গুলশান হামলার আগে ৩৯ লাখ টাকা পাঠায় রিপন

স্পন্দন নিউজ ডেস্ক :
গুলশান হামলার আগে ৩৯ লাখ টাকা পাঠায় রিপন

গুলশানের হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয় জঙ্গি হামলার বিচারকাজ শুরু হওয়ার পর কারাগারে থাকা নব্য জেএমবির সদস্যদের ছিনিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করেছিল নিষিদ্ধ এই সংগঠনটির অন্যতম সুরা সদস্য মো. মামুনুর রশিদ ওরফে রিপন ওরফে রেজাউল করিম ওরফে আবু মুহাজির।

রোববার দুপুরে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে র‍্যাবের মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক মুফতি মাহমুদ খান।

এর আগে শনিবার রাতে গোপন তথ্যের ভিত্তিতে গাজীপুর জেলার বোর্ড বাজার এলাকায় অভিযান চালিয়ে গুলশানের হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয় হামলার চার্জশিটভুক্ত আসামি মামুনুর রশিদ রিপনকে গ্রেফতার করে র‍্যাব-৩। তার কাছ থেকে নগদ ১ লাখ ৪৭ হাজার ৭৫৫ টাকা উদ্ধার করা হয়।

রিপন গুলশান হামলায় অর্থ, অস্ত্র ও বিস্ফোরক সরবরাহকারী হিসেবে কাজ করেছিলেন বলে দাবি করেছে র‍্যাব।

মুফতি মাহমুদ খান বলেন, ২০১৪ সালে ময়মনসিংহের ত্রিশালে প্রিজন ভ্যানে হামলা চালিয়ে জেএমবির তিন নেতাকে ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছিল। ঠিক তেমনই ঘটনা ঘটিয়ে জঙ্গিদের উজ্জীবিত করার পরিকল্পনা ছিল মামুনুর রশিদ রিপনের। মূলত হলি আর্টিজান মামলার চার্জশিটভুক্ত আসামিদের ছিনিয়ে নেয়ার পরিকল্পনা ছিল তাদের।

কে এই শীর্ষ জঙ্গি রিপন:

র‍্যাবের এই কর্মকর্তা বলেন, রিপন ১৯৮৮ সালে বগুড়া জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। তার শিক্ষা জীবন শুরু হয় স্থানীয় একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তির মাধ্যমে। সেখানে সে ৩য় শ্রেণি পর্যন্ত অধ্যায়ন করে। পরবর্তীতে তার বাবা তাকে মাদ্রাসায় ভর্তি করিয়ে দেন।

রিপন ঢাকার মিরপুর, বগুড়ার নন্দীগ্রাম ও নওগাঁর বিভিন্ন মাদ্রসায় অধ্যয়ন করেন।

সর্বশেষ তিনি ২০০৯ সালে চাপাইনবাবগঞ্জের মাদ্রাসাতুল দারুল হাদিস হতে দাওরা-ই হাদিস সম্পন্ন করে। তিনি বগুড়ার সাইবার টেক নামক একটি কম্পিউটার প্রশিক্ষণ কেন্দ্র থেকে অফিস এ্যাপ্লিকেশন কোর্স সম্পন্ন করে ওই প্রতিষ্ঠানে চাকরি শুরু করেন।

নব্য জেএমবিতে যেভাবে রিপন:

রিপন ২০১৩ সালে বগুড়ায় সাইবার টেকে চাকরিরত অবস্থায় পূর্ব পরিচিত ডা. নজরুলের মাধ্যমে সংগঠনটিতে জড়িয়ে পড়েন। প্রাথমিকভাবে তার দায়িত্ব ছিল ইয়ানত (চাঁদা) সংগ্রহ করে নজরুলের কাছে পৌঁছে দেয়া।

নজরুল সে সময় জেএমবির একাংশের আমির ছিলেন। আর তার আস্থাভাজন হিসেবে অল্প সময়ের মধ্যেই জেএমবির ওই অংশের সেকেন্ড ইন কমান্ড হন রিপন।

এক পর্যায়ে জেএমবির নবনিযুক্ত আমির হিসেবে সারোয়ার জাহান সংগঠনের জন্য নতুন করে অর্থ সংগ্রহ ও দাওয়াতী কার্যক্রম বেগবান করার উদ্যোগ নেন। তখন রিপন তার দায়িত্বধীন এলাকায় বিকাশের দোকান লুট করে ৬ লাখ টাকা, সিগারেট বিক্রেতা থেকে ছিনতাই করে ১ লাখ টাকা এবং গাইবান্ধায় অপর এক ঘটনায় ১ লাখ টাকাসহ মোট ৮ লাখ টাকা সারোয়ার জাহানের কাছে পৌঁছে দেয়া হয়।

