্তিসেনারা জীবিতবস্থায় একজন পাকসেনাকে ধরে ফেলে উদ্ধার করে ১৫০টি অস্ত্র। এরপর যুদ্ধ করতে চলে আসি চৌগাছা এলাকায়। গরিবপুর এলাকায় ভয়ংকর ট্যাংকের যুদ্ধ হয়। একেবারে মুখোমুখি ট্যাংক যুদ্ধ। ওই যুদ্ধে সাতটি ট্যাংক হারিয়ে পিছু হটে পাক বাহিনী। এমন বাস্তব গল্পে বিমোহিত হয় এ প্রজন্মের যুবকরা।
মুক্তিযুদ্ধ পাঠাগার ও জনউদ্যোগ আয়োজিত স্মৃতিচারণ ১৯৭১ অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন জনউদ্যোগ আহবায়ক প্রকৌশলী নাজির আহমেদ। বক্তব্য রাখেন মুক্তিযুদ্ধ পাঠাগার ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান মুক্তিযোদ্ধা রুকুনউদ্দৌলাহ। অনুষ্ঠানের শুরুতে রুকুনউদ্দৌলাহ লিখিত দু’ মুক্তিযোদ্ধার জীবনী পাঠ করেন মুক্তিযুদ্ধ পাঠাগার সভাপতি নিশাত সুবাহ ও আইইডি কর্মী পারাল বেগম। জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান এই দু’ মুক্তিযোআকে স্মারক উপহার তুলে দেন যশোর মুক্তিযুদ্ধ পাঠাগার চেয়ারম্যান। এ সময় উপস্থিত ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা ওহিদুজ্জামান চাকলাদার মুকুট, মহিলা পরিষদ নেত্রী আইনজীবী কামরুন নাহার, সেমিনার পরিষদের দীপক রায়, প্রকৌশলী ধনঞ্জয় বিশ্বাস. আইডি ব্যবস্থাপক বীথিকা সরকারসহ তরুণ প্রজন্মের ৫০ জন কিশোর-কিশোরী।