ই-পেপার ফটোগ্যালারি আর্কাইভ মঙ্গলবার, ২৮ সেপ্টেম্বর , ২০২১ ● ১২ আশ্বিন ১৪২৮

মোচিকে এক কেজি চিনি উৎপাদনে খরচ ১৮২ টাকা

Published : Monday 30-August-2021 21:29:53 pm
এখন সময়: মঙ্গলবার, ২৮ সেপ্টেম্বর , ২০২১ ০৪:৩৬:১৮ am

জামির হোসেন, কালীগঞ্জ  : মিলগেটে এক কেজি চিনি বিক্রি হচ্ছে ৬৩ টাকা। সেই একই চিনি মিলগেটের বাইরে সাধারণ ব্যবসায়ীরা বিক্রি করছেন ৮০ টাকায়। মিলগেট থেকে বেরিয়ে মাত্র ২০ গজ দূরত্বে ১৭ টাকা পার্থক্যে বিক্রি হচ্ছে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম ভারী শিল্প প্রতিষ্ঠান মোবারকগঞ্জ সুগার মিলের উৎপাদিত চিনি। ফলে চিনির বাজার দিনে দিনে জনসাধারণের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। চিনির দাম আরো বাড়বে বলেও আশঙ্কা ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের। ফলে চিনির দাম বাড়লে চিনি সংশ্লিষ্ট খাদ্য পণ্যের দামও বাড়বে বলছেন ব্যবসায়ীরা।

মোবারকগঞ্জ সুগার মিল কর্মকর্তাদের সাথে কথা  বলে জানা গেছে, সর্বশেষ ২০২০-২০২১ আখ মাড়াই মৌসুমে ৬৩ টাকায় বিক্রিত এই এক কেজি চিনি উৎপাদন করতে খরচ হয়েছে ১৮২ টাকা। ১৮২ টাকার খরচায় উৎপাদিত এক কেজি চিনিতে ব্যাংক সুদ রয়েছে ৫৯ টাকা। আর সুদ বাদ দিয়ে এক কেজি চিনি উৎপাদন খরচ হয়েছে ১২৩ টাকা। এ মাড়াই মৌসুমে মিলটি চিনি উৎপাদন করে ৭ হাজার ৮৬২ মেট্রিক টন। এরমধ্যে মিল গোডাউনে এখনো অবিক্রিত রয়েছে ২ হাজার ৪৯৪ মেট্রিক টন। এই পরিমাণ চিনি উৎপাদন করতে মিলের লোকসান দিতে হয়েছে প্রায় ৭৬ কোটি টাকা। আর মোট এই লোকসানের মধ্যে অর্ধেকের বেশি ব্যাংক সুদ রয়েছে। যার পরিমাণ প্রায় ৪৫ কোটি টাকা।

এর আগের বছর ২০১৯-২০২০  আখ মাড়াই মৌসুমে এ লোকসানের পরিমাণ ছিল ৮৭ কোটি ২৪ লাখ টাকা। ফলে শেষ বছর ২০২০-২০২১ মৌসুমে লোকসানের পরিমাণ কমেছে প্রায় ১০ কোটি টাকা। ওই বছর এক কেজি চিনিতে উৎপাদন খরচা পড়েছিল ১৯৩.৫৮ টাকা। ওই বছর মিলগেটে চিনির বিক্রিত মূল্য ছিল ৬০ টাকা। এই ৬০ টাকায় বিক্রিত এক কেজি চিনি উৎপাদন করতে মিলটির সুদ গুণতে হয়েছিল ৬৯.৫৮ টাকা।

মিলের শেষ দুই মাড়াই মৌসুমের উৎপাদন খরচের চিত্রে দেখা গেছে, ২০১৯-২০২০ মাড়াই মৌসুম থেকে ২০২০-২০২১ মাড়াই মৌসুমে উৎপাদন খরচ কমেছে প্রায় ১০ কোটি টাকা। মিলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি বলছেন, লোকসান কমিয়ে লাভের মুখ দেখতে হলে কারখানার যন্ত্রপাতির অধুনিকায়ন, শূন্যপদে দক্ষ শ্রমিক নিয়োগ, সুদ মৌকুফ, আখের জাত উন্নয়ন ও বিকল্প শিল্প কারখানা গড়ে তুলতে পারলে মিলটি লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা যাবে। তাদের আশা সামনের বছরগুলোতে সমস্যা মোকাবেলা করেই লোকসানের পরিমাণ কমিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করবে মিলটি।

বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশন ২০২০-২০২১ মাড়াই মৌসুমে ছয়টি চিনিকলের মাড়াই বন্ধ ঘোষণা করে। বাকি  নয় সুগার মিলে চিনি উৎপাদন করে প্রায় ৪৫ হাজার মেট্রিক টন। যদিও চিনি উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ৬৫ হাজার মেট্রিক টন। উৎপাদিত চিনির মধ্যে সেনাবাহিনী ও ফায়ার সার্ভিসের মত প্রতিরক্ষা খাতের জন্য চাহিদা অনুযায়ী প্রায় ৩২ হাজার মেট্রিক টন চিনি বরাদ্দ দেয়া হয়। বাকি মাত্র ১৩ হাজার মেট্রিক টন চিনি অনুমোদিত ডিলারের মাধ্যমে দেশের বাজারে বিক্রি করা হচ্ছে।

এর আগে ২০১৮-১৯ মাড়াই মৌসুমে মিলটিকে এক কেজি চিনি উৎপাদন করতে ব্যাংক সুদ দিতে হয়েছিল ৭৮.১১ টাকা। ওই বছর মিলটি এক কেজি চিনি উৎপাদন করতে সুদ বাদে খরচ হয় ১৩৩.০৩ টাকা আর সূদসহ উৎপাদন ব্যয় হয় ২১১.১৪ টাকা। ২১১ টাকায় উৎপাদিত চিনি বাজারে বিক্রি হয়েছিল ৫৫ টাকায়। এভাবেই চলছে ১৯৬৫ সালে প্রতিষ্ঠি ঝিনাইদহের কালীগঞ্জে অবস্থিত ঐতিহ্যবাহি অন্যতম ভারি শিল্প প্রতিষ্ঠান মোবারকগঞ্জ সুগার মিলটি।

বর্তমানে মিলে ১১৮৪ পদের বিপরীতে কর্মকার্তা ও শ্রমিক কর্মচারী রয়েছে ৬৭৯ জন।

বছরের পর বছর ঐতিহ্যবাহী এ মিলটির মোটা অংকের লোকসানের কারণ খুঁজতে গিয়ে জানা যায়, মোটা অংকের ব্যাংক সূদ প্রদান ও মান্দাতার আমলের ম্যানুয়াল পদ্ধতির কারখানাকে লোকসানের জন্য প্রধানতম কারণ বলছেন মিলের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। এছাড়া আখের জাতের কারণে চিনি আহরণের হার কম হওয়ায় এই লোকসান বাড়ছে বলে মত শ্রমিকদের।

অন্যদিকে, চিনি উৎপাদনের সাথে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পর্যায়ের শ্রমিক মজুরি খরচ, আখ ক্রয়, মিলে অপরিষ্কার আখ সরবরাহ, পরিবহন খরচ, কারখানা মেরামত এবং বয়লারের জ্বালানিসহ প্রায় অর্ধশতাধিক খাতের খরচ মিটিয়ে প্রতি বছরই বাড়ছে চিনি উৎপাদন খরচের এই অংক। সে তুলনায় বাড়ছে না চিনির বিক্রয় মূল্য।

এদিকে চিনির বাজার নিয়ন্ত্রনের বাইরে চলে যাচ্ছে প্রসঙ্গে মোবারকগঞ্জ চিনিকলের তালিকাভুক্ত ডিলার ও বিশিষ্ট চিনি ব্যবসায়ী আব্দুল কাদের জানান, অল্প কিছুদিন হলো মিলগেট থেকে আমাদের চিনি দেওয়া বন্ধ রয়েছে। ফলে এখন বেসরকারী মিলের রিফাইনারী সাদা চিনি ৭৫ টাকা কেজি দরে বিক্রি করছি। যা বাজারে খুচরা বিক্রি হচ্ছে ৮০ টাকা কেজি। তবে সব ডিলারকে মিল থেকে অল্প অল্প করে চিনি দেবে বলে জেনেছি। তবে সে চিনি বাজার নিয়ন্ত্রণে কোন ভূমিকা রাখবে বলে মনে হয় না।

