কড়া নাড়ছে কি সাংস্কৃতিক উত্তরণ ?

স্বাধীনতা পরবর্তীকালের বঙ্গবন্ধুর এক ভাষণ ইউটিউবে বেশ চালু। সরকারি কর্মকর্তাদের উদ্দেশে তিনি বলছেন, খেটে খাওয়া মানুষদের ‘আপনি করে বলতে হবে। ওরা কামাই করে খায়।’

ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক দৃষ্টির উত্তরাধীকারই শুধু নয়, হাজার বছর জুড়েই কায়িক শ্রম-নির্ভর মানুষরা বাংলাদেশে মর্যাদা পায়নি। কাজের প্রকৃতি অনুসারে কর্মীর মর্যাদার বিচারের রেওয়াজ প্রাচীন। ধনবৈষম্য ছাড়াও অনেকে বর্ণপ্রথার দিকেও আঙুল তোলেন। কিন্তু জাতের ধর্ম ত্যাগী মানুষরাও সুলতানি কী মুঘল কোনও আমলেই মর্যাদাবান ছিল না। ওরা ‘তুই’ থেকে গেছে।

এক সময় পালকির চলন ছিল। মাথায় ঝাঁকায় মানুষ নিয়ে পারাপারের ছবিও মেলে। সে তুলনায় রিকশা অনেক উন্নত বাহন। তবু এযান মনুষ্যশক্তি চালিত। মানুষ মানুষের ভারবাহী। বৈঠার নৌকাও মনুষ্যশক্তি চালিত। বঙ্গবন্ধুর আমলে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে কয়েকজন বিদেশি শিক্ষকতা করতেন। কুস্তগ্রিজ নামের এক রুশি শিক্ষক ছিলেন। মনুষ্যশক্তি চালিত বিধায় রিকশায় চড়তেন না। এ এক সাংস্কৃতিক চেতনা। বাংলাদেশে কেউ যদি পালকিতে করে ঘোরাঘুরি করতে চান, সেটা যেমন বিদঘুটে দেখাবে তার কাছে হয়তো ব্যাপারটা তেমন ছিল।

গোটা তিরিশেক বছর আগে শ্যালো পাম্পে ভর করে যন্ত্র-চালিত নৌকা নামে। এর বিরুদ্ধে আন্দোলন হয়েছিল- এ এক ধারা বটে! প্রযুক্তির উৎকর্ষের বিরুদ্ধে মাঠে নামার লোক তৈরিই থাকে- প্রচলিত কর্মে হাত পড়ায় এ বিরোধিতা বুঝতে অসুবিধা হয় না। ইজিবাইক প্রচলনের বিরোধিতাও হয়ে আসছে- তাতে কিছু যৌক্তিক প্রসঙ্গও জড়িত।

চার হাজার বছর আগে ভারতের মাটিতে চাকা গড়ায়। লোকগানে সওদাগর আর গাড়িয়াল ভাই মনে করিয়ে দেয় যোগাযোগে নৌকা আর গরুর গাড়ির ভূমিকা। প্রাগৈতিহাসিক কালেই হরপ্পা সভ্যতায় গরুর গাড়ির অস্তিত্ব মেলে। বঙ্গেও প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকেই গরুর গাড়ি সচল ভাবলে নিশ্চয় ভুল হয় না। অথচ এই সেদিনও গ্রামবাংলার মেঠোপথ ছিল গরুর গাড়ির দখলে। গাঁয়ের লোকের যাতায়াত ব্যবস্থার উন্নয়নে হাজার বছর কেউই নতুন কিছু ভাবেনি নিশ্চিত করেই বলা যায়। কারণও আছে অবশ্য।

