তরুণকে ইয়াবা দিয়ে ফাঁসিয়েছিলেন পুলিশের এই সদস্যরা

তরুণকে ইয়াবা দিয়ে ফাঁসিয়েছিলেন পুলিশের এই সদস্যরা

মিথ্যা মামলা ফাঁসানোর ঘটনার সঙ্গে জড়িত (বা থেকে) কালীগঞ্জ থানার তৎকালীন সেকেন্ড অফিসার এসআই ইমরান হোসেন, এএসআই আব্দুল গাফফার, এসআই বিশ্বজিৎ পাল ও এসআই লিটন কুমার বিশ্বাস।

মিথ্যা জব্দ তালিকা, মিথ্যা এজাহার, অসত্য জবানবন্দি, অসত্য পুলিশ প্রতিবেদন দিয়ে ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলায় অমিত শিকদার বিশু নামে এক তরুণকে ফাঁসানোর অভিযোগ উঠেছে পুলিশের বিরুদ্ধে।

পুলিশের দায়ের করা মাদক মামলায় আদালতের বিচারে বিশু নির্দোষ প্রমাণিত হয়ে খালাস পেয়েছেন।

রায়ে বেকসুর খালাসের পর সেই তরুণ মিথ্যা মামলা দেওয়ার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে বিচার চেয়ে আদালতে মামলা করে এখন উল্টো গুম আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। পরিবার-পরিজন নিয়ে চলে গেছেন আত্মগোপনে।

আদালতের রায়ে বেকসুর খালাস পাওয়ার পর বিশু সাজানো মামলার সঙ্গে জড়িতদের বিচার চেয়ে ঝিনাইদহ চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে আবেদন (মিস মামলা) করেন।

আদালত বিষয়টি আমলে নিয়ে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তাকে তদন্তের আদেশ দেন।

তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হবার পর এ বছরের ২৭ ফেব্রুয়ারি ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ থানায় কর্মরত অভিযুক্ত এসআই ও এএসআই সহ ৫ পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছেন ঝিনাইদহের চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট সৈয়দ হাবিবুল ইসলাম।

আদেশে আগামী ২৯ এপ্রিলের মধ্যে দায়ী সকলের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যরস্থা গ্রহণ করতে ঝিনাইদহ পুলিশ সুপারকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া সকলের বর্তমান অবস্থান ও স্থায়ী ঠিকানা আদালতকে সরবরাহ করতেও বলেছেন আদালত।

কীভাবে ফাঁসানো হয়েছিল বিশুকে?

অমিত শিকদার বিশু পরিবর্তন ডটকমকে বলেন, ২০১৬ সালের ১০ মার্চ রাতে তিনি একটি বিয়ের অনুষ্ঠান থেকে সে আর কার্তিক বিশ্বাস নামে একজন বাড়ি ফিরছিলেন। কালীগঞ্জের কাশিপুর রেলগেটে পৌঁছালে একদল পুলিশ তাদেরকে থামিয়ে শরীর তল্লাশি করে।

এসময় কিছু না পেলেও থানার এএসআই আ. গাফ্ফার ও দুইজন কনস্টেবল মোটরসাইকেলে বিশুকে থানায় নিয়ে যান।

সকালে কার্তিক বিশ্বাসকে থানা থেকে ছেড়ে দেওয়া হয়। পরে ২০টি ইয়াবা পাওয়া গেছে দেখিয়ে ৫/১৬ নম্বর একটি মামলা দিয়ে বিশুকে আদালতে পাঠায় পুলিশ।

৪১ দিন কারাগারে থাকার পর জামিনে বেরিয়ে আসে বিশু। এই মামলায় দীর্ঘ বিচারের পর ২০১৮ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর তাকে বেকসুর খালাস দেন ঝিনাইদহের আদালত।

বিশু বলেন, এরপর তিনি এই মামলায় হয়রানির শিকার হয়েছেন এমন অভিযোগ করে রায় ঘোষণার দিনই ষড়যন্ত্রমূলক মামলা দিয়ে যারা তাকে হয়রানি করলো তাদের বিচার চেয়ে আদালতে আবেদন (মিস মামলা) করেন।

তার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালতে মিস ২৬/১৮ নম্বর একটি মামলা রুজু হয়।

এই মামলায় আদালত এক আদেশে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ঝিনাইদহ সদর সার্কেলকে তদন্তের নির্দেশ দেন। ঝিনাইদহ সদর সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার কনক কুমার দাস তদন্ত শেষে আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করেন।

