‘হারকিউলিস’ ও আমাদের আইন-আদালত

গ্রিক পুরাণের দেবতা-যোদ্ধা ‘হারকিউলিস’ সম্পর্কে অনেকেই জানে। ইতিহাস কিংবা রূপকথার সেই চরিত্র সম্পর্কে যত লোক জানে তার চেয়ে বেশি লোক হারকিউলিসকে চেনে মূলত টেলিভিশন সিরিয়ালের কারণে। বলবান, বীর যোদ্ধার ওই চরিত্র এখনও মানুষের চোখে ভাসে। রূপকথার যুগ অতীত হলেও বর্তমানে কখনও মূর্ত হয় মনুষ্য-ভাবনায়। আন্দোলিত হয় হৃদয়, ক্ষণিকের জন্যে হলেও মানুষ নিজেকে ওই চরিত্রের কোনও একজন কিংবা মুগ্ধ দর্শক হিসেবে হাজির করে। তবে পরক্ষণে বাস্তবতায় ফিরে আসলে দেখে ওইসব মোহময় মায়া; ঘোর কাটলে মায়াও কেটে যায়।
সম্প্রতি ‘হারকিউলিস’ ফিরে এসেছে। রূপকথার গল্প নয়, বাস্তবে কথিত চিরকুটের মাধ্যমে। তার এই ফিরে আসাটা ধর্ষণের দায়ে কয়জন অভিযুক্তকে হত্যার মাধ্যমে। তিনি প্রকাশ্য হয়েছেন চিরকুটের ভাষায়। চোখে দেখা যাচ্ছে না তাকে, দেখারও প্রয়োজনীয়তা বোধ করছে না কেউ কেউ। অভিযুক্ত অপরাধীকে শাস্তি দেওয়ার মাধ্যমে তার এই আবির্ভাব। এ শাস্তি সাধারণ শাস্তি নয়, সরাসরি মৃত্যু। বলা যায়, আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে মৃত্যু। একই সঙ্গে অন্য অভিযুক্তের প্রতি বার্তা দেওয়া শাস্তি। ধর্ষণে অভিযুক্ত হলেই মৃত্যু অবধারিত এমন ইঙ্গিত।

হারকিউলিস নামোল্লেখে খুনের স্বীকারোক্তি সহ মরদেহের সঙ্গে চিরকুট- দেশে ধর্ষণে অভিযুক্তের এমন মৃত্যুর ঘটনা একাধিকবার ঘটেছে। প্রতিবারই প্রায় একই বার্তা, একই ইঙ্গিত। তারপর এনিয়ে আলোচনা শুরু হলে একটা পর্যায়ে ‘খুনি’ তার পরিচয়ে উল্লেখ করেছেন নিজেকে বা নিজেদেরকে ‘হারকিউলিস’ বলে। একই বার্তা দিয়ে একাধিক জায়গায় একই ধরনের অভিযুক্তকে হত্যার পর একই ইঙ্গিত দেওয়ায় বুঝতে কষ্ট হয় না এখানে এককভাবে কেউ জড়িত নয়। এর মধ্যে নিশ্চিতভাবে এমন কারও সম্পৃক্ততা রয়েছে যারা বিপুল ক্ষমতা ধারণ করেন; ‘হারকিউলিস’ নামে তারা নিজেদের পরিচয় দিচ্ছেন।

জিউস-পুত্র হারকিউলিসের অস্তিত্ব নাই পৃথিবীতে যখন তখন অভিযুক্ত ধর্ষকদের খুন কারা করছে? ঝালকাঠি, সাভার, পিরোজপুরে অভিযুক্তদের খুনে একই কায়দা কেন ব্যবহার করছে তারা? কেন প্রশাসন কথিত হারকিউলিসের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণে যাচ্ছে না? এগুলো প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে। কোনো অভিযুক্তের হত্যাকাণ্ডের পর পুলিশের এই ভূমিকায় সন্দেহের উদ্রেক করছে; তারা নিজেরা কি এর সঙ্গে জড়িত? উত্তর যদি ‘হ্যাঁ’ হয় তবে এটা যেমন অপরাধ, একইভাবে এই অপরাধের প্রাতিষ্ঠানিকিকরণ দেশের প্রচলিত আইন-আদালতকে বৃদ্ধাঙুলি দেখানোরও শামিল।

