Ad for sale 100 x 870 Position (1)
Position (1)

যশোরে এবার আলুর আবাদ ১০৬০ হেক্টর জমিতে, পুরনোর দাপটে নতুনে দরপতন

এখন সময়: সোমবার, ১৯ জানুয়ারি , ২০২৬, ০১:০৯:৪০ এম

নিজস্ব প্রতিবেদক: নতুন মৌসুম শুরু হলেও বাজারে এখনো পুরোনো আলুর উল্লেখযোগ্য সরবরাহ রয়েছে। ফলে এ বছর নতুন আলুর দাম অস্বাভাবিকভাবে কমে গেছে। যশোরে নতুন আলু বিক্রি হচ্ছে প্রতিকেজি ২৫ টাকায়। কৃষক পর্যায়ে এই আলু বিক্রি হচ্ছে ১০ থেকে ১২ টাকায়, যা উৎপাদন খরচের চেয়েও কম। বাজারে পুরনো আলু বিক্রি হচ্ছে ১৬-১৮ টাকা কেজিতে। কৃষক ও কোল্ড স্টোরেজ মালিকরা জানিয়েছেন, গত মৌসুমের উদ্বৃত্ত আলু এখনো হিমাগারে রয়ে গেছে। এর প্রভাবে নতুন আলু বাজারে এলেও অন্য বছরের মতো দাম পাচ্ছেন না কৃষকরা। উল্টো লোকসান গুনতে হচ্ছে তাদের। আলুচাষিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অক্টোবরের মাঝামাঝি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত আগাম জাতের আলু চাষ করেন কৃষকরা। এসব আলু ৬৫ থেকে ৭৫ দিনের মধ্যে তুলে ফেলা হয় এবং বাজারে নতুন আলু হিসেবে বিক্রি হয়। বর্তমানে বাজারে থাকা আগাম জাতের আলু উৎপাদনে প্রতিকেজিতে খরচ হচ্ছে ১৫ থেকে ১৭ টাকা। কিন্তু বিক্রি করতে হচ্ছে ১০ থেকে ১২ টাকায়। দাম না থাকায় অনেক কৃষক আলু পরিপক্ব হলেও ক্ষেত থেকে তুলছেন না। ঝিকরগাছা উপজেলার মাটিকুমড়া এলাকার কৃষক হোসাইন বিশ্বাস এবার ৫ বিঘা জমিতে আলু চাষ করেছেন। এর মধ্যে প্রায় অর্ধেক আগাম জাতের। তিনি বলেন, এক বিঘা জমিতে আগাম জাতের সাদা আলু চাষ করতে অন্তত ৩৫ হাজার টাকা খরচ হয়। উৎপাদন হয় সর্বোচ্চ ৬০ থেকে ৬৫ মণ। মাঠ পর্যায়ে এখন এই আলু বিক্রি হচ্ছে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা মণ দরে। খরচের টাকাই উঠছে না। এখনো জমিতে আলু রেখে দেওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, সাধারণত রোপণের ৭০ দিনের মধ্যে আলু তুলে ফেলতে হয়। কিন্তু তার জমিতে রোপণের ৭৫ দিন পার হয়ে গেছে। দাম না পাওয়ায় এখনো তুলছেন না। এরপর ধান চাষ করতে হবে বলেও জানান তিনি। একই এলাকার আরেক কৃষক আব্দুল হালিম জানান, তিনি এবার ৮ বিঘা জমিতে আগাম আলু চাষ করেছেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, আগাম আলু চাষীরা এখন আতঙ্কে রয়েছেন। দিন দিন আলুর বাজার আরও কমছে। যশেঅর শহরের বড় বাজারে নতুন আলু বিক্রি হচ্ছে ২৫ টাকা কেজি দরে। মাঠ পর্যায়ে কৃষকের কাছ থেকে ব্যবসায়ীরা কিনছেন ১০ থেকে ১১ টাকা কেজি দরে। গত দুই দিনের তুলনায় বাজার আরও নিম্নমুখী হয়েছে। আগাম আলু চাষ করে এবার লোকসানে পড়তে হচ্ছে। বাংলাদেশ কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশন সূত্রে জানা যায়, সাধারণত নভেম্বরের মধ্যেই কোল্ড স্টোরেজগুলো খালি হয়ে যায়। তবে এবার জানুয়ারি শুরু হলেও এখনো প্রায় এক লাখ টন আলু হিমাগারে মজুদ রয়েছে। ১৫ ডিসেম্বরের পর থেকে আলুচাষি বা ব্যবসায়ীরা কোল্ড স্টোরেজ থেকে আলু তুলতে আসেননি। সে সময় যশোরের হিমাগারগুলোতে প্রায় ৫০ টন আলু মজুদ ছিল। রাজু আহম্মেদ নামের একজন ব্যবসায়ী জানান, ‘প্রতি বস্তায় সাধারণত ৫৫ কেজি আলু সংরক্ষণ করা হয়। আমি যশোরের আলী কোল্ড স্টোরেজে ৫ হাজার বস্তা আলু রেখেছিলাম। মৌসুমে ১৪ টাকা কেজি দরে কেনা ছিল। বস্তা, শ্রমিক, পরিবহনসহ অন্যান্য খরচ মিলে কেজি প্রতি আরও ৫ টাকা যুক্ত হয়। বস্তা প্রতি কোল্ড স্টোর ভাড়া ২৮০ টাকা। সব মিলিয়ে বস্তা প্রতি প্রায় সাড়ে ১২শ’ টাকা খরচ পড়ে। অথচ আমরা ৭০০-৭৫০ টাকার বেশি বিক্রি করতে পারিনি। এতে প্রতি বস্তায় ৫০০ টাকা লোকসান হচ্ছে। যশোরের আলী কোল্ড স্টোরেজের মালিক মো. শাহনেওয়াজ বলেন, ‘আমার স্টোরেজে সংরক্ষিত আলুর ৩০ ভাগ এখনও উত্তোলিত হয়নি। মালিকরাও আলু বের করে নিচ্ছেন না। নিজে বের করে বিক্রি করবো তার উপায় নেই, কারণ দাম নেই। যশোর বড় বাজারের আলুর