প্রায় দু হাজার বছর আগে চন্দ্রগুপ্ত আমলে গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড নির্মাণ হয়। সামরিক ও বাণিজ্যিক চাহিদা পূরণে এই মহাসড়ক গুরুত্বপূর্ণ। আফগানিস্তান থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত বিস্তৃত কালজয়ী এ মহাসড়ক গর্ব জাগায়। কিন্তু অতটুকুই। হাজার বছরেও বঙ্গজুড়ে সড়ক ব্যবস্থা গড়ে না ওঠা নিয়ে প্রশ্ন জাগে না। ধরেই নিই-সামরিক আর বাণিজ্যিক প্রয়োজন হয়নি।

আটশ বছর আগে তুর্কি ফৌজ বাংলার ক্ষমতার দখল নিলেও রাজস্ব আদায়ের জমিদারি পন্থা অটুট থাকে। ভিনদেশি এসব মুসলিম শাসক নগরেই সীমাবদ্ধ ছিল। বরং সরকারি ছোটবড় অনেক কাজে অংশীদার হয়েছে দেশিরা, তাতে ধর্মের বাদ বিচার ছিল না। আজ অব্দি আরবি-ফারসি শব্দে গড়া সরকার, মজুমদার, কুণ্ডু, মোহন্ত, সাহা, রাহা, সান্ন্যাল, মল্লিকের মতো অসংখ্য পদবী হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের নামে শোভিত।  সর্বদা সরকারি পার্টি করা মানুষের মতো চতুর বুদ্ধি জাত মারায় ভূমিকা রেখেছে কি রাখেনি সে ভাবনা অবান্তর। কায়িকশ্রমে নিযুক্ত মানুষ যা ছিল তাই থেকেছে। যেকারণে কায়িক শ্রমের প্রতি সামান্য শিক্ষিত হলেই আজও এত অবজ্ঞা।

বন্যার পলিতে উর্বর জমিতে দারুণ ফসল ফলে বটে, কিন্তু বন্যার কারণে সমতল ভূমি থেকে উঁচু না করে স্থায়ী সড়ক নির্মাণ অসম্ভব। এই বিপুল ব্যয় বহনের ফিকির বার করতে এগিয়ে আসেনি কেউই। বাদশা সম্রাটের দুর্গ আর পরিখা খননের ইতিহাস মুখস্ত করে স্কুল পাশ চলে, তবে মনে সহজ প্রশ্ন জাগে না- এত সুফলা দেশে মোটরযান আবিষ্কার কেন হলো না, কেনইবা বাংলার আনাচে কানাচে পাকা সড়ক নির্মাণে দেশ স্বাধীন হওয়ার অপেক্ষায় থাকতে হলো! উত্তরটাও জানা- ভার বহনে হাতি, ঘোড়া, গরু, গাধা আর গরিব মানুষের অভাব ছিল না।

ভারতে উনিশ শতকে প্রথম মোটরগাড়ি গড়ালেও ১৯১৪ সালের আগে মোটরগাড়ি বিষয়ক আইন হয়নি। বুঝতে অসুবিধা হয় না কলকাতা শহরকেন্দ্রিক এই আধুনিক যান সুবিধাও মোটে একশো বছরের পুরোনো। সরকারি তথ্যে দেখছি, বাংলায় ১৯১৩ সালের ৪,০৫৮টি মোটরগাড়ি নিবন্ধন হয়েছে- যা বেড়ে ৪০,৫৩১টি দাঁড়ায় ১৯৪৭ সালে। পণ্য পরিবহনে মোটরযান আমদানি শুরু হয় ১৯২৩-এ। ১৯৪০ সালের আগে বাসের মুখ দেখেনি বাংলা। উনিশ শতকে নীল আর পাটের বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হলেও সামান্য কিছু সড়ক, রেল আর নৌযান নির্ভর থেকেছে গ্রাম-শহরের যোগাযোগ।

