পুঁজিবাজারের ২৬ অভিভাবক সংসদে

বিনিয়োগকারীরা বলছেন, অর্থনীতির অন্যান্য খাতের ব্যাপক অগ্রগতি হলেও পিছিয়ে আছে পুঁজিবাজার। কিন্তু একদাশ জাতীয় সংসদে রয়েছে পুঁজিবাজারের এক ঝাঁক প্রতিনিধি। তাই প্রত্যাশাও বেড়েছে বিনিয়োগকারীদের।

নির্বাচনের কমিশনের তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, একাদশ সংসদ নির্বাচনে স্টক এক্সচেঞ্জের চেয়ারম্যান, পুঁজিবাজারের তালিকাভুক্ত কোম্পানির পরিচালক ও উপেদেষ্টা, সিকিউরিটিজ হাউসের মালিকসহ ২৬ জন সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন।

একে আবদুল মোমেন: চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) চেয়ারম্যান আবদুল মোমেন সিলেট-১ আসনে আওয়ামী লীগ থেকে নির্বাচিত হয়েছেন। তিনি এই প্রথম সংসদ নির্বাচন করছেন। অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের ছোট ভাইও তিনি।

চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) চেয়ারম্যান হিসাবে দায়িত্ব পালন করছেন।

সালমান এফ রহমান: সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-১ আসনে আওয়ামী লীগ থেকে নির্বাচিত হয়েছেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পরপরই যাত্রা শুরু করা বেক্সিমকো গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান সালমান ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি ছিলেন নব্বই দশকের মাঝামাঝিতে।

ওষুধ, সিরামিক, বস্ত্র, জ্বালানি, তথ্য প্রযুক্তি খাতের ব্যবসা রয়েছে এই গ্রুপের, রয়েছে গণমাধ্যমও। বেক্সিমকো গ্রুপের বেশ কয়েকটি কোম্পানি পুঁজিবাজারেও তালিকাভুক্ত।

২০০১ সালের নির্বাচনে এই আসনে নৌকার টিকেটে নির্বাচনে করে তার আত্মীয় তৎকালীন বিএনপি নেতা ব্যারিস্টার নাজমুল হুদার কাছে পরাজিত হন সালমান রহমান।

আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে আসার আগে নিজের গড়া “সমৃদ্ধ বাংলাদেশ আন্দোলন” থেকে ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে ধানমণ্ডি এলাকা থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেও জামানত হারিয়েছিলেন সালমান।

কাজী ফিরোজ রশিদ: ঢাকা-৬ আসনে নির্বাচিত জাতীয় পার্টির প্রার্থী কাজী ফিরোজ রশিদ ডিএসইর একজন সিনিয়র সদস্য। ব্রোকারেজ হাউজ কাজী ফিরোজ রশিদ সিকিউরিটিজ লিমিটেডের চেয়ারম্যান তিনি।

সাবের হোসেন চৌধুরী: ঢাকা-৯ আসনে আওয়ামী লীগ থেকে নির্বাচিত হয়েছেন সাবের হোসেন চৌধুরী। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে তিনি প্রথম সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। পরে ২০০৮ ও ২০১৪ এর নির্বাচনেও তিনি সংসদ সদস্য হোন।

বর্তমানে তিনি পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত জিএসপি ফাইন্যান্স বাংলাদেশ লিমিটেডের পরিচালক হিসেবে রয়েছেন।

আসাদুজ্জামান খান কামাল: ঢাকা-১২ আসন থেকে নির্বাচিত আওয়ামী লীগের প্রার্থী স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানি সাভার রিফ্র্যাক্টরিজের উদ্যোক্তা পরিচাকল।

ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন: চট্টগ্রাম-১ আসনে আওয়ামী লীগের নির্বাচিত প্রার্থী গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন চট্টগ্রামভিত্তিক হোটেল দ্য পেনিনসুলা চিটাগংয়ের উদ্যোক্তা।

আনিসুল ইসলাম: চট্টগ্রাম-৫ আসনে জাতীয় পার্টি থেকে নির্বাচিত প্রার্থী আনিসুল ইসলাম মাহমুদ শাশা ডেনিমস লিমিটেডের উদ্যোক্তা। বিদ্যুৎ খাতেও ব্যবসা সম্প্রসারণের চেষ্টা করছেন তারা।