প্রতিবেদনে তিনি উল্লেখ করেছেন, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ কেউ অমিত সিকদার বিশুকে রাজনীতি থেকে দূরে রাখতে পুলিশকে ব্যবহার করে এই মামলা করিয়েছিলেন।

সৃজিত ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা: আদালত

আদালতের আদেশে বলা হয়েছে, মামলাটি সৃজিত ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত । এই মামলার জব্দ তালিকা প্রস্তুতকারী এসআই লিটন কুমার বিশ্বাস মিথ্যা জব্দ তালিকা ও মিথ্যা এজাহার প্রস্তুত করে এবং মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই বিশ্বজিৎ পাল স্বাক্ষীদের ১৬১ ধারার অসত্য জবানবন্দ্বি রেকর্ড করে ও অসত্য পুলিশ প্রতিবেদন তৈরী করে আদালতে দাখিল করেন।

উভয়েই আদালতে মিথ্যা স্বাক্ষ্য প্রদান করে পেনাল কোডের ১৯৩/২১৮/৪৬৫/৪৭১ ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ করেছেন। তাছাড়া উক্ত কার্যকলাপে ক্ষমতার অপব্যবহার ও মারাত্মক অসদাচরণ করেছেন।

আদালত আরো উল্লেখ করেছেন, মিথ্যা জিডি এন্ট্রি ও মিথ্যা মামলায় কোনো ব্যক্তিকে ফাঁসানোর ক্ষেত্রে থানার ডিউটি অফিসার বা অফিসার ইনচার্জ বা উভয়ের সংশ্লিষ্টতা থাকবেই। আদালত এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত কালীগঞ্জ থানার তৎকালীন এএসআই আব্দুল গাফফার, এসআই লিটন কুমার বিশ্বাস, বর্তমানে ডিএসবি ইন্সপেক্টর ঝিনাইদহের ইমরান হোসেন, এসআই বিশ্বজিৎ পাল ও কনস্টবল মিরাজ সহ ৫ পুলিশ সদস্য ও সেই সময়ে থানায় দায়িত্বে থাকা ডিউটি অফিসার বা ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নিতে ঝিনাইদহ পুলিশ সুপারকে নির্দেশ দেন।

পাশাপাশি অধিকতর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করার স্বার্থে আগামী ২৯-০৪-১৯ ধার্য তারিখের মধ্যে তাদের বর্তমান অবস্থান ও স্থায়ী ঠিকানা আদালতকে সরবরাহ করতে বলা হয়েছে।

বিশুর পরিবারে গুম আতঙ্ক

এই ঘটনার পর বর্তমানে কালীগঞ্জের নিশ্চিন্তপুর গ্রামের স্কুলশিক্ষক মৃত নন্দকুমারের স্ত্রী ইতি শিকদার, পুত্র অমিত শিকদার ও স্বজনরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ঘোরাঘুরিতে চরম নিরাপত্তহীনতায় ভুগছেন।

অমিত শিকদার বিশুর মা ইতি বিশ্বাস পরিবর্তন ডটকমকে বলেন, আমার ছেলের তিনটি বাচ্চা। তারা আতংকে রয়েছে।

এ ব্যাপারে অমিত শিকদার বিশু বলেন, পুলিশ এসে আমাকে আর আমার মাকে বললো, পুলিশের বিরুদ্ধে মামলা করে বেঁচে থাকতে পারবেন তো? চোখের পলকের মধ্যে রাখছে। কখন আমাকে তুলে নিয়ে যেতে পারবে। একটু আড়াল মতো পেলেই, তুলে নিয়ে যাবে, গুম করবে।

ঝিনাইদহের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মিলা মিয়া বিশ্বাস বলেন, বিশু মিস কেস করে এই মর্মে যে তার বিরুদ্ধে অন্যায় মামলা হয়েছিল। ফলে এটা আবার বিজ্ঞ আদালতের মাধ্যমে তদন্তের নির্দেশ আসে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার পদমর্যাদার কর্মকর্তা দিয়ে। আদালত আদেশ দেয় সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার। সেক্ষেত্রে বিভাগীয় মামলা হয়েছে এবং ওই পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে স্বাক্ষ্য প্রমাণ চলমান আছে।

মিস কেস করার বাদি অমিত শিকদারের নিরাপত্তা নিয়ে আশঙ্কার কিছুই দেখি না।