পৃথিবীর অর্ধেক মানুষের মোট সম্পদ ২৬ ধনীর সম্পদের সমান

এমন আরও অবিশ্বাস্য সব পরিসংখ্যান উঠে এসেছে আন্তর্জাতিক স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা অক্সফামের সমীক্ষায়।

প্রতিবেদনটির উদ্ধৃতি দিয়ে কাতারের আলজাজিরা জানায়, ২০০৮ সালে বিশ্বব্যাপী অর্থ সংকট দেখা দেয়ার পর থেকে পৃথিবীতে বিলিয়ওনেয়ার অর্থাৎ, শতকোটি ডলারের মালিকদের সংখ্যা দ্বিগুণ হয়েছে। একত্রিতভাবে তাদের মোট সম্পদ প্রতিদিন ২.৫ বিলিয়ন বা ২৫০ কোটি ডলার হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। অন্যদিকে বিশ্বের মোট জনসংখ্যার দরিদ্রতম অর্ধেকের সম্পদ গত বছর ১১ শতাংশ কমে গেছে।

২০১৮ সালে বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ২৬ জন ব্যক্তির সম্পদের পরিমাণ পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার অর্ধেকের সম্পদের সমান। পৃথিবীর সব মানুষের প্রায় অর্ধেক এই দরিদ্রতম জনগোষ্ঠী জীবন যাপনের জন্য দিনে ৫.৫ ডলারেরও কম খরচ করতে পারে।

অক্সফামের প্রতিবেদনে সম্পদের বণ্টনের বৈষম্য তুলে ধরতে ভারতের উদাহরন ব্যবহার করা হয়।

ভারতের আনন্দবাজার পত্রিকা জানায়, দেশটির সমীক্ষায় দেখা যায়, ২০১৮ সালে ভারতের এক শতাংশ ধনীর প্রতিদিনের আয় বেড়ে হয়েছে ২২০০ কোটি অর্থাৎ ২২০০,০০,০০,০০০ টাকা। দেশের কোটিপতিদের সম্পত্তি বেড়েছে ৩৯ শতাংশ। অন্য দিকে আয় সূচকের নীচের দিকে থাকা দেশের অর্ধেক জনসংখ্যার আয় বেড়েছে মাত্র ৩ শতাংশ।

ভারতের ১ শতাংশ ধনী ব্যক্তির হাতেই রয়েছে ৫১.৫৩ শতাংশ জাতীয় সম্পদ। আবার ১০ শতাংশ ধনীর হাতেই রয়েছে দেশের মোট সম্পদের ৭৭.৪ শতাংশ। সেখানে অর্থনীতির সূচকের নীচের দিকে থাকা ৬০ শতাংশ জনসংখ্যার হাতে রয়েছে মাত্র ৪.৮ শতাংশ জাতীয় সম্পদ। আবার দেশের মাত্র ৯ জন ধনীর সম্পত্তির পরিমাণই দেশের ৫০ শতাংশ জনসংখ্যার মোট সম্পদের সমান।

অর্থনীতির এই বৈষম্য স্পষ্ট করে বোঝাতে ভারতের ক্ষেত্রে উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে মুকেশ আম্বানীকে। রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে, কেন্দ্র ও রাজ্য মিলিয়ে চিকিৎসা, স্বাস্থ্য ও পরিচ্ছন্নতা খাতের মোট ব্যয় বরাদ্দ ২ কোটি ৮ লক্ষ ১৬৬ কোটি রুপি। সেখানে মুকেশ আম্বানীর সম্পত্তির পরিমাণ প্রায় ২ কোটি ৮০ লক্ষ কোটি রুপি। আরও উল্লেখযোগ্য হলো, যদি ভারতের এক শতাংশ ধনী ব্যক্তি তাদের সম্পত্তির উপর  মাত্র ০.৫ শতাংশ অতিরিক্ত কর দেয়, তাহলে দেশের চিকিৎসা ও স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় বরাদ্দ ৫০ শতাংশ বাড়ানো সম্ভব।

