ভয়ঙ্কর অগ্নিকাণ্ড!

১৯০৬ সালের এপ্রিল মাসে আমেরিকার সানফ্রান্সিসকো শহরে তিনদিন ধরে জ্বলতে থাকা আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল প্রায় ২৫ হাজার বিল্ডিং, গৃহহীন হয়েছিল প্রায় ২ লাখ মানুষ এবং হতাহত হয়েছিল প্রায় ৩ হাজার মানুষ। এই ভয়ঙ্কর আগুনের শুরুটা হয়েছিল শহরের অদূরে ঘটে যাওয়া ৮ মাত্রার ভূমিকম্পের পরে। ভূমিকম্পের কারণে যত ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল, তার প্রায় ৯০ শতাংশ হয়েছিল ভূমিকম্প পরবর্তী অগ্নিকাণ্ডের কারণে।

১৯৯৫ সালে জাপানের কোবি শহরেও ঘটেছিল একই রকম ঘটনা। ভূমিকম্প পরবর্তী আগুনে জ্বলতে থাকে শহরের অনেক ভবন। পানি সরবরাহের পাইপলাইন ক্ষতিগ্রস্ত হবার কারণে ব্যাহত হয়েছিল আগুন নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম। ৬ দশমিক ৯ মাত্রার ভূমিকম্পের পরে আগুনে পুড়ে শেষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল প্রায় সাড়ে ৫ হাজার ভবন।

ভূমিকম্প পরবর্তী অগ্নিকাণ্ড একটি স্বাভাবিক ঘটনা। বিংশ শতাব্দীর আগে এর ভয়াবহতা হয়তো তেমন ছিল না। কিন্তু সভ্যতার বিকাশের সাথে তাল মিলিয়ে প্রাকৃতিক গ্যাস এবং বিদ্যুৎ এর ব্যবহার বাড়তে থাকে, আর প্রতিটি ভবন পরিণত হতে থাকে এক একটি বড় দুর্যোগের সূতিকাগারে। ভূমিকম্পের কম্পনের ফলে প্রায়ই ফেটে যায় গ্যাস পাইপ লাইন, ছিঁড়ে যায় বৈদ্যুতিক তার এবং সূত্রপাত করতে পারে প্রলংকারী অগ্নিকাণ্ডের। কখনো কখনো পানির পাইপ ফেটে ব্যাহত হয় পানি সরবরাহ, আগুন নেভানোর জন্য পাওয়া যায় না প্রয়োজনীয় পানি। সাধারণ অগ্নিকাণ্ডের সাথে এর পার্থক্য হলো যে, সাধারণ অগ্নিকাণ্ডে হয়তো উৎস থাকে একটি, কিন্তু ভূমিকম্প পরবর্তী অগ্নিকাণ্ডে অসংখ্য উৎস থেকে একসাথে আগুন ছড়িয়ে পরে, এবং খুব কম সময়ে ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা বেড়ে যায় অনেকগুণ।

একটি গবেষণায় দেখা গেছে প্রায় ১৫ থেকে ৫০ শতাংশ ক্ষেত্রে গ্যাস এবং প্রায় ৪০ শতাংশ ক্ষেত্রে বিদ্যুৎ অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত ঘটায়। গ্যাস এবং বিদ্যুতের যে কোনও একটিকে নিয়ন্ত্রণ করা গেলে ক্ষতির মাত্রা কমিয়ে আনা যায় অনেকাংশে। ১৯৯৪ সালে ক্যালিফোর্নিয়ায়, নরথ্রিজ ভূমিকম্পের (৬ মাত্রার) পরে শহরের গ্যাস পাইপ লাইনের প্রায় ১৪ হাজার পয়েন্ট থেকে গ্যাস নির্গত হতে থাকে, যার কারণে প্রায় শ’খানেক বড় অগ্নিকাণ্ড ঘটে। ভূমিকম্পের কারণে, ওই এলাকায় প্রায় চার ঘণ্টা বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ ছিল। বিশেষজ্ঞদের ধারণা বিদ্যুৎ সংযোগ চালু থাকলে, অগ্নিকাণ্ডের ক্ষয়ক্ষতি হতে পারত প্রায় ১০ গুণ বেশি।

ভূমিকম্প ঝুঁকি থেকে বাংলাদেশ মুক্ত নয়। সাম্প্রতিক বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে এমন তথ্য। প্রায় এগার বছরের গ্লোবাল পজিশনিং সিস্টেম ডেটা নিয়ে গবেষণা করে ফলাফল নিয়ে আমরা একটি গবেষণা পত্র প্রকাশ করেছিলাম ন্যাচার জিওসাইন্স জার্নাল-এ। গবেষণার বিষয়বস্তু ছিল – ‘একটি বড় ভূমিকম্প হবার জন্য যেরকম ভূতাত্ত্বিক অবস্থা দরকার তা বাংলাদেশের আশেপাশে  বিদ্যমান কি না’। প্রায় ৪ বছর ডেটা নিয়ে কাজ করার পর আমরা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছি যে, বাংলাদেশের আশেপাশে, অদূর ভবিষ্যতে ঘটতে পারে বড় ভূমিকম্প। বিগত ৪ শ বছরে এখানে কোনও বড় ভূমিকম্প হয় না, এতোদিনের সঞ্চিত শক্তি একবারে নির্গত হলে হতে পারে প্রায় ৮ মাত্রার ভূমিকম্প।

