বিশ্ববিদ্যালয়ে থিসিস-ননথিসিসের গ্যাড়াকল ভাঙবে কবে ?

গত বছরের শেষে জাপানে উচ্চশিক্ষা নিতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এক শিক্ষার্থী এসেছেন। সপ্তাহ দুয়েক পর ওই শিক্ষার্থী আমাকে ফোন দিয়ে জিজ্ঞাসা করছে, “ভাইয়া আমার ভর্তি পরীক্ষার জন্য আমাকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার থিসিসের উপর একটি উপস্থাপনা দিতে বলেছে, কিন্তু আমার তো কোনও থিসিস নেই, আমি তো কোনও প্রেজেন্টেশন দিতে পারছি না। অধ্যাপককে কিছুতেই বোঝাতে পারছি না যে, আমি নন-থিসিস গ্রুপের ছাত্র ছিলাম। শুধু স্নাতকের ফলাফল বিভাগের স্ব-ঘোষিত নিয়মের চেয়ে কম হওয়ার কারণে আমি থিসিস করতে পারিনি।”

বিষয়টি আমি শোনার পর তাকে কী উত্তর দেব ভেবে পাইনি। বেকায়দায় পড়ে ওই ছেলেটি তার অন্য এক সহপাঠীর থিসিস নিজের বলে প্রেজেন্টশন দিয়ে এই যাত্রায় রক্ষা পেয়েছে।

শুধু এই ছেলেটি নয়, তার মতো অনেক শিক্ষার্থীরই বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন ভূ-লুণ্ঠিত হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভাগের শিক্ষকদের সিদ্ধান্তের কারণে।

দেশের বাইরে যারা পিএইচডি করতে চান, তাদের জন্য স্নাতকোত্তর পর্যায়ে গবেষণা করার অভিজ্ঞতা থাকা বাধ্যতামূলক। আর এই গবেষণার সুযোগ মেলে মাস্টার্স ভর্তি হওয়ার পর।

কিন্তু অবাক করার বিষয় হলো, মাস্টার্স ওঠার পর আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে দীর্ঘদিন থেকে দুইটি গ্রুপে শিক্ষার্থীদেরকে বিভক্ত করা হয়ে আসছে। যারা গবেষণা করার সুযোগ পান কিংবা ইচ্ছা পোষণ করেন, তারা যান থিসিস বা গবেষণা গ্রুপে। আর অন্য দল যায় তাত্ত্বিক গ্রুপে বা নন-থিসিস গ্রুপে।

আর এই থিসিস গ্রুপে কারা যাবেন আর কারা যাবেন না, তা নির্ধারণ করা হচ্ছে স্নাতকের ফলাফলের ভিত্তিতে। যার সিদ্ধান্তটা আসছে স্রেফ বিভাগগুলোর শিক্ষকদের মতামতের উপর নির্ভর করে।

কোনও একজন শিক্ষার্থীর গবেষণায় প্রবল আগ্রহ  থাকলেও নিছক এই ফলাফলের গ্যাড়াকলে পড়ে তার স্বপ্নটা সেখানে অধরা থেকে যাচ্ছে। আবার অনেকে গবেষণা করতে ইচ্ছুক নন, তা সত্ত্বেও শিক্ষকদের চাপে তাকে তা করতে হচ্ছে।

আমাদের দেশে থিসিস গ্রুপে যারা যান, তাদের গবেষণা করতে মাস্টার্স নির্ধারিত সময়ের চেয়ে কিছুটা বেশি সময় লাগে। অনেক সময় দেখা যায়, নন-থিসিস গ্রুপে সহপাঠিরা লেখাপড়ার পাট চুকিয়ে চাকরির জন্য লড়াই করছেন, তখন থিসিস গ্রুপের শিক্ষার্থীরা ল্যাবে টেস্টটিউব নিয়ে দৌড়াদৌড়ি করছেন।

