বারবার ‘ওস্তাদ’ শব্দটি উচ্চারণ করেছে নুসরাত

বারবার ‘ওস্তাদ’ শব্দটি উচ্চারণ করেছে নুসরাত

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যখন নুসরাত জাহান রাফি চিকিৎসাধীন ছিলেন, তখন সবসময় তার সঙ্গে ছিলেন পিবিআইয়ের এডিশনাল এসপি খালেদা বেগম ও রিমা সুলতানা। মূর্ছার (সংজ্ঞাহীন অবস্থা) মধ্যেও নুসরাত বারবার অধ্যক্ষ সিরাজসহ জড়িতদের বিচার দাবি করেছে। সে বার বার ‘ওস্তাদ’ শব্দটি উচ্চারণ করেছে।

শনিবার দুপুরে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) ধানমণ্ডি কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান ডিআইজি বনোজ কুমার মজুমদার।

তিনি বলেন, নুসরাত বারবারই ওস্তাদ শব্দটি উচ্চারণ করেছে, তবে এর অর্থ কী তা আমরা এখনো বুঝতে পারিনি। অবশ্যই তদন্তে আমরা এই শব্দের অর্থ খুঁজে বের করবো।

বনোজ কুমার আরো বলেন, চাঞ্চল্যকর এ ঘটনায় আমরা ৮ তারিখ থেকেই ছায়াতদন্ত শুরু করেছিলাম। তাই ৯ তারিখ বিকেলে মামলাটির তদন্তের দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকে আমাদের সব বুঝে নিতে সমস্যা হয়নি।

পিবিআই এর ক্রাইম ও ইন্টেলিজেন্স উইংসহ ঢাকা-চট্টগ্রাম মেট্রো, ফেনী, নোয়াখালী, কুমিল্লা ও ময়মনসিংহ ইউনিটের পুরো টিম এ অভিযানে সার্বক্ষণিক কাজ করে যাচ্ছে।

পিবিআই প্রধান বলেন, নুসরাত হত্যার ঘটনায় দুটি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে দাহ্য পদার্থ দ্বারা পুড়িয়ে হত্যা মামলায় গ্রেফতারদের পাঁচদিনের রিমান্ড মঞ্জুর হয়েছে, একজনের রিমান্ড শুনানি বাকি আছে।

নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের মামলা এখনো পিবিআই হাতে পায় নি। হাতে এলে সেটাও তদন্ত করা হবে।

দুই কারণে নুসরাতকে হত্যা:

পিবিআইয়ের ডিআইজি জানান, দুটি কারণে নুসরাতকে হত্যার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

এক. শ্লীলতাহানির মামলা করে অধ্যক্ষকে গ্রেফতার করিয়ে নুসরাত আলেম সমাজকে ‘হেয়’ করেছেন।

দুই. আসামি শাহাদাত নুসরাতকে বারবার প্রেমের প্রস্তাব দিলেও নুসরাত প্রতিবারই তা প্রত্যাখ্যান করেছে। এই দুটি কারণেই তাকে

হত্যার পরিকল্পনা করে শাহাদাতসহ অন্যান্যরা।

জেল থেকেই নুসরাতকে হত্যার নির্দেশ দেয় সিরাজ:

সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মাওলানা সিরাজউদ্দৌলা জেল থেকেই নুসরাত জাহান রাফিকে হত্যা করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। আর নুসরাতকে পুড়িয়ে মারার পরিকল্পনা করে ওই মাদ্রাসার শিক্ষার্থী শাহাদাত হোসেন শামীম।

পিবিআইয়ের প্রধান ডিআইজি বনোজ কুমার মজুমদার বলেন, সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাযিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ এস এম সিরাজ উদ দৌলাকে গ্রেফতার হওয়ার পর গত ৪ এপ্রিল ঘটনার প্রতিবাদ জানিয়ে জেলা প্রশাসক বরাবর স্মারকলিপি দেয় একটি মহল। পরদিন আসামি নুর উদ্দিন, শাহাদাত, আব্দুল কাদেরসহ ৫ জন কারাগারে সিরাজের সাথে দেখা করেন।

ওই সময় জেল হাজত থেকেই নুসরাতকে হত্যা করার নির্দেশ দেন সিরাজ। পরে নুসরাতকে পুড়িয়ে মারার পরিকল্পনা করে শাহাদাত।