লক্ষণীয় ব্যাপার হচ্ছে কথিত এই হারকিউলিস কর্তৃক খুনের ঘটনাকে দেশের একটা পক্ষ ইতিবাচক ভাবে দেখছে, কেউ কেউ আবার এ নিয়ে রীতিমত উল্লসিত। তারা আবেগে হোক কিংবা ক্ষোভে হোক এধরনের হত্যাকাণ্ডকে সমর্থন করে যাচ্ছে। তাদের এই আবেগ কিংবা ক্ষোভজনিত যে প্রতিক্রিয়া তার মাধ্যমে দেশের প্রচলিত আইন-আদালতকে অগ্রাহ্য করা যে হচ্ছে সে বোধশক্তি কয়জন রাখেন এ নিয়ে আমি সন্দিহান। আইন-আদালত অভিযুক্তকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেয়। অভিযুক্তের বিরুদ্ধে যত বড় ধরনের অপরাধের অভিযোগ থাকুক না কেন প্রমাণের আগে তাদের চূড়ান্ত দোষী বলা যায় না। কিন্তু এখানে হারকিউলিসের নাম নিয়ে যা করা হচ্ছে সেটা সরাসরি আইন ও আদালতকে তোয়াক্কা না করে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া হচ্ছে; এটা অনাকাঙ্ক্ষিত।

হারকিউলিসের সন্ধানে পুলিশকে কার্যকর কোন ভূমিকা নিতে অদ্যাবধি দেখা যায়নি; তাই অধুনা হারকিউলিসের কর্মকাণ্ডের দায় পুলিশ এড়িয়ে যেতে পারে না। এখানে পুলিশের যোগকে সন্দেহের মধ্যে রাখতে হয় তাদের অতীতের কিছু কর্মকাণ্ডের কারণেই। এই সন্দেহ জেগে ওঠে ফের যখন পুলিশ-র‍্যাবসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বিভিন্ন বাহিনী বিভিন্ন সময়ে কখনও ক্রসফায়ার নাম দিয়ে, কখনও বন্দুকযুদ্ধের নাম দিয়ে তাদের ভাষায় অভিযুক্তদের শায়েস্তা করে আসছে। প্রতিবারই দেখা যায় ক্রসফায়ার, বন্দুকযুদ্ধ কিংবা অন্য উপায়ে কাউকে মেরে ফেলার পর এনিয়ে তারা সংবাদ বিজ্ঞপ্তি থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ সংবাদ সম্মেলনে জানায়। অর্থাৎ ওই সব মানুষের মৃত্যুর মাধ্যমে পুলিশও অফিসিয়ালি ওই চ্যাপ্টার ক্লোজ করে দেয়; আইন-আদালতের পথ ধরে না। মেশিনগানের একটা গুলি খরচেই সব সমাধান- এমন একটা ধারা চলমান। এই মেশিনগানের গুলি কি তবে দেশের আইন-আদালতের চেয়েও বড় হয়ে গেল?

এটা ঠিক প্রচলিত আইনে ধর্ষকের বিচার খুব দ্রুত ও সহজে হচ্ছে না। ধর্ষিতাকে বারবার প্রমাণ করতে হয় তিনি ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। শারীরিক নির্যাতনের পর ওগুলো মানসিক আরও নির্যাতন। ভিক্টিম কেবল জানেন কী পরিস্থিতি! এটা আমাদের আইনের দুর্বলতা হতে পারে, হতে পারে বিচার প্রক্রিয়ার সীমাবদ্ধতা। এখানকার চলমান সমূহ সীমাবদ্ধতা দূরীকরণের উপায় আমাদেরকে খুঁজতে হবে। দেশের সাড়ে তিনশ’ আইন প্রণেতার কাজ এটা; এটা সরকারের কাজ। সরকার এনিয়ে ভাবতে পারে। পুলিশসহ সংশ্লিষ্ট প্রশাসন যদি মনে করে একটা গুলি খরচে অপরাধীদের নির্মূল করে দেওয়া সম্ভব তবে সেটা ভুল পন্থা তাদের। তারা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী হয়েও আইনকে নিজের হাতে তুলে নেওয়ার অপরাধে অপরাধী হবে। একইভাবে তারা সরকার ও বিচার ব্যবস্থার পরিপন্থী কাজ করছে বলেও পরিগণিত হবে।