মোবারকগঞ্জ চিনিকল শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি ও শ্রমিক ফেডারেশনের আইন ও দরকষাকষি সম্পাদক গোলাম রসুল জানান, বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মুজিব বর্ষে সোনার বাংলা গড়ার ঘোষণা দিয়েছেন। সেই মুজিব বর্ষে একের পর এক রাষ্ট্রীয় কলকারখানা বন্ধ করে সোনার বাংলা গড়া সম্ভব নয়। একটি ষড়যন্ত্রকারী মহল বেসরকারি চিনি শিল্পের  মালিকদের এজেন্ট হয়ে কাজ করছে। তিনি আরো বলেন, দেশের ১৫ চিনিকল প্রতি বছর সরকারকে প্রায় ৮০০ কোটি টাকা ভ্যাট প্রদান করে। সেখানে এসব মিলে বিভিন্ন যৌক্তিক কারণে লোকসান হয় ২০০ কোটি টাকা। একটি মহল দেশীয় শিল্পকে ধ্বংস করে বিদেশীদের হাতে চিনির বাজার তুলে দিতেই এজেন্ডা নিয়ে এসব কাজ করছে বলে দাবি এই নেতার।

মোবারকগঞ্জ চিনিকলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোঃ মোশারফ হোসেন বলছেন, চিনির বাজার নিয়ন্ত্রণে আমাদের কিছু করার নেই। মূল্য নির্ধারণের বিষয়টি সম্পূর্ণ সরকারের। আমরা শুধু নির্দেশনা মোতাবেক কাজ করি।

মিলের লোকসান প্রসঙ্গে মি. মোশারফ আরো বলেন, পুরাতন যন্ত্রপাতি, কৃষক পর্যায়ে আখের মূল্য বৃদ্ধি, জনবল সংকট, শ্রমিক মজুরী বৃদ্ধি, দ্রব্য মূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও উৎপাদন ব্যয়ের সাথে সঙ্গতিহীন চিনির মূল্য নির্ধারনের ফলে লোকসান বাড়ছে। সাথে মোটা অংকের ব্যাংক ঋণের সুদ উৎপাদন খরচ বৃদ্ধির কারণ। তবে, উৎপাদন খরচ বেশি হলেও বাজার নিয়ন্ত্রণ এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় ও পুষ্টিকর এই খাদ্য পণ্যটি জনসাধারনে মধ্যে সহনীয় রাখতেই সরকার নির্ধারিত মূল্যে চিনি বিক্রি করছেন। তবে মিলটি লাভজনক করতে হলে চিনি উৎপাদনের সাথে সাথে বিকল্প শিল্প কারখানা গড়ে তুলতে হবে। দির্ঘদিনের জমে থাকা মোটা অঙ্কের সুদ মৌকুফ ও আখের জাত উন্নয়ন করতে হবে।

উল্লেখ্য, ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলা শহরে ১৯৬৫ সালে ৩ কোটি ৪৮ লাখ টাকা ব্যয়ে ২০৭.৯৩ একর নিজস্ব জমির উপর নেদারল্যান্ড সরকার মোবারকগঞ্জ চিনিকলটি স্থাপন করে। এরমধ্যে ২০.৬২ একর জমিতে কারখানা, ৩৮.২২ একর জমিতে কর্মকর্তা ও শ্রমিক-কর্মচারীদের জন্য আবাসিক কলোনী, ২৩.৯৮ একর পুকুর এবং ১০৭ একর জমিতে পরীক্ষামূলক ইক্ষু খামার। এছাড়া ১৮.১২ একর জমিতে জুড়ে রয়েছে সাবজোন অফিস ও আখ ক্রয় কেন্দ্র। প্রতিষ্ঠাকালীন মৌসুমে পরীক্ষামূলকভাবে ৬০ কর্মদিবস আখ মাড়াই চলে। লক্ষ্য পূরণ হওয়ায় ১৯৬৭-১৯৬৮ মাড়াই মৌসুম থেকে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে উৎপাদন শুরু করে। ঝিনাইদহের ৬ উপজেলা ছাড়াও যশোরের দু’টি উপজেলা নিয়ে গঠিত মিলে আটটি জোনের আওতায় চাষযোগ্য জমির পরিমাণ রয়েছে সাড়ে তিন লাখ একর। আখ ক্রয় কেন্দ্র রয়েছে ৪৮টি।