আড়তদার নিউ বিসমিল্লাহ ভান্ডারের সত্ত্বাধিকারী মহিউদ্দীন মহিন জানান, ‘গতবার সারাদেশে আলুর উৎপাদন বেশি হওয়ায় বাজারে যোগান বেশি এবং দাম কম। এখনও অনেক পুরনো আলু খেকে গেছে। যেকারণে নতুন আলুর দাম মিলছেনা। বড় বাজারের মুদি দোকানী সাহা স্টোরের মালিক আশিষ কুমার দে জানান, আমরা নতুন আলু বিক্রি করছি ২৫ টাকা কেজিতে। আর পুরনো আলু বিক্রি হচ্ছে ১৬ টাকা কেজিতে। পুরনো আলু এখনও ক্লোডস্টোরে থাকায় নতুন আলুর দাম মিলছেনা। যশোরের সিনিয়র কৃষি বিপণন কর্মকর্তা কিশোর কুমার সাহা বলেন- ক্লোডস্টোরগুলোতে এখনও পুরনো আলু থাকায় বাজারে নতুন আলুর দাম পাচ্ছেনা চাষিরা। যশোর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোঃ মোশাররফ হোসেন বলেন-‘চলতি বছর আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় আলু চাষ ও উৎপাদন বেশি হয়েছে। এ বছর জেলার এক হাজার ৫শ’ ৫০ হেক্টর জমিতে আলু আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। আবাদ করা হয়েছে এক হাজার ৬০ হেক্টর জমিতে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৩৫ হাজার ৬৫০ মেট্রিক টন।’ তিনি আরও বলেন, কৃষক যদি তার উৎপাদিত ফসলের ন্যাষ্য মূল্য না পায় তাহলে তারা আগামীতে আলুর আবাদ কমিয়ে দিতে পারেন। আমরা কৃষকদের তালিকা তৈরি করে মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছি। তবে এখনও প্রণোদনার কাজ শুরু হয়নি। সংকট নিরসনে শুধুমাত্র আশ্বাসেই সীমাবদ্ধ সরকার গত বছর আলুচাষিরা লোকসানে পড়ায় এবার চাষাবাদ কমে যাওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছিল। এ পরিস্থিতিতে কৃষি মন্ত্রণালয় গত নভেম্বর থেকে আলুচাষিদের উৎসাহ দিতে প্রণোদনার ঘোষণা দেয়। গত দুই মাসে কৃষি উপদেষ্টা একাধিকবার গণমাধ্যমে এ প্রণোদনার কথা উল্লেখ করলেও এখনো যশোরে কৃষকরা কোনো প্রণোদনা বা ভর্তুকি পাননি। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে আলুচাষিদের জন্য ১৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ রয়েছে। অতিরিক্ত ভর্তুকি যুক্ত হলে মোট বরাদ্দ দাঁড়াবে ২৬০ কোটি টাকায়। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, ঘোষণা দিয়ে সময়মতো প্রণোদনা বা সুবিধা না দিলে উল্টো কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হন। কারণ কৃষকরা ইতোমধ্যে আলু চাষ সম্পন্ন করেছেন। আগে প্রণোদনা দেওয়া হলে আলু চাষে কৃষকদের উৎসাহ বাড়ত বলে তাদের মত। এ বিষয়ে বাংলাদেশ কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোস্তফা আজাদ চৌধুরী বলেন, গত ৩০ ডিসেম্বর কৃষি মন্ত্রণালয় তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছে এবং সেখানে আলুচাষীদের প্রণোদনা দেয়ার কথা বলা হয়েছে। তবে এখন প্রণোদনা দিলে এর সুফল কতটা মিলবে, তা নিয়ে তিনি প্রশ্ন তোলেন। তিনি বলেন, সেপ্টেম্বরেই তারা চিঠি দিয়ে সতর্ক করেছিলেন যে সময়মতো প্রণোদনা না দিলে চাষীরা লোকসানে পড়বেন। কিন্তু জানুয়ারি এসে গেলেও এখনো সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়নি। সার্বিক বিষয়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এস এম সোহরাব উদ্দিন বলেন, ‘আলুচাষিদের প্রণোদনা দেওয়ার প্রক্রিয়া অনেকদূর এগিয়েছে। শিগগিরই প্রণোদনা কার্যক্রম শুরু হবে। এখন প্রণোদনা দিলে কৃষকরা কতটা সুফল পাবেন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, যেসব চাষি গত বছর এবং এ বছর আলু চাষ করেছেন, তাদেরকে অগ্রাধিকার দেয়া হবে। এই প্রণোদনা মূলত গত বছর যারা লোকসানের শিকার হয়েছেন, তারা যেন কিছুটা ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে পারেন, সে উদ্দেশ্যেই দেয়া হবে।’

Ad for sale 100 x 870 Position (2)
Position (2)
Ad for sale 225 x 270 Position (3)
Position (3)
Ad for sale 225 x 270 Position (4)
Position (4)