যশোর ২৫০ শয্যা হাসপাতালের সামনে অবৈধ চার ক্লিনিকে প্রতারণা

বিল্লাল হোসেন>
যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালকে ঘিরে অবৈধভাবে গড়ে ওঠা ৪টি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে চিকিৎসাসেবার নামে প্রতারণা চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বেসরকারি এসব প্রতিষ্ঠানে নানা অভিযোগে বিভিন্ন সময় ভ্রাম্যমাণ আদালত অভিযান চালিয়ে জরিমানা আদায় করে। কিন্তু তাদের প্রতারণা থামছেনা। তাদের সাথে পাল্লা দিয়ে প্রতারণা চালাচ্ছে আরো কয়েকটি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার। এরমধ্যে অনেক ক্লিনিকে নিয়ম বর্হিভূতভাবে একই ডাক্তার রোগীকে অচেতনের পর অস্ত্রোপচার করছেন। হাসপাতালে রোগী থাকলেও অনুপস্থিত মানসম্মত অপারেশন থিয়েটার। নেই পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য উন্নতমানের কোনো যন্ত্রপাতি। প্যাথলজি পরীক্ষা নিরীক্ষার ভুয়া রিপোর্ট তৈরি করে রোগী ও স্বজনদের কাছ থেকে হাতিয়ে নিচ্ছেন মোটা অংকের টাকা। রিপোর্টের প্যাডের নিচে লিখে মেডিকেল অফিসার সম্বলিত একটি সিল মেরে নিজেরাই স্বাক্ষর করে রোগীদের হাতে ধরিয়ে দিচ্ছেন। ওই সব প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসাসেবার কোন পরিবেশ নেই।
সিভিল সার্জন কার্যালয়ের সূত্রে জানা গেছে, স্বাস্থ্য বিভাগের অনুমতি ছাড়াই পরিচালনা হচ্ছে দেশ ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার। ভুক্তভোগীদের অভিযোগের ভিত্তিতে সম্প্রতি সেখানে গিয়ে দেখা গেছে, রিসিপশনে একজন যুবক ও যুবতী বসে আছে। তারা খোশ গল্পে লিপ্ত। হাসপাতালের ভেতরে গিয়ে চোখে পড়ে নামমাত্র অপারেশন থিয়েটারের। যা ব্যবহারে অনুপযোগী। ১৫০-২০০ বর্গফুটের একেকটি কক্ষকে ওয়ার্ডে রুপান্তর করা হয়েছে। মহিলা ও পুরুষ ওয়ার্ডে রাখা হয়েছে একাধিক শয্যা। অর্থাৎ রোগী প্রতি ৫০ বর্গফুট জায়গাও বরাদ্দ নেই। দালালের মাধ্যমে ভাগিয়ে আনা রোগী ও স্বজনেরা গাদাগাদি করে থাকছেন। অথচ বেড ভাড়া বাবদ হাতিয়ে নেয়া হচ্ছে টাকা । প্যাথলজি বিভাগে কাউকে পাওয়া যায়নি। সরঞ্জামগুলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। চিকিৎসকের খোঁজ করেও পাওয়া যায়নি। অথচ সেখানে একাধিক চিকিৎসকের সাইনবোর্ড ঝুলানো রয়েছে। ঝিকরগাছা থেকে আসা শহিদুল ইসলাম নামে এক রোগী জানান, তিনি এসেছিলেন যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে। সেখান থেকে এক সযুবক তাকে দেশ ক্লিনিকে ডেকে আনেন। চিকিৎসা পরীক্ষা নিরীক্ষা বাবদ তার কাছ থেকে হাতিয়ে নেয়া হয়েছে ২২শ ৭০ টাকা। প্যাথলজি রিপোর্টের কাগজে দেখা গেছে একজন নাম বিহীন মেডিকেল অফিসারের একটি সিলের উপর স্বাক্ষর করা রয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, এখানে প্যাথলজির কোন সঠিক পরীক্ষা নিরীক্ষা হয়না। কম্পিউটারে ফরমেট করে রাখা প্যাডের উপর নিজেদের ইচ্ছা মতো রিপোর্ট তৈরি করে তা রোগীদের মাঝে দেয়া হয়। এছাড়া চিকিৎসকের প্যাড তৈরি করে মালিক পক্ষ নিজেরাই ডাক্তার সেজে রোগীর চিকিৎসা দিয়ে থাকেন। বিগত দিনে দেশ ক্লিনিকে ভ্রাম্যমান আদালত অভিযান দুই দফায় অভিযান চালিয়ে মোটা অংকের জরিমানা আদায় করেন। সর্বশেষ ওই প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন নেয়ার জন্য দুই সপ্তাহ সময় বেধে দেয়া হয়। কিন্তু তিন মাস পার হলেও অনুমোদন নেয়া হয়নি সিভিল সার্জন অফিস নিশিচত করেছে। পরিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক খোকন পরীক্ষা নিরীক্ষা ও চিকিৎসা প্রতারণার বিষয়ে সঠিক উত্তর দিতে পারেননি। একপর্যায়ে তিনি জানান, এখন একটু ব্যস্ত রয়েছি। পরে আসেন কথা হবে। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, প্রতারণায় সেরা দেশ ক্লিনিকটি সিলগালা করে দেয়া হোক। এদিকে, অবৈধভাবে গড়ে ওঠা আরেকটি প্রতিষ্ঠান হলো কমটেক ডায়াগনস্টিক সেন্টার এন্ড হাসপাতাল। এখানে চিকিৎসাসেবার কোন পরিবেশ নেই। দালালের উপর ভর করেই প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনা করা হচ্ছে। এখানকার নিয়োগকৃত দালালরা যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতাল থেকে রোগী ভাগিয়ে এখানে আনার পর গলাকাটা বানিজ্য করা হয়। চিকিৎসক, নার্স ও চিকিৎসা সরঞ্জাম না থাকলেও এটি হাসপাতাল হিসেবে কার্যক্রম চলছে।
