‘বিশ্বমানব হবি যদি কায়মনে বাঙালি হ’

ফেব্রুয়ারি আমাদের ভাষার মাস। সারামাস ধরে আমরা নানা গদগদ বুলি আওড়াব, গণমাধ্যম থেকে শুরু করে সরকারি বেসরকারি নানা অনুষ্ঠানে| আদতে যে আমাদের মাতৃভাষা আজ নিজেদের বেহায়াপনার খপ্পরে আছে তা খোলাসা করে বলার জন্যে কিছু পর্যবেক্ষণ তুলে ধরতে চাই !
বাঙালি ও বংলা ভাষার ভাষার নির্লজ্জ দুশমনদের বাড়াবাড়িতে মাথা যখন হেট হতে বসেছে তখন ‘বিশ্বমানব হবি যদি কায়মনে বাঙালি হ’ কথাটা আমাদের মননে আর মগজে দারুণ নাড়া দিয়েছে। বাঙালি কবি গুরুসদয় দত্তের (১৮৮২- ১৯৪১)কথাকে ধারণ করে বাংলা একাডেমিতে গতবছর জানুয়ারি মাসে অনুষ্ঠিত হয়েছিল বাংলা সাহিত্যের আন্তর্জাতিক সন্মেলন| এই আয়োজনের নেপথ্যে দুই একজনের ঠিকাদারি স্বার্থের সংযোগ থাকলেও এর একটা দীর্ঘমেয়াদী আবেদন থাকতে পারে। এর ঐতিহাসিক গুরুত্বও কম নয়|

এখানে উল্লেখ্য যে, ১৯৭৪ সালে স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিক বাংলা সাহিত্য সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এই সম্মেলনে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। ২০১৮ সালের সম্মেলনে ভারতসহ সারা বিশ্বের তিন শ’রও বেশি বাঙালি সাহিত্যিক অংশ নিয়েছিলেন।

বাংলা একাডেমি ও বাংলাদেশ সরকারের পাশাপাশি ‘নিখিল ভারত বঙ্গ সাহিত্য সম্মেলন’ ও ‘ফ্রেন্ডস অব বাংলাদেশ’ গতবছরের আয়োজনে প্রধান সহযোগী সংগঠন হিসেবে ভূমিকা রেখেছিল। ১৯২২ খ্রিস্টাব্দে ভারতের বেনারসে আমাদের কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সভাপতিত্বে প্রথম ‘নিখিল ভারত বঙ্গ সাহিত্য সম্মেলন’ অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এরপর ৯৪ বছরে ৮৯ বার এ সম্মেলন ধারাবাহিকভাবে অনুষ্ঠিত হয়। তারই ধারাবাহিকতায় এ সম্মেলন ঢাকায় অনুষ্ঠিত হয় | প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সম্মেলন উদ্বোধন করেন ।

সন্মেলন সম্পর্কে এই ছিল মোটাদাগের খবর। এবার গুরুসদয় দত্তের কথায় ফিরে আসি। গুরুসদয় দত্ত  রবীন্দ্রনাথ (১৮৬১- ১৯৪১) থেকে দুই দশকের ছোট হলেও তাদের পরলোকে যাত্রা একই বছরে, ১৯৪১ সালে। সে হিসেবে লেখালেখিতে তারা ছিলেন সমসাময়িক। সময়টা ছিল বাংলা ভাষা, ভূমি, সাহিত্য ও বাঙালির পরাধীনকাল|

তার প্রায় শতবর্ষ পরে, ১৯৫২ সালে আমাদের মাতৃভাষা আন্দোলন, তারও পরে ১৯৭১ সালে আমাদের স্বাধীনতা অর্জনের প্রায় অর্ধশতকে এসে অনেকটা গালির মতো শোনায়, নিজের কানেও বড় বাজে গো, ’বিশ্বমানব হবি যদি কায়মনে বাঙালি হ’| আমাদের পরিণতি আর অধঃপতন এতটাই, আমরা দেউলিয়া বাতাসে বয়ে যাই যে! তবু রক্ষে সময় থাকতে হুঁশ হলো। আয়োজকদের সাধুবাদ। উপজীব্য কথাটা ছিল মোক্ষম|

ঔপনেবেশিক জামানার পতনের দীর্ঘ সময় পরেও সেই পুরনো ভূত কেন কর্পোরেট ঢঙে আমাদের আত্মপরিচয়ে আত্মঘাতী থাবা মেলে? আমাদের সমৃদ্ধ ভাষা ও সাহিত্য থাকার পরও আমাদের হয় উর্দু নয় আরবি- নয় তো ইংরেজির দিকে ঝুঁকতে হবে কেন?

বাসাবাড়ির ভেতরে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কিংবা কাজের লোকদের সঙ্গে আমরা কোন খিচুড়ি ভাষায় কথা বলি? ভাষা ও সাহিত্য কোন আজগুবি বা গায়েবানা বিষয় নয়। যারা ঢাকায় থেকে, বাংলার আলো বাতাসে প্রাণধারণ করে ইংরেজি বা আরবিতে পণ্ডিতি ফলান, তারা কি বাজারে গিয়ে অইসব ভিনদেশি বোলে বাজারসদাই করেন? তারা কি লালনগীতি, রবীন্দ্র সঙ্গীতসহ পঞ্চকবির গান ইংরেজি বা আরবিতে শোনেন?

এ প্রসঙ্গে একটা ঘটনা বলি। একবার প্রায় বছর বিশেক পূর্বে কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ঢাকায় বেসরকারি এক বিশ্ববিদ্যালয়ে আমন্ত্রিত হয়ে এসেছিলেন। সুনীলের পূর্ববর্তী সকল বক্তা ইংরেজিতে সাহেবি ঢঙে কথা বলে গেলেন| এবার তার পালা। উনি শুরুতেই বললেন, আমি এমন কোনও বিপদে পড়িনি, বাংলাদেশে এসে আমাকে ইংরেজিতে বক্তৃতা করতে হবে । তারপরেও আমাদের খাসলত যদি ঠিক হয়! আমরা আন্তর্জাতিকতার দোহাই দিয়ে  ‘হে উৎসব’ এর নামে বিদেশিয়ানার কর্পোরেট আয়োজন করেই চলছি, তাও আবার জনগণের করের টাকায়|

কায়মনে বাঙালি হবার মানে এই নয় যে বাইরের দুনিয়ার জন্যে আমরা দরজা বন্ধ করে দেব। বাইরের দুনিয়ার সঙ্গে আমাদের মননের যোগাযোগ হবে অনুবাদে। এক্ষেত্রে আমাদের অনুবাদের বাজার দেখতে হবে। অনুবাদ মানে আমরা কেবল ইংরেজির দিকে ঝুঁকবো না। ইংরেজি ভাষাভাষী জগতের চেয়ে প্রাচ্য দুনিয়ায় বিশেষ করে চীনা, জাপানি, কোরিয়ান, হিন্দি, উর্দু, ফার্সি আর আরবি ভাষায় আমাদের সাহিত্যের কদরটা খতিয়ে দেখা দরকার|

একই সঙ্গে আমাদের নিজেদের সংখ্যালঘিষ্ঠ স্বদেশি মানুষের তিরিশের বেশি ভাষা সাহিত্যের দিকে আমাদের দৃষ্টি মেলতে হবে।কায়মনে বাঙালি হতে গেলে তাদের সঙ্গেও আমাদের ভাব ও ভাষার লেনদেন করতেই হবে। তাদের ভাষা বিলু্প্ত হবে আর আমরা লম্বা লম্বা কথা বলবো, তা তো হবে না। ইংরেজি নির্ভর ঔপনেবেশিক সাহেবিয়ানা আর তেঁতুল হুজুর মার্কা বাড়াবাড়ি দুটোকেই টুঁটি চেপে ধরতে হবে।

আমাদের শিক্ষিত-অর্ধশিক্ষিত, পেশাজীবী, কতিপয় গণমাধ্য়মের লোকজন বাংলা বাক্য়ের শেষে ইংরেজি শব্দ জুড়ে দিয় এক অশ্লীল শ্রুতিকটূ খিচুড়ি ভাষার প্রবর্তন হচ্ছে! এ প্রবণতা এখনই রোধ করা দরকার। একটা বেসরকারি দূরদর্শনের সেরা কণ্ঠ বাছাই অনষ্ঠানে উপস্থাপক থেকে শুরু করে অতিথি বিচারকদের অধিকাংশই এরকম খিচুড়ি ভাষা ব্যবহার করেন। টকশোওয়ালাদের কথা তো বলাই বাহুল্য।

তাই ভাবি তিনশ বছর পরেও আবদুল হাকিমের বহুল পঠিত বঙ্গবাণী  কাব্য;  বিশেষত দুটি লাইনই কেন হরেদরে প্রাসঙ্গিক:

যে সবে বঙ্গেত জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী।

সে সব কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি।

সেই সময় সংস্কৃত নির্ভরতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে আবদুল হাকিম তার ক্ষোভ ঝেরেছিলেন। আজ আমাদের তাকে আশ্রয় করতে হচ্ছে ইংরেজি নির্ভরতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে|

লেখাটি শেষ করার আগে একটা উদাহরণ দিতে চাই। আমাদের খোদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইট প্রায় পুরোটা ইংরেজি নির্ভর। অথচ এই বিশ্ববিদ্যালয় ১৯৪৮-৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের সূতিকাগার |

আবদুল হাকিম ব্যবহৃত উপমার আক্ষরিক অর্থ না খুঁজেও বলা যায়, তিনি বড় প্রাসঙ্গিক আজ| আর এজন্যই আমাদের ঢাকঢোল পিটিয়ে বলতে হলো, ‘বিশ্বমানব হবি যদি কায়মনে বাঙালি হ’! আমাদের চেতন হোক।