আবার গোটা বিশ্বের নিরিখে উদাহরণ দেওয়া হয়েছে আমাজনের। ২০১৮ সালে সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা জেফ বেজোসের আয় বেড়ে হয়েছে ১১ হাজার ২০০ কোটি মার্কিন ডলার। তার আয়ের মাত্র এক শতাংশের সমান ইথিওপিয়ার স্বাস্থ্য খাতের বাজেট বরাদ্দ। যেখানে জনসংখ্যা প্রায় সাড়ে ১১ কোটি।

আর এই নিয়েই উৎকণ্ঠা প্রকাশ করেছে অক্সফাম। ‘ভারতের এই আর্থিক বৈষম্য তীব্র উদ্বেগের’ মন্তব্য অক্সফ্যামের ইন্টারন্যাশনাল এগজিকিউটিভ ডিরেক্টর উইনি বায়ানিমার। তিনি বলেন, ‘দেশের এক শতাংশ ধনী ব্যক্তির সঙ্গে বাকি জনসংখ্যার আয় এবং সম্পত্তির ব্যবধান কমাতে না পারলে এবং ভারসাম্য আনতে না পারলে গোটা অর্থনৈতিক, সামাজিক ও গণতান্ত্রিক কাঠামোই ভেঙে পড়বে।’

অক্সফ্যামের ভারতের সিইও অমিতাভ বেহার আরও স্পষ্ট করেছেন বিষয়টি। ‘সমীক্ষা রিপোর্টে এটা স্পষ্ট, ধনী-গরিবের পার্থক্য কতটা। অর্থাৎ আর্থিক বৈষম্য কতটা প্রকট। সরকার এক দিকে চিকিৎসা, শিক্ষা, স্বাস্থ্যের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে বরাদ্দ কমাচ্ছে, অন্য দিকে ধনীদের কর কমিয়ে বা ছাড় দিয়ে বৈষম্য আরও বাড়িয়ে তুলছে। আর সেই বোঝা চাপছে গরিব ও নিম্নশ্রেণির গরিব-মধ্যবিত্ত মানুষের উপর।’, বলছেন অমিতাভ বেহার।

তার মতে, অর্থনীতির এই বৈষম্যের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ে মহিলা ও শিশুদের উপর।

সারা বিশ্বের নিরিখে ধনীতম অংশের সম্পত্তি বৃদ্ধির হার ১২ শতাংশ। বিশ্বের মোট জনসংখ্যার গরিব অর্ধেকের আয় কমেছে ১১ শতাংশ।

সমীক্ষায় উঠে আসা ভারতের গত ১৫ বছরের ছবিটা আরও ভয়াবহ।

দেশের জনসংখ্যার মধ্যে ১৩ কোটি ৬০ লক্ষ যারা সবচেয়ে গরিব ১০ শতাংশ, তারা ২০০৪ সাল থেকে ঋণের জালে ডুবে আছেন।

সুইৎজারল্যান্ডের স্কি রিসর্ট শহরে আজ সোমবার থেকেই শুরু হয়েছে ওয়ার্ল্ড ইকনমিক ফোরাম (ডব্লিউইএফ)। তার আগে বার্ষিক সমীক্ষা রিপোর্ট প্রকাশ করেছে অক্সফাম। মূলত কোনও নির্দিষ্ট দেশে এবং সারা বিশ্বে আর্থিক বৈষম্য কতটা, তা নিয়ে প্রতি বছরই এই সমীক্ষা করে অক্সফাম। এই বৈষম্যের আশু বিপদ এবং তার মোকাবিলা কী ভাবে করা যায়, তা নিয়েও আলোকপাত করে এই সংস্থা।

অক্সফামের দাবি, সমীক্ষার ক্ষেত্রে সর্বসমক্ষে পাওয়া সর্বশেষ সরকারি তথ্যগুলি বিশ্লেষণ করা হয়েছে। তার মধ্যে রয়েছে ক্রেডিট সুইস ওয়েল্থ ডেটাবুক, ফোর্বসের বিলিয়নেয়ার্স লিস্টের মতো রিপোর্ট বা তথ্য।