ভূমিকম্পের মাত্রা ৮ হলেও, ঢাকার অবকাঠামগত কারণে এর তীব্রতা হতে পারে মারাত্মক। ২০০৯ সালে ইউএনডিপি এর গবেষণায় ৭২ হাজার ভবনকে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করা হয়। ভূমিকম্পের তীব্র ঝাঁকুনির প্রথম শিকার হতে পারে এই বিল্ডিংগুলো (অপরিকল্পিত নগরায়নের কারণে ভূমিকম্প ছাড়াই ধসে পরছে কিংবা হেলে যাচ্ছে অনেক বিল্ডিং, যেমন রানা প্লাজা)। এর সাথে গ্যাস পাইপ ফেটে কিংবা বৈদ্যুতিক তার থেকে সৃষ্ট আগুন পরিস্থিতিকে ভয়াবহ রূপ দিতে পারে।

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের বর্তমান অভিযানে যে বাস্তবতা বেড়িয়ে আসছে, তা খুব সুখকর নয়। ঢাকা শহরের অধিকাংশ ভবনে নেই অগ্নি নির্বাপণ ব্যবস্থা, সাধারণ জনগণের নেই অগ্নিসতর্কতা বিষয়ক প্রশিক্ষণ, নেই প্রয়োজনীয় ফায়ার হাইড্রেন্ট। ফায়ার ট্রাক কিংবা অ্যাম্বুলেন্সকে রাস্তায় আগে যেতে দেয়ার সংস্কৃতি এখনো তৈরি হয়নি আমাদের মাঝে। রাস্তা পর্যাপ্ত প্রশস্ত না হবার কারণে কোনও কোনও জায়গায় ফায়ার ট্রাকের পৌঁছানো অসম্ভব হয়ে পড়তে পারে, যেমন পুরনো ঢাকা, এবং নতুন ঢাকার বহুতল ভবন বিশিষ্ট এলাকাগুলো। একটি শক্তিশালী ভূমিকম্পের পরে ঢাকা শহর হয়ে যেতে পারে একটি মৃত্যুপুরী। অসুস্থ মানুষজনকে চিকিৎসা দেবার মতো হাসপাতাল ও ক্লিনিক থাকবে কিনা, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করতে হয়, যেহেতু সাম্প্রতিক জরিপ বলছে ঢাকা শহরের বেশীরভাগ হাসপাতাল ক্লিনিকেই নেই অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা, হাসপাতাল কিংবা ক্লিনিকের ভবনগুলো ভূমিকম্প সহনীয় কিনা তাও আমরা নিশ্চিত নই। ফায়ার স্টেশনগুলোতে আগুনের ঝুঁকি হয়তো নেই, তবে বিল্ডিংগুলোকে গড়ে তুলতে হবে ভূমিকম্প সহনীয় করে।

গবেষণায় দেখা গেছে, ভূমিকম্প পরবর্তী আগুন নিয়ন্ত্রণে, গ্যাস এবং বিদ্যুৎ নিয়ন্ত্রণের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে, কেননা বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে সৃষ্ট স্ফুলিঙ্গ গ্যসের সাথে মিশে গেলে ভয়াবহ অবস্থা তৈরি করতে পারে। তাই ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকায় বিল্ডিং বানানোর সময়, গ্যাস এবং বিদ্যুৎ প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করার জন্য স্বয়ংক্রিয় কিংবা নিয়ন্ত্রিত ভালভ বসানোর পরামর্শ দেয়া হয়েছে, যা দিয়ে প্রয়োজনে গ্যাস প্রবাহ বন্ধ করে দেয়া যাবে। আরও পরামর্শ দেয়া হয়েছে, বিল্ডিংয়ে ইমারজেন্সি বহির্গমন লাইট স্থাপন করার, যাতে বিদ্যুৎ বন্ধ করে দেয়ার পরেও সবাই বিল্ডিং থেকে নিরাপদে বেড়িয়ে যেতে পারে। অবশ্যই উপরোল্লিখিত প্রস্তাবসমূহ, ভূমিকম্প পরবর্তী আগুনের প্রকোপ কমানোর জন্য একমাত্র পন্থা নয়, প্রকৌশলীরা হয়তো আর অনেক যুগোপযোগী প্রস্তাব নিয়ে আসতে পারেন। তবে, এইসব প্রস্তাবনার বাস্তবায়নে সরকারি ও বেসরকারি ভাবে উদ্যোগ নিতে হবে, যাতে করে ধীরে ধীরে জাতিকে এরকম বড় দুর্যোগ মোকাবেলার জন্য প্রস্তুত করে তোলা যায়।

একটা ব্যাপার মাথায় রাখতে হবে, ভূমিকম্পের সময় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা যে বিস্তারে ঘটে, তা স্বাভাবিক বিছিন্ন অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার চেয়ে অনেক বেশি। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের একার পক্ষে এই পরিমাণ দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণ করা কষ্টকর হয়ে যেতে পারে, তাই অন্যান্য বাহিনীতে তৈরি করতে হবে স্ট্রাইকিং গ্রুপ, নাগরিকদের মধ্যে থেকে তৈরি করতে হবে স্বেচ্ছাসেবক, সর্বোপরি দুর্ঘটনার প্রকোপ কমানোর জন্য গ্রহণ করতে হবে পূর্ব সতর্কতা ।