এটা এক অদ্ভুত নিয়ম। পৃথিবীর সিংহভাগ দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে গবেষণা করা অনেকটা বাধ্যতামূলক করা হলেও কেবল বাংলাদেশে স্নাতকত্তোর পর্যায়ে কোনও প্রকার গবেষণা না করেই সনদ পাওয়ার নজির তৈরি হয়ে আসছে।

শুধু তাই নয়, জাপান, যুক্তরাষ্ট্র,যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশে আন্ডারগ্রাজুয়েট বা স্নাতক পর্যায়ে চতুর্থ বর্ষ থেকে পুরো এক বছর নির্ধারিত ল্যাবে গবেষণা করা বাধ্যতামূলক। আপনার তিন বছরের তাত্ত্বিক পড়াশোনাকে কাজে লাগানোর বড় সুযোগ তৈরি করে দেয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলো।

ফলে এইসব শিক্ষার্থীরা প্রাথমিকভাবে গবেষণা কর্মের সাথে পরিচয় হয়। লিখতে হয় গবেষণা নিবন্ধ। পরবর্তীতে মাস্টার্স পর্যায়ে চলে আরো দুই বছর গবেষণা।

ছয় বছরের স্নাতক ও স্নাতকোত্তরের বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে তিন বছরই যাদের গবেষণা করার সুযোগ মেলে তারা যখন শোনেন গবেষণা ছাড়াই মাস্টার্স শেষ তখন বিষয়টা হাস্যকর হয়ে উঠে।

এছাড়াও আমরা অনার্স অর্ধ মাসিক কিংবা মাসিক একটা প্রজেক্ট বেইজইড ট্রেনিং কিংবা শিক্ষানবিশ ট্রেনিং করেই স্নাতক শেষ করি। আর মাস্টার্সে নন-থিসিস গ্রুপে থাকলে তো এইসবের কোনও বালাই নেই।

কিন্তু কেন? কোনও শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে পাঠ শেষে যদি নতুন নতুন জ্ঞান অর্জনের সুযোগই না পায়, তাহলে কাগজ নির্ভর সনদের কী প্রয়োজন? মাস্টার্স শেষ করার পরও যদি গবেষণাপত্রের Abstract  কিংবা পোস্টার তৈরি করার সুযোগই যদি না মেলে তাহলে আমরা জ্ঞান অর্জনের বিদ্যাপীঠগুলো থেকে কী শিক্ষা নিচ্ছি?

এখানে বলা যেতেই পারে, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভাগগুলোতে সব শিক্ষার্থীকে গবেষণা করানোর সুযোগ দেয়ার মতো যথেষ্ঠ অবকাঠামো কিংবা শিক্ষক নেই। কিংবা অনেক শিক্ষার্থী গবেষণা করতে আগ্রহী নয়, তাই থিসিস-নন-থিসিস গ্রুপে বিভক্ত করতে হয়।

আবার এটাও হতে পারে, একটি সেশনে অনেক শিক্ষার্থীই গবেষণা করার জন্য থিসিস গ্রুপে যেতে আগ্রহী হন, কিন্তু তত্ত্বাবধায়ক বা সুপারভাইজার না থাকায় তা করানো সম্ভব হয় না।

যুক্তিগুলো খণ্ডনের আগে প্রথমে আসা যাক, আমাদের দেশে প্রধান চারটি বিশ্ববিদ্যালয় যে আইনের দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে, সেই ১৯৭৩ সালের আইনে কী বলা আছে।

৪ নম্বর অনুচ্ছেদের এ- ধারায় বলা হয়েছে, To provide for instruction in such branches of learning as the University may think fit, and to make provisions for research and for advancement and dissemination of knowledge.