অনেকেই বলবেন, এটা যে অপরাধ সে কে বলবে? হ্যাঁ, এখনই এটা উচ্চকণ্ঠে বলার মতো কেউ নেই। তবে ভবিষ্যৎ ঠিক-ঠিক এইসব কারণে আজকের বর্তমানকে অভিযুক্ত করবে। ঠিক যেমন ‘অপারেশন ক্লিনহার্ট’ চলাকালে সংশ্লিষ্টদের ‘এক্সট্রা জুডিশিয়াল কিলিং’ ও ‘এক্সট্রা জুডিশিয়াল এক্টিভিটি’ পরবর্তী সময়ে মানবিক জবাবদিহির কাঠগড়ায় ওঠেছিল। মানবিক কাঠগড়ায় ওঠেছিল এক-এগারোকালীন সময়ের ঘটনাগুলোও যাকে পরবর্তীতে ইনডেমনিটি পর্যন্ত দিতে হয়েছিল।

মানবিক রাষ্ট্র গঠনের আগ্রহ আমাদের চিরায়ত। মানবিক রাষ্ট্রের এই চাওয়া তখনই পূরণ হবে যখন রাষ্ট্রস্থিত সমাজের সকল পর্যায়ে অপরাধ প্রবণতা কমবে। অপরাধ ও মানবিকতা পরস্পরবিরোধী বলে যেখানে অপরাধ তুলনামূলক কম সেখানকার লোকজন অন্য জায়গার তুলনায় বেশি মানবিক। আর অপরাধকে নিয়ন্ত্রণে আনতে আরও এক অপরাধ করে ফেলা কোনভাবেই অপরাধের প্রতিবিধান নয়। বরং অপরাধের আইনি প্রতিবিধানই কাঙ্ক্ষিত। দুঃখজনক সত্য হলো কখনও অপারেশন ক্লিনহার্টের নামে, কখনও ক্রসফায়ারের নামে, কখনও বন্দুকযুদ্ধের নামে, আবার কখনও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কিংবা অন্য যে কেউই হোক হারকিউলিসের নাম ব্যবহার করে অপরাধ নির্মূলের উপায় খোঁজা হচ্ছে। অপরাধ নির্মূলের এই পন্থাগুলো সময়ে সময়ে ব্যর্থ হয়েছে বলে একেক বার একেক নাম নিতে হচ্ছে। অথচ শুরু থেকে আইনি প্রতিকার নিশ্চিত করতে আইনের সীমাবদ্ধতা দূরীকরণের পথে গেলে রাষ্ট্রই লাভবান হত; আর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কপালে বিবিধ কালি পড়ত না।

সর্বশেষ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনকারী আওয়ামী লীগের এবারের চ্যালেঞ্জ সুশাসন নিশ্চিত করা। সরকারপ্রধানসহ একাধিক মন্ত্রীও এমন কথা বলছেন। সরকারের এই লক্ষ্যকে ইতিবাচকভাবে দেখছে দেশ। কিন্তু সুশাসন নিশ্চিতে প্রাথমিক ধাক্কা লাগে যখন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কিছু কার্যকলাপ আইন-আদালতকে অগ্রাহ্য করার মতো হয়ে যায়। এই দিকটা সরকারকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে। খোদ প্রশাসন যদি আইন-আদালতকে অগ্রাহ্য করে তখন তারা কীভাবে নাগরিকের কাছ থেকে সুনাগরিকসুলভ আচরণ প্রত্যাশা করে?

অপারেশন ক্লিনহার্ট সমাধান এনে দিতে পারেনি, ক্রসফায়ার সমাধান এনে দিতে পারেনি, বন্দুকযুদ্ধ সমাধান এনে দিতে পারেনি, আর সেই সবের পথ ধরে সাম্প্রতিকতম সংযোজন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কিংবা অন্য যে কারও দ্বারা চালিত ‘হারকিউলিস’ও কোন সমাধান আনতে পারবে না। আইনের সীমাবদ্ধতা দূর করে বিচার প্রক্রিয়াকে সহজ ও কার্যকর করাই হবে এর স্থায়ী সমাধান।

রূপকথার যোদ্ধা-দেবতা ‘হারকিউলিস’ বাংলাদেশে নেমে খুনোখুনি না করুক, এটাই হবে চাওয়া। হারকিউলিসে আস্থা নয়, শত সীমাবদ্ধতা শেষে আমরা আইন-আদালতের প্রতিই আস্থাশীল থাকতে চাই।