সারোয়ার জাহানের মাধ্যমেই জঙ্গিদের অন্যতম পৃষ্ঠপোষক ও মদদদাতা জঙ্গি আব্দুল্লাহর সাথে রিপনের পরিচয় হয়। ২০১৫ সালের মাঝামাঝিতে তামীম চৌধুরী ও সারোয়ার জাহানের গোপন বৈঠকের মাধ্যমে সমঝোতার ভিত্তিতে স্মারকপত্র প্রস্তুত করা হয়। ওই সমঝোতার ভিত্তিতে সারোয়ার জাহানকে আমির নির্বাচিত করা হয়। তার সাংগঠনিক নাম দেওয়া হয় শায়খ আবু ইব্রাহিম আল হানিফ। ওই বৈঠকে জেএমবি সদস্য সাদ্দাম ওরফে কামাল, শরিফুল ওরফে রাহাত ও রিপনসহ আরও কয়েকজন উপস্থিত ছিলেন। তার মধ্যে মামুনুর রশীদ রিপন সুরা সদস্য নির্বাচিত হন।

গুলশান হামলার আগে ৩৯ লাখ টাকা পাঠায় রিপন:

জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে র‍্যাব আরো জানায়, রিপনের দায়িত্ব ছিল অর্থ সংগ্রহ করা, সামরিক প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা করা এবং অস্ত্র ও বিস্ফোরণ সরবরাহ করা। সুরা সদস্যরা জঙ্গি হামলার পরিকল্পনার সাথে যুক্ত থাকতেন।

সংগঠনের সিদ্ধান্তে রিপনের নেতৃত্বে একটি দল ২০১৬ সালের এপ্রিল মাসে পার্শ্ববর্তী দেশে গিয়েছিল অর্থ, অস্ত্র ও বিস্ফোরক সংগ্রহ করতে। হলি আর্টিজান হামলার আগে রিপন প্রায় ৩৯ লাখ টাকা সারোয়ার জাহানকে পাঠিয়েছিল। রিপন ওই হামলার পরিকল্পনা ও অস্ত্র সরবরাহের সাথেও যুক্ত ছিলেন।

এছাড়া উত্তরাঞ্চলের বেশ কয়েকটি জঙ্গি হামলা রিপনের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে সংগঠিত হয়েছে। আর এসব হামলার নেতৃত্বে ছিলেন শীর্ষ জঙ্গি রাজীব গান্ধী। বিভিন্ন হামলার আগে জেএমবির সদস্যরা মহড়া করে অনুশীলন করতেন। এ ধরনের একটি অনুশীলন মহড়া চলাকালীন সময়ে দুর্ঘটনায় ২০১৬ সালের এপ্রিল মাসে বগুড়ায় সুরা সদস্য ফারদিন ও সদস্য তারিকুল ইসলাম জুয়েল নিহত হন বলেও র‍্যাবকে জানিয়েছে রিপন।

গুলশান হামলার আগের দিন বারিধারায় জঙ্গিদের মিটিং

হলি আর্টিজান হামলার ষড়যন্ত্র ও পরিকল্পনার বিষয়ে মুফতি মাহমুদ বলেন, ২০১৫ সালে গাইবান্ধায় মিটিং করে জেএমবি। ২০১৬ সালে ফেব্রুয়ারিতে হলি আর্টিজান হামলার পরিকল্পনা করে তারা। রিপন হামলার জন্য তিনটি একে টু, একটি পিস্তল সরবরাহ করেছিল। জঙ্গি মারজানের মাধ্যমে সরোয়ার জাহানকে এসব পাঠায় রিপন। হলি আর্টিজান হামলার আগের দিন বারিধারায় মিটিং করেছিল জঙ্গিরা।

মুফতি মাহমুদ খান বলেন, হলি আর্টিজান হামলার পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানের মুখে রিপন ভারতে আত্মগোপনে চলে যায়। সেখান থেকেই জেএমবিকে সুসংগঠিত করার চেষ্টা করতে থাকে। ২০১৮ সালের শুরুর দিকে আবারও বাংলাদেশে ফিরে আসে রিপন। সম্প্রতি তারা ঢাকা ও চট্টগ্রামের বিভন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলার পরিকল্পনা করেছিল।