১৯৩৮ সালের প্রতিবেদনে এ জে কিংস বঙ্গের যে সড়ক ব্যবস্থার চিত্র দিয়েছেন তাতে গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক, যশোর, ব্যারাকপুর আর ডায়মন্ড হারবার এই চারটি মহাসড়ক রয়েছে। এর বাইরে কিছু পাকা জেলারোড ছিল। নমুনা হিসেবে পূর্ববঙ্গের কয়েকটি জেলার তথ্য দিলেই পাঠক সমগ্রটা বুঝতে পারবেন- যশোরে ১৮৪, ময়ংমনসিংহে ৯০, রাজশাহীতে ৬৮, দিনাজপুরে ৫৫, খুলনায় ৪৭ আর পাবনায় ৪৫ মাইল পাকা জেলা সড়ক ছিল।

একঘেঁয়ে এত তথ্য দিলাম পাঠককে গ্রামবাংলার শতাব্দি শতাব্দিব্যাপী ধীরচল যোগাযোগ ব্যবস্থার পীড়ন অনুভব করার তাগিদে। এখন দেশে প্রায় ৪ হাজার কিলোমিটার জাতীয় মহাসড়ক, প্রায় সাড়ে চার হাজার কিলোমিটার আঞ্চলিক মহাসড়ক আর ১৩ হাজার কিলোমিটারের বেশি জেলা সড়ক রয়েছে।

এরশাদের আমল থেকে ব্যাপক হারে রাস্তা তৈরি হলেও জ্বালানি তেল চালিত গাড়ির ভীষণ দাম গ্রামাঞ্চলের পরিবহন ব্যবসায় সাড়া ফেলেনি। যদিও বাড়তে বাড়তে দেশে এখন বছরে কার, মাইক্রো আর পিকআপ মিলিয়ে ২৩ হাজারের বেশি রিকন্ডিশন গাড়ি আমদানি হয়। সেচের জন্য তৈরি শ্যালো ইঞ্জিন দিয়ে কারো বেকায়দা বুদ্ধিতে গ্রামাঞ্চলে নৌকার পাশাপাশি কিছু যানবাহন চলতে শুরু করে। নানা অঞ্চলে তার নানা নাম-নসিমন, করিমন, ভটভটি আরও কত।

ব্যাপক লোডশেডিং-এর দেশে বৈদ্যুতিক যান কল্পনাতীত থাকতো, যদি না ২০০৮-এ ক্ষমতায় এসে শেখ হাসিনা বিদ্যুৎ উৎপাদনের এমন ব্যাপক উদ্যোগ নিতেন। ২০ হাজার মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা অর্জিত হয়ে গেছে। সামনে আরও বিদ্যুৎ প্লান্ট হচ্ছে।

এই পরিস্থিতির পূর্ণ সুযোগ নিয়ে দেশ ছেয়ে ফেলেছে স্বল্পমূল্যের ব্যাটারি চালিত ইজিবাইক। বিদ্যুতের চার্জে চলা নানান ডিজাইনের থ্রি-হুইলার গ্রাম থেকে জেলা শহর সবখানে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। শুধু ঢাকা শহর করায়ত্ত করা বাকী।

রাস্তায় গড়াতে শুরু করলেও এই যান চলাচলে নিষেধাজ্ঞা জারির দাবিতে সক্রিয় রয়েছে নানা পক্ষ। অবৈধ যান বলেই শুধু নয়, সড়ক মহাসড়কে বাস-ট্রাকের সাথে এসব যানবাহনের নিয়মিত সংঘর্ষও ঘটে।

তবে ফসিলে সৃষ্ট জ্বালানি তেলে চালিত মোটরগাড়ির চাইতে পরিবেশ বান্ধব এসব যান। পরিত্যক্ত ব্যাটারি প্রকৃতিতে যত্রতত্র ছড়িয়ে পড়ার পরিবেশগত ঝুঁকি অবশ্য আছে। এসব পুরোনো ব্যাটারি সরকারিভাবে কেনার এবং ব্যবহারের পুনরাবৃত্তি নিলে এই ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে কাজে দেবে।

ছেলেবেলায় বাসের গায়ে ‘বডি প্রগতির তৈরি’ লেখা দেখে ভাবতাম- দেখিস একদিন বাংলাদেশও। তারপর ৩৩ বছর কেটে গেছে। এখন ক্ষীণ আশা জাগে ইজিবাইক দেখে। এর কলকব্জা এত সহজ, যে দেশেই বানানো সম্ভব। শুধু ব্যাটারির জন্য সরকারি বিশেষ উদ্যোগ নিলেই চলে। এতে পরিবেশ বাঁচাতে পরিত্যক্ত ব্যাটারির সঠিক ধ্বংসকরণে যেমন সুবিধা, তেমনই ইজিবাইক নির্মাণ এবং বিদ্যুৎ চুরি নিয়ন্ত্রণও সম্ভব।

একযুগেই দেশে শিক্ষার হার ২৬% থেকে লাফিয়ে ৭৩% ছাড়িয়েছে। এই উদ্দীপনায় আর কয়েক বছরেই দেশে শিক্ষিত-অশিক্ষিত সাংস্কৃতিক জাতপাত বিলীন করে দেবে। ইংরাজিতে আন-এডুকেটেড গালি দিলে ইজিবাইক চালক ঘাড় ঘুরিয়ে জিজ্ঞেস করতেই পারে কোন কঠিন বাংলা শব্দের বানান অথবা এফ না দিয়ে পিএইচ দিয়ে কেন ফিজিক্স লেখে? চটজলদি উত্তর দিতে পারবেন তো? গুগল কিন্তু ওর হাতেও। গুগল করে উত্তর দিলে টিটকারি করতেই পারে।

ধর্মে, শ্রেণিতে, আঞ্চলিকতায় বিভক্ত বাঙালির মধ্যে মৌলিক মিল- মর্যাদার সংগ্রামে। এককালের সুচিন্তিত বর্ণ বিভাজনের কাছে হার মেনে ভারত থেকে পাততাড়ি গোটানো বৌদ্ধ চেতনার ছাপ মুছে যায়নি। মধ্য এশিয়ায় সরস হয়ে ওঠা ধর্মচিন্তার রসদ জুগিয়েছে যেমন, বাংলার ভাবজগতের যাবতীয় সংস্কারেও মানুষের মর্যাদা প্রসঙ্গ হয়েছে, পূর্ণতার পুরো পথ না মিললেও- একটু একটু করে এগিয়ে যাওয়াই আবহমান মনুষ্যজীবন।

এই প্রেক্ষিতে দেখলে যে দেশের শতভাগ মানুষ শিক্ষিত হতে চলেছে সেদেশের কাজের সাংস্কৃতিক মান উত্তরণ অতীব জরুরি। এখনও আড়তে আড়াই মনের বস্তা পিঠে বইতে হয় অথবা দশখানা ইট মাথায় নিয়ে কয়েক তলা উঠতে হয় বটে। তবে প্যাডেল-রিকশা ছাড়া আর কোন কাজে মনুষ্যশ্রমে মানুষ টানা পড়ে না।

শত শত বছর ভিন দেশি বণিক নির্ভর আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চলায় আদা চাষি বাঙালি জাহাজ নির্মাণ নিয়ে মাথা না ঘামালেও নানা জাতের নৌকা গড়েছে। শ্যালো বা ব্যাটারির যানবাহনের পেছনে চীনা প্রযুক্তি জ্ঞান থাকলেও অর্বাচীন মানুষরাই দেশব্যাপী এই পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। কিংকর্তব্যবিমুঢ় সরকারি কর্তারা বৈধতা দেবে কি দেবে না এই দোলাচলে এতদিন শুধু ভুগেছে। ঝাঁকা গেছে, পালকি গেছে, হাতে টানা পাখা গেছে এবার মনুষ্যশক্তি চালিত রিকশা ইতিহাস হোক।