অর্থাৎ- বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজেই হবে গবেষণার সুযোগ তৈরি করা এবং জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দেয়া। সহজ কথায় উচ্চশিক্ষা নিতে হলে তাকে অবশ্যই মৌলিক গবেষণা করার সুযোগ দিতে হবে।

কিন্তু আমরা নানা কারণে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সনদ নির্ভর পড়াশুনার আঁধার তৈরি করে ফেলছি। ফলে একদিকে তাত্ত্বিক জ্ঞান নির্ভর যুব-সমাজ গড়ে উঠছে অন্যদিকে গবেষণা বা নতুন নতুন জ্ঞান তৈরি করা থেকে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো পিছিয়ে পড়ছে।

৭৩ অ্যাক্টে কোথাও বলা হয়নি, শিক্ষার্থীদের নন-থিসিস ক্যারিকুলামে পড়াশোনা করাতে হবে, নেহাৎ আমাদের শিক্ষকরা নিজেদেরকে গবেষণা করার নায্য কারণ খুঁজে পাচ্ছেন না।

কারণ গবেষণা চালানোর জন্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন একজন শিক্ষার্থীর জন্য যা ব্যয় করেন তা কেবল অপ্রতুল নয়, অসম্ভবও বটে। গবেষণার বাজেট বৃদ্ধি সেই ক্ষেত্রে অনুঘটকের কাজ করবে।

আবার বিশ্ববিদ্যালয়ে থিসিস করার অজুহাতে শিক্ষার্থীরাও খোঁজেন কোন শিক্ষক বেশি ক্ষমতাধর,কোন শিক্ষককের হাত ধরে শিক্ষক হওয়া যায় ইত্যাদি। অন্যদিকে শিক্ষকরা চেষ্টা করেন, কোন শিক্ষার্থীকে নিজের দলে ভেড়ানো যায়, কীভাবে তাকে সহকর্মী করা যায় ইত্যাদি।

এইসব অসুস্থ প্রতিযোগিতাও দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে। অনেক সময় গণমাধ্যমে শিরোনাম হয়, পছন্দের কিংবা অপছন্দের শিক্ষার্থীকে পরীক্ষায় নম্বর বেশি পাইয়ে দেওয়া কিংবা কম নম্বর দেওয়ার।

এরই ধারাবাহিকতায় চিত্রটি হচ্ছে, সম্প্রতি শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবিপ্রবি) জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড বায়োটেকনোলজি বিভাগের শিক্ষার্থী  তাইফুর রহমান প্রতীকের আত্মহত্যা।

মর্মান্তিক এই আত্মহত্যা কেবল একটি খুনই নয়, গোটা শিক্ষক জাতির জন্য কলঙ্কের কারণও বটে।

তাইফুর রহমান প্রতীকের বড়বোন শান্তা তাওহিদার দাবি, তার ছোট ভাইকে স্নাতকে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হওয়ার পরও মাস্টার্সে সুপারভাইজার দেওয়া হয়নি,  উচ্চশিক্ষার জন্য রেফারেন্স লেটার না দেওয়া, মাস্টার্সের ২০ নম্বরের পরীক্ষায় ২ দেয়া, ১০ নম্বরের পরীক্ষায় শূন্য দেওয়ার মতো ঘটনার প্রেক্ষাপটে প্রতীক আত্মহত্যা করেছেন।

তাওহিদার দাবি, তার ভাইয়ের স্বপ্ন ছিল শিক্ষক ও গবেষক হওয়ার বিভাগে লেকচারার পোস্টে আবেদন করার খেসারত দিতে হয় নিজের জীবন দিয়ে।

এই অভিযোগের সত্য মিথ্যা যাচাইয়ের দায়িত্ব আমার নয়, তবে আপাতত দৃষ্টিতে যে শিক্ষকদের বিরুদ্ধে প্রতীকের পরিবার অভিযোগ তুলেছে, তা বেশ গুরুতর। এমন অভিযোগ শুধু প্রতীকের পরিবারের হলেও বাংলাদেশে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভাগগুলোতে খোঁজ নিলে দেখা মিলবে কোনও না কোনও ভুক্তভোগীর।