মাঈনুদ্দিন খান বাদল: চট্টগ্রাম-৮ আসনে নির্বাচিত আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট থেকে জাসদের প্রার্থী মাঈনুদ্দিন খান বাদল পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানি সিভিও পেট্রোকেমিক্যালসের উপদেষ্টা। ব্যবসায় সংকট উত্তরণে কোম্পানিটিকে সহযোগিতা করে অনেক শেয়ারহোল্ডারের কাছে প্রিয় হয়েছেন তিনি।

সাইফুজ্জামান চৌধুরী: চট্টগ্রাম-১৩ আসনে নির্বাচিত আওয়ামী লীগের প্রার্থী সাইফুজ্জামান চৌধুরীর পারিবারিক ব্যবসা আরামিট গ্রুপ। এর মধ্যে আরামিট লিমিটেড ও আরামিট সিমেন্ট পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত। উদ্যোক্তা পরিবার হিসেবে বর্তমানে ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকেরও নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতে।

সেলিমা আহমাদ মেরি: নিটল নিলয় গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান সেলিমা আহমাদ কুমিল্লা-২ আসন থেকে আওয়ামী লীগ হিসাবে নির্বাচিত হয়েছেন। নিটল নিলয় গ্রুপের দুটি প্রতিষ্ঠান নিটল ইন্স্যুরেন্স ও নিলয় সিমেন্ট পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত রয়েছে।

ইউসুফ আব্দুল্লাহ হারুন: তিনি কুমিল্লা-৩ আসনে আওয়ামী লীগ থেকে নির্বাচিত হয়েছেন। ২০১৪ সালে আওয়ামী লীগ থেকে মনোয়ন পেয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন।

বর্তমানে তিনি পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত এশিয়া ইন্স্যুরেন্সের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এছাড়া তিনি সাউথইস্ট ব্যাংকের উদ্যোক্তা হিসেবে রয়েছেন। ব্যাংকটির উদ্যোক্তা পরিচালক এবং চেয়ারম্যান হিসেবে এবং ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) পরিচালক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছিলেন।

তাজুল ইসলাম: কুমিল্লা-৯ আসনে নির্বাচিত হয়েছেন আওয়ামী লীগ প্রার্থী তাজুল ইসলাম। তিনি পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত যমুনা ব্যাংকের পরিচালক।  

আ হ ম মোস্তফা কামাল: কুমিল্লা-১০ আসন থেকে আওয়ামী লীগের নির্বাচিত প্রার্থী পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মোস্তফা কামাল পুঁজিবাজারের কোম্পানি সিএমসি কামালের উদ্যোক্তা। পুঁজিবাজার নিয়ে সৎ সাহসী ও বাস্তবধর্মী মন্তব্য করে অনেক বিনিয়োগকারীর কাছে আলাদাভাবে পরিচিত হয়েছেন তিনি। অবশ্য মন্ত্রণালয়ে মনোযোগ বাড়াতে তিনি কয়েক বছর আগে আলিফ গ্রুপের কাছে কোম্পানির দায়িত্ব ছেড়ে দেন। এরপর নতুন পর্ষদ কোম্পানিটির নাম পরিবর্তন করে রাখে আলিফ ম্যানুফ্যাকচারিং।

এবাদুল করিম বুলবুল: পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত বিকন ফার্মার ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং কোহিনূর কেমিক্যালের পরিচালক এবাদুল করিম ব্রাক্ষণবাড়ীয়া-৫ আসন থেকে আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীক নিয়ে নির্বাচিত হয়েছেন।

আহসানুল ইসলাম টিটু: টাঙ্গাইল-৬ আসনে আওয়ামী লীগ থেকে জয়লাভ করেছেন ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) সাবেক সভাপতি আহসানুল ইসলাম টিটু। তিনি ব্রোকারেজ হাউজ মোনা ফিন্যান্সিয়াল কনসালট্যান্সি অ্যান্ড সিকিউরিটিজ লিমিটেডের চেয়ারম্যান। তাছাড়া মোনা গ্রুপ অব কোম্পানিজ তাদের পারিবারিক ব্যবসা। তিনটি তালিকাভুক্ত কোম্পানি সন্ধানী লাইফ ইন্স্যুরেন্স, পূরবী জেনারেল ইন্স্যুরেন্স ও শমরিতা হাসপাতালের মালিকানায় রয়েছেন তিনি।

