কালীগঞ্জে চার জমজ সন্তান নিয়ে দুঃশ্চিন্তায় বাবা-মা

জামির হোসেন, কালীগঞ্জ (ঝিনাইদহ)>
শত কষ্টের মাঝেও সারাক্ষণ বাড়িতে যেন উৎসবের আমেজ। পদ্মা, মেঘনা, যমুনা ও সাগরকে নিয়ে বিরাজ করছে এই উৎসবমূখর পরিবেশ। নানীর কোলে যমুনা, খালা নিয়ে বসে আছেন পদ্মাকে, মায়ের কোলে আছে মেঘনা আর আরেক নানীর কোলে সাগর। চলছে তাদের সেবা যতœ। কোনো কিছুরই কমতি নেই। কালীগঞ্জের মিরা খাতুনের গর্ভে একই সঙ্গে জন্ম নেওয়া এই ৪ টি সন্তান যেন ঘর আলো করে আছে। কিন্তু দরিদ্র পরিবারটিতে এই জমজ ৪ সন্তানের লালন পালন খরচ যোগানো নিয়ে তাদের দুঃশ্চিন্তার শেষ নেই। ওই ৪ শিশুর জন্য প্রতিদিন দুধ আর ওষুধ মিলিয়ে প্রয়োজন হাজার টাকার, যা তার নানা দিনমজুর অলিয়ার রহমানের পক্ষে শিশু চারটির খরচ জোগাড় করা কোনো ভাবেই সম্ভব হচ্ছে না।
শিশুদের বাবা কালীগঞ্জ উপজেলার গোবরডাঙ্গা গ্রামের মাহবুবুর রহমান সবুজ জানান, তিনি একটি বেসরকারি কোম্পানিতে মাত্র ৮ হাজার টাকা বেতনে কাজ করেন। তা দিয়ে কোনো রকমে সংসার চলে পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা নামে ৩ কন্যা ও ১ পুত্র সাগরসহ ৪ জমজ সন্তানের জনকের। তার স্ত্রী একই উপজেলার তেলকুপ গ্রামের অলিয়ার রহমানের একমাত্র কন্যা মিরা বেগম (২২) গত ২৩ নভেম্বর একই সাথে যশোরের একটি ক্লিনিকে ৪ সন্তানের জন্ম দেন। সুস্থ অবস্থায় বর্তমানে মা আর শিশুরা তেলকুপ গ্রামেই অবস্থান করছে।
তেলকুপ গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, অলিয়ার রহমানের বাড়িতে যেন সবসময়ই উৎসবের আমেজ। নানী বিনা বেগম শিশু যমুনা শরীরে তেল মালিশ করছেন। খালা মিনা বেগম শিশু পদ্মাকে কোলে নিয়ে পায়চারী করে চলেছেন। মা মিরা বেগম শিশু মেঘনাকে কোলে নিয়ে বসে আছেন। আরেক নানী তাসলিমা বেগম শিশু সাগরকে কোলে নিয়ে কান্না থামাবার চেষ্টা করছেন। ফ্লাক্সে গরম পানি নিয়ে এসেছেন অজপা বেগম। দুধ তৈরি করে সবাইকে খাওয়াতে হবে। বাড়িতে এ সময় উপস্থিত আছেন আরো ৫/৬ জন যারা শিশুদের দেখতে এসেছেন।
মা মিরা বেগম জানান, ২০১৭ সালের ১৮ জানুয়ারি তাদের বিয়ে হয়। বিয়ের পর প্রথম সন্তান গর্ভে আসলে তারা স্বামী-স্ত্রী খুবই খুশি ছিলেন। মাঝে মধ্যেই দু’জন পরিকল্পনা করতেন কি নাম রাখবেন। ছেলে বা মেয়ে হলে কি বানাবেন। এভাবে ৩ মাস কেটে যাবার পর তার শরীর দ্রুত বাড়তে থাকায় একদিন চিকিৎসকের কাছে যান তারা। চিকিৎসকেরা পরীক্ষা করে জানান, মিরা বেগম একসঙ্গে তিনটি শিশুর জন্ম দেবে। চিকিৎসকের এই কথায় তারা হতবাক হয়ে পড়েন। কিছুদিন পর আবারো পরীক্ষা করে জানান, তিনটি নয় শিশু জন্ম নেবে ৪ টি। তখন আরো বাড়তি দুঃশ্চিন্তা বেড়ে যায়। এই পরিস্থিতিতে শিশুরা বাঁচবে কিনা, তার (মা) কোনো ক্ষতি হবে কিনা এই চিন্তার মধ্যেই দিন কাটতে থাকে তাদের। এক সময় ২০১৮ সালের ২৩ নভেম্বর চারটি শিশুর জন্ম হয়। প্রথম দিকে শিশুরা একটু বেশি হালকা থাকলেও বর্তমানে স্বাভাবিক হয়ে এসেছে। মিরা আরো জানায়, এখন তার সন্তানদের দেখাশুনা করার জন্য বাড়িতে সব সময় লোকজন ডাকতে হচ্ছে। শিশুদের নানী-খালারা এসে সময় দিচ্ছে। রাতে ৪ জন চারটি শিশু নিয়ে ঘুমান। তবে মা হিসেবে তাকে সবগুলোর দেখভাল করতে হয়। তবে শিশুদের কাউকে দত্তক দেওয়ার ইচ্ছা আছে কিনা জানতে চাইলে মিরা জানান, গর্ভের সন্তান কখনও কাউকে দেওয়া যায়?
মিরা বেগমের মা বিনা বেগম জানান, তার স্বামী অলিয়ার রহমান অন্যের জমিকে কৃষি শ্রমিকের কাজ করেন। এই কাজ করেই তাদের কোনো রকমে সংসার চলে। মাঠে তাদের চাষযোগ্য কোনো জমি নেই। এই বাচ্চাদের বর্তমানে প্রতিদিন ৭ শত টাকার কৌটার দুধ প্রয়োজন হয়। এছাড়াও ঔষধ সহ আরো ৩ শত টাকা লাগে। তাছাড়া বাড়িতে সারাক্ষন বাড়তি লোকজন থাকায় খরচও বেড়েছে। তাই চিন্তা বাচ্চাদের বাঁচিয়ে রাখবেন কিভাবে।