বিভাগগুলোতে অনেক সময় কোনও শিক্ষার্থী শুরুতে ফলাফলে ভাল করলে পরবর্তীতে তার উপর নজরদারি চলে। তাকে সাদা দলের শিক্ষকরা ভালোবাসলে নীল বা সোনালীরা ভিন্ন চোখে দেখে। আবার ঠিক নীল বা সোনালী  দলের শিক্ষকরা ভালবাসলে সাদা দলের লোকেরা দেখেন বাঁকা চোখে।

আর যদি শিক্ষকদের মধ্যেই ব্যক্তিগত কোন্দল থাকে তাহলে তো কথাই নেই। একদল উপরে তোলার চেষ্টা করলে অন্যরা ঠিকই নামানোর চেষ্টা করে। কম বেশি সব বিভাগে অনেকটা টার্গেট করে মেধা তালিকায় তোলা হচ্ছে, আবার টার্গেট করে তারাই শিক্ষক হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে।

কেউ প্রতিবাদ করলে, তাকে রিকমেন্ডেশন লেটার থেকে শুরু করে বিভিন্ন ক্ষেত্রে হয়রানিও করার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। এমন হয়েছে, নিজ বিভাগের শিক্ষকের কাছে রিকমেন্ডেশন লেটার না পেয়ে অন্য বিভাগের শিক্ষকের কাছ থেকে রেফারেন্স লেটার কিংবা সুপারিশপত্র নিতে হয়েছে অনেকেরই।

আমরা চাই এই সংস্কৃতির পরিবর্তন হোক। যেখানে গবেষণায় আগ্রহী কোনও শিক্ষার্থীকে শিক্ষকের কাছে ধর্ণা দিতে না হয়। প্রত্যেক শিক্ষার্থীর জন্য স্নাতকোত্তর পর্যায়ে গবেষণা করা পূর্ণাঙ্গ সুযোগ দেওয়া হোক। প্রতি সেশনে একজন অধ্যাপক কিংবা সহযোগী অধ্যাপকের অধীনে একজন শিক্ষার্থী যে থিসিস করার সুযোগ পান, সে ধারার পরিবর্তন আনা হোক। বিজ্ঞানের শিক্ষার্থীদের গবেষণা করা বেশ জরুরি।

বিদেশে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করতে হলে, নন-থিসিসের বাধাটি অনেক মেধাবীদের থমকে দিচ্ছে। কোন ধরাবাধা ফলাফলের উপর ভিত্তি করে থিসিস দেয়ার গদবাধা নিয়ম ভেঙ্গে নন-থিসিস প্রথা বিলুপ্ত করা জরুরি। পঞ্চাশ জনের ক্লাসে সবাই হয়তো গবেষক হবে না, কিন্তু নূন্যতম গবেষণাকর্মের ধারনা লাভ করুক। যাতে করে, ভবিষৎ কর্মক্ষেত্রে মেধার স্বাক্ষর প্রজ্জ্বলিত হোক। প্রতীকের মতো কোন শিক্ষার্থীকে শিক্ষকদের উপর অভিমান করে আত্মহত্যার পথ যেন বেছে নিতে না হয়। শুধুমাত্র পরীক্ষার ফলাফলে ভাল করলে যে একজন ভাল গবেষক হওয়া যায় তা নয়, বরং যারা পরীক্ষায় খারাপ করেছে তারায় বড় বড় বিজ্ঞানী হয়েছে। আশা করি, সরকার বিষয়টির প্রতি সুনজর দেবেন। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনও তাদের একাডেমিক কার্যক্রমে নন-থিসিস বিষয়টি বাদ দেয়া যায় কি না সেটা নিয়ে ভাববেন কিংবা ফলাফলের উপর ভিত্তি করে পরিশোধিত কিছু শিক্ষার্থীর জন্য থিসিস বণ্টনের সেকেলে নিয়মের পরিবর্তন আনবেন।