নাঈমুর রহমান দুর্জয়: মানিকগঞ্জ-১ আসন থেকে আওয়ামী লীগ থেকে নির্বাচিত হয়েছেন বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক নাঈমুর রহমান দুর্জয়। তিনি পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানি ফু-ওয়াং ফুডস লিমিটেডের সাবেক চেয়ারম্যান। হঠাৎ কোম্পানিটির শেয়ারের দাম বেড়ে যাওয়ার পর সাম্প্রতিক বছরগুলোয় বিনিয়োগকারীদের নজরে আসেন তিনি।

গোলাম দস্তগীর: নারায়ণগঞ্জ-১ আসনে নির্বাচিত আওয়ামী লীগের প্রার্থী গোলাম দস্তগীর গাজী যমুনা ব্যাংকের পরিচালক। এর বাইরে তার মূল ব্যবসা গাজী গ্রুপের কোনো প্রতিষ্ঠান এখনো পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয়নি।

ফারুক খান: গোপালগঞ্জ-১ আসনে আওয়ামী লীগ থেকে নির্বাচিত ফারুক খানের পারিবারিক প্রতিষ্ঠান সামিট পাওয়ার।

মোরশেদ আলম: নোয়াখালী-২ আসনে নির্বাচিত আওয়ামী লীগের প্রার্থী মোরশেদ আলম পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানি বেঙ্গল উইন্ডসর থার্মোপ্লাস্টিকের উদ্যোক্তা ও চেয়ারম্যান। এছাড়া ন্যাশনাল লাইফ ও মার্কেন্টাইল ব্যাংকেরও উদ্যোক্তা তিনি।

আবদুল মান্নান: লক্ষ্মীপুর-৪ আসনে নৌকা প্রতীক নিয়ে বিজয়ী হয়েছেন একসময় আওয়ামীবিরোধী জোটের অন্যতম নেতা মেজর (অব.) আবদুল মান্নান। তিনি ব্যাংক-বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিআইএফসির মূল উদ্যোক্তা।

আবদুস সালাম মূর্শেদী: খুলনা-৪ আসনে আওয়ামী লীগ থেকে নির্বাচিত হয়েছেন আবদুস সালাম মূর্শেদী। আড়াই মাস আগে তিনি এই আসনে উপ-নির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন এই শিল্পপতি। খুলনা জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এস এম মোস্তফা রশিদী সুজা গত ২৫ জুলাই মারা গেলে খুলনা-৪ (রূপসা-দিঘলিয়া-তেরখাদা) আসনটি শূন্য হয়। সেপ্টেম্বরের উপ-নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হন সালাম মূর্শেদী । আর কোনো প্রার্থী না থাকায় ফাঁকা মাঠেই গোল দেন বাংলাদেশ জাতীয় দলের সাবেক এই ফুটবলার।

পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত এনভয় টেক্সটাইলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

একেএম এনামুল হক শামীম: পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ন্যাশনাল ব্যাংকের স্বতন্ত্র পরিচালক এনামুল হক শামীম শরিয়তপুর-২ আসনে আওয়ামী লীগ থেকে নির্বাচিত হয়েছেন। এবারই তিনি প্রথম মনোয়ন পেলেন।

কাজী নাবিল আহমেদ: জেমিনি সি ফুডের পরিচালক কাজী নাবিল যশোর-৩ আসনে আওয়ামী লীগ থেকে নির্বাচিত হয়েছেন।

মঞ্জুর হোসেন: ফরিদপুর-১ আসনে নির্বাচিত হয়েছেন সাবেক সচিব ও বর্তমানে রূপালী ব্যাংকের চেয়ারম্যান মঞ্জুর হোসেন।

তাহজিব আলম সিদ্দিকী: ঝিনাইদহ-২ আসনে আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীক নিয়ে নির্বাচিত হয়েছেন তাহজীব আলম সিদ্দিকী। ২০১৪ সালে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে আনারস প্রতীক নিয়ে নৌকার প্রার্থীকে হারিয়ে প্রথমবারের মতো সংসদ নির্বাচিত সদস্য হন তাহজীব। তিনি ডোরিন পাওয়ারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক।

মোজাফ্ফর হোসেন: জামালপুর-৫ সদর আসন থেকে আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীক নিয়ে নির্বাচিত হয়েছেন ইঞ্জি. মোজাফ্ফর হোসেন। তিনি পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত মোজাফ্ফর হোসেন স্পিনিং মিলস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক।