খাইরুল ইসলাম নিরব, ঝিনাইদহ: ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঝিনাইদহ-৪ (কালীগঞ্জ ও সদরের ৪টি ইউনিয়ন) আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে লড়াই চালিয়ে যাবেন স্বেচ্ছাসেবক দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম ফিরোজ। তার পক্ষেই অবস্থান নিয়েছেন বিএনপির তৃণমূলের নেতাকর্মীরা। সদ্য বিএনপিতে যোগ দেয়া গণঅধিকার পরিষদের সাবেক সাধারণ সম্পাদক রাশেদ খাঁন দলীয় মনোনয়ন পেলেও ‘বহিরাগত’ আখ্যা দিয়ে তাকে মানতে নারাজ স্থানীয় নেতা-কর্মীদের বড় একটি অংশ। এতে রাজনৈতিক অঙ্গনে তৈরি হয়েছে জটিল ও বহুমাত্রিক সমীকরণ। কালীগঞ্জ উপজেলার ১১টি ও সদরের ৪টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত এই আসনটি ঐতিহ্যগতভাবে বিএনপির ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। এবার এ আসনে ধানের শীষের দাবিদার ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম ফিরোজসহ স্থানীয় একাধিক নেতা। এখানে রাশেদ খাঁনকে প্রথমে জোটের প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দেওয়া হয়। পরে তিনি বিএনপিতে যোগদান করলে তাকে ধানের শীষের প্রার্থী করা হয়। কিন্তু রাশেদ খাঁনকে মনোনয়ন দেওয়ায় স্থানীয় রাজনীতিতে চরম অসন্তোষ দেখা দেয়, যা কাফনের কাপড় পরে মিছিল পর্যন্ত গড়ায়। যদিও হাইকমান্ডের নির্দেশে মনোনয়নবঞ্চিত হামিদুল ইসলাম হামিদ ও মুর্শিদা জামান রাশেদের পক্ষে প্রচারণায় নেমেছেন। তবে মাঠের বড় একটি অংশ এখনও স্বতন্ত্র প্রার্থী ফিরোজের পক্ষে অনড়। দীর্ঘদিন ধরে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকা ফিরোজ এলাকায় পরিচিত মুখ। সাংগঠনিক রাজনীতির পাশাপাশি সামাজিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় থাকার কারণে স্থানীয় পর্যায়ে তার নিজস্ব অনুসারী ও সমর্থক গোষ্ঠী রয়েছে। নেতাকর্মীরা বলছেন, টাকার বিনিময়ে জোর করে কাউকে চাপিয়ে দিলে কালীগঞ্জের মানুষ বহিরাগতকে মানবে না। রাশেদ খান কোনদিন কালীগঞ্জে আসেননি। তাকে কেউ চেনেও না। রাশেদ খান ঝিনাইদহ-২ আসনে গণসংযোগ করেছেন দীর্ঘদিন। কালীগঞ্জে বিএনপির নেতাকর্মীদের পাশে থাকার কোনো অবদান তার নেই। স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সাইফুল ইসলাম ফিরোজের স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়া বিএনপি প্রার্থীর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। পাশাপাশি জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থীরা থাকায় এই আসনের নির্বাচন প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রূপ নিয়েছে। ভোটারদের কথায় স্পষ্ট, এবারের নির্বাচনে দলীয় পরিচয়ের পাশাপাশি ব্যক্তি পরিচিতি, এলাকার সঙ্গে সম্পৃক্ততা এবং বাস্তব সমস্যার সমাধানের প্রতিশ্রুতিই প্রধান বিবেচ্য হয়ে উঠেছে। কালীগঞ্জ উপজেলার প্রবীণ ভোটার অখিলউদ্দিন বলেন, ‘ফিরোজ এলাকায় বহু সামাজিক কাজ করেছেন এবং ব্যক্তিগতভাবে ভালো মানুষ হিসেবে পরিচিত। দলীয় পরিচয়ের চেয়ে তাকে ব্যক্তি মূল্যায়ন বেশি গুরুত্বপূর্ণ।’ কালীগঞ্জ পৌর ছাত্রদলের আহ্বায়ক জুয়েল রানা বলেন, ‘বিগত আন্দোলন-সংগ্রামে আমরা কখনো রাশেদ খানকে পাশে পাইনি। তিনি কালীগঞ্জের বাসিন্দাও না। তিনি ঝিনাইদহ সদরের ভোটার। ভোট হয়ে গেলে ঝিনাইদহ চলে যাবেন।’ উপজেলা যুবদলের আহবায়ক সুজাউদ্দিন মাহমুদ পিয়াল বলেন, ‘ফিরোজের পক্ষে বিএনপি ও অঙ্গ-সংগঠন ঐক্যবদ্ধ আছে। তাকে বিজয়ী করেই ঘরে ফিরবেন বিএনপির নেতাকর্মীরা।’ কালীগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহবায়ক ডা. নুরুল ইসলাম বলেন, ‘ফিরোজ আমাদের পরামর্শে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন। তিনি তৃণমূলের সব পর্যায়ের নেতাকর্মী-সমর্থকদের অনুমতি নিয়ে নির্বাচনে লড়ছেন। আমরা ফিরোজের সঙ্গে নির্বাচনী মাঠে থাকব।’ নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয়ী হওয়ার বিষয়ে আশাবাদী স্বতন্ত্র প্রার্থী সাইফুল ইসলাম ফিরোজ। স্থানীয় নেতাকর্মীদের ৮০ শতাংশই তার সাথে আছে দাবি করে তিনি বলেন, ‘যে আমাদের এলাকার ভোটার না, তাকে আমরা পছন্দ করছি না। আমি ভোটের মাঠে না থাকলে সব ভোট জামায়াতের বাক্সে চলে যেত। কালীগঞ্জের মানুষ এলাকাভিত্তিক নেতৃত্ব চায়।’ তিনি আরও বলেন, ‘কালীগঞ্জে বিএনপির তৃণমূলের নেতাকর্মী-সমর্থকদের সুখে-দুঃখে তাদের পাশে ছিলাম। তাই তাদের মতামতের ভিত্তিতেই আমি নির্বাচন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। নির্বাচনে বিএনপির নেতাকর্মী-সমর্থকরা বিজয় নিয়েই ঘরে ফিরবেন।’ তার ভাষ্য অনুযায়ী, এই আসনে উন্নয়ন ও মানুষের অধিকার নিশ্চিত করাই তার মূল লক্ষ্য। অন্যদিকে, বিএনপির মনোনীত প্রার্থী রাশেদ খাঁনও বিজয়ের ব্যাপারে আশাবাদী। তিনি বলেন, ‘ব্যক্তি নয়, ধানের শীষই এখানে মূল ফ্যাক্ট। বিএনপির যারা প্রকৃত জাতীয়তাবাদী রাজনীতি করে, তারা তারেক রহমানের সিদ্ধান্তের বাইরে যাবে না। এখানে অতীতেও স্বতন্ত্র প্রার্থীর ইতিহাস ভালো নয়।’ ঝিনাইদহ জেলা বিএনপির সভাপতি অ্যাডভোকেট এমএ মজিদও একই সুরে কথা বলেন। তার মতে, ‘সাময়িক প্রতিবন্ধকতা থাকলেও বিএনপির সমর্থকরা ধানের শীষেই ভোট দেবে। জামায়াতের ভোট জামায়াতই পাবে, বিএনপির ভোট জামায়াতের পাওয়ার সুযোগ নেই।’ ঝিনাইদহ-৪ আসনে মোট ভোটার ৩ লাখ ৩৩ হাজার ৪৬১ জন। এ আসনে ৬ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এই আসনে ১৯৯১, ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের নির্বাচনে এই আসনে জয়ী হন বিএনপির শহীদুজ্জামান বেল্টু। ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের আব্দুল মান্নান নির্বাচিত হন। পরবর্তীত তিনটি নির্বাচনে আওয়ামী লীগের আনোয়ারুল আজম আনার নির্বাচিত হন। ২০২৪ সালের ১৩ ভারতের কলকাতায় খুন হন আনার।