গ্রেফতারের পর আসামি নুর উদ্দিন পুলিশকে জানায় যে সিরাজই এই হত্যাকাণ্ডের নির্দেশনা দেয়।

যেভাবে নুসরাতের শরীরে আগুন দেয় শাহাদাতসহ জন:

পরিকল্পনা অনুযায়ী বোরখা পরিহিত চারজন ভবনের ছাদে হত্যাকাণ্ডে সরাসরি অংশ নেয়। এদের মধ্যে ন্যূনতম একজন মেয়ে ছিলেন। আর পুরো হত্যাকাণ্ড পরিচালনায় এখন পর্যন্ত ২ জন মেয়েসহ ১৩ জনের সংশ্লিষ্টতা পেয়েছে তদন্তকারী সংস্থা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।

ডিআইজি বনোজ কুমার জানান, ৫ এপ্রিল সকাল ৯টা থেকে সাড়ে নয়টার দিকে মাদ্রাসার পশ্চিম পার্শ্বের হোস্টেলে শাহাদাতরা একত্রিত হয়। নুসরাতকে হত্যার পরিকল্পনায় শাহাদাত আরো দুইজন ছাত্রী ও ৩ জন ছাত্রকে সম্পৃক্ত করে। এদের মধ্য থেকে এক ছাত্রীকে তিনটি বোরখা এবং কেরোসিন আনার দায়িত্ব দেওয়া হয়।

৬ এপ্রিল সকাল সাতটা থেকে নয়টা পর্যন্ত মাদ্রাসা ক্যাম্পাসের ভেতরে সাইক্লোন শেল্টার ভবনে ক্লাস হয়। ক্লাস শেষে সেখানে শাহাদাতের কাছে কেরোসিন ও বোরখা দেন মেয়েটি। পরে তারা চারজন সাইক্লোন শেল্টারের তৃতীয় তলার ছাদে দুটি টয়লেটে লুকিয়ে থাকেন।

পরীক্ষা শুরুর কিছুক্ষণ আগে পরিকল্পনাকারীদের মধ্যে থাকা আরেক ছাত্রী শম্পা কেন্দ্রে গিয়ে নুসরাতকে জানায়, তার বান্ধবী নিশাতকে ছাদে মারধর করা হচ্ছে। এ কথা বলে ওই ছাত্রী নুসরাতকে ছাদে নিয়ে যাওয়ার পর একপর্যায়ে বোরখা পরিহিত চারজন মিলে ওড়না দিয়ে তার হাত-পা বেঁধে ফেলে। এরপর কেরোসিন ঢেলে তার শরীরে আগুন দিয়ে সবাই নিচে নেমে আসে। বাইরে পরিস্থিতি পাহারায় ছিলো নুর উদ্দিনের নেতৃত্বে ৫ জন। আগুন দিয়ে বোরখা পরিহিত চারজন নিচে নেমে ভিড়ের সঙ্গে মিশে যায়।

হত্যাকাণ্ডে সম্পৃক্ত ১৩ জন, গ্রেফতার ৮:

নুসরাত হত্যাকাণ্ডে এখন পর্যন্ত ১৩ জনের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে। তাদের মধ্যে অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলাসহ আটজন গ্রেফতার রয়েছেন। বাকি আরও অনেকের নাম উঠে আসতে পারে বলে জানিয়েছেন পিবিআই প্রধান।

ডিআইজি বনোজ জানান, পরিকল্পনাকারীরা ২০১৬ সালে নুসরাতের চোখে চুন মেরেছিল। তখন মেয়েটির হাসপাতালে চিকিৎসা হয়। এরপর ২৭ মার্চ অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলা নুসরাতকে শ্লীলতাহানির চেষ্টা করেন। সেসব ঘটনা তারা সামাল দিয়েছিল।

এবারও তাই নুসরাতকে পুড়িয়ে হত্যার পর পরিস্থিতি মোকাবিলার চেষ্টা করেন নুর, শাহাদাতেরা। কিন্তু আমরা কাজ করে যাচ্ছি। এই ঘটনায় জড়িত সকলকে খুঁজে বের করা হবে।

এমন যদি হয় যে, কেউ এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত নয়, কিন্তু তিনি আগে থেকেই এই হত্যা পরিকল্পনার বিষয়ে জানতেন; তাহলে তাকেও আইনের আওতায় আনা হবে।