ইউনিক হসপিটাল এন্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারের বিরুদ্ধেও অভিযোগের শেষ নেই। আলোচিত এই স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি নানা অনিয়মের মধ্যে পরিচালিত হচ্ছে। এছ্ড়াা রয়েছে অপচিকিৎসার অভিযোগ। যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপতালের কতিপয় চিকিৎসক সরকারি এই হাসপাতাল থেকে হাত পা ভেঙ্গে যাওয়া রোগীদের গোপনে ইউনিক হসপিটালে পাঠিয়ে দিচ্ছে। এছাড়া বিগত দিনে এখানে ডা. আনসার আলীর অপচিকিৎসায় চৌগাছার মাড়ুয়া গ্রামের দিনমজুর ফজলুর রহমানের ছেলে শামিনুর রহমানের (১০) জীবন সংকটাপন্ন হয়ে পড়ে। গরু বিক্রির টাকা দিয়ে ছেলেকে চিকিৎসা করাতে গিয়ে প্রতারণার শিকার হন ফজলুর রহমান। এঘটনায় রোগীর স্বজনরা ইউনিক হসপিটালে হামলা চালিয়ে ভাংচুর করে। ওই সময় হাসপাতালের পরিচালক উজ্জল বিশ্বাসও জখম হয়েছিলেন। এদিকে ছোট ছোট কক্ষে ৬ থেকে ৮ টি করে শয্যা বিছানো হয়েছে। মোটা অংকের টাকা ব্যয় করেও আরাম দায়ক পরিবেশে চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন রোগীরা। অনুসন্ধানে জানা গেছে, কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়াই চলছে ল্যাবজোন স্পেশালাইজিড হসপিটালের চিকিৎসা কার্যক্রম। উন্নতমানের কোনো যন্ত্রপাতি না থাকলেও করা হচ্ছে পরীক্ষা-নিরীক্ষা।
যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের সামনেই অবস্থিত স্ক্যান হসপিটাল। এই প্রতিষ্ঠানের রয়েছে নিয়োগকৃত ১৩ দালাল। তারা সব সময় সরকারি হাসপাতাল থেকে রোগী ভাগোনোর কাজে ব্যস্ত থাকে। এখানে পরীক্ষা নিরীক্ষা নামে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে হাতিয়ে নেয়া হচ্ছে হাজার হাজার টাকা। অভিযোগ উঠেছে, সরকারি হাসপাতালের এক চিকিৎসক ইকো করার জন্য রোগীদের কিংস হসপিটালে পাঠিয়ে দিচ্ছেন। এখান শয্যা, প্যাথলজি ল্যাব, ও অস্ত্রোপচার কক্ষের পরিবেশ বেহাল। নোংরা পরিবেশে চলছে চিকিৎসা কার্যক্রম। চিকিৎসা ও পরীক্ষা নিরীক্ষার নামে অর্থ হাতিয়ে নেয়ায় হচ্ছে মূল ধান্দা। সিভিল সার্জন কার্যালয়ের সূত্রে জানা গেছে, ১৯৮২ সালের দ্য মেডিকেল প্রাকটিস অ্যান্ড প্রইিভেট ক্লিনিক অ্যান্ড ল্যাবরেটরিজ (রেগুলেশন) অর্ডিন্যান্সেই উল্লেখ আছে, ১০ শয্যার প্রতিটি হাসপাতাল অথবা ক্লিনিকে রোগী প্রতি ফ্লোর স্পেস থাকতে হবে নূন্যতম ৮০ বর্গফুট। জরুরি বিভাগ, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঝুঁকিমুক্ত অপারেশন থিয়েটার, চিকিৎসার জন্য যন্ত্রপাতি, ওষুধ বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, প্যাথলজিক্যাল ল্যাবরেটরি থাকতে হবে। শর্তানুযায়ী ৩ জন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, ডিপ্লোমাধারী ২ জন সেবিকা, ৩ জন সুইপার ও ৮শ’ বর্গফুট জায়গা থাকা বাধ্যতামূলক । কিন্তু যশোর ঘোপ নওয়াপাড়া রোডে অবস্থিত বেসরকারি অধিকাংশ স্বাস্থ্য স্থাপনে সেই আইন মানা হয়নি। ঝুঁকি ও প্রতারণার মধ্যে চিকিৎসাসেবা পরিচালনা করা হচ্ছে। হাসপাতালের সামনের মোট ৪টি প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স নেই বলেও নিশ্চিত করেছে যশোর সিভিল সার্জন অফিস। যশোরের সিভিল সার্জন ডা. দিলীপ কুমার রায় জানিয়েছেন, দেশ ক্লিনিক, ইউনিক হসপিটাল, স্ক্যাান হসপিটাল, কমটেক ডায়াগনস্টিক সেন্টার এন্ড হাসপাতাল ও ল্যাবজোন স্পেশালাইজিড হসপিটালসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে নানা অভিযোগ শোনা যাচ্ছে। সেগুলো খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ইতিমধ্যে অবৈধ হাসপাতাল ও ক্লিনিকের তালিকা তৈরি করা হয়েছে। তাছাড়া লাইসেন্স করা যেসব প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়ম না মেনে পরিচালনা হচ্ছে। অচিরেই ওই স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। নিম্নমান ও অনুমোদনহীন এসব বেসরকারি হাসপাতাল-ক্লিনিকের নিয়োগ করা দালালের ফাঁদে পড়ে প্রতারিত হচ্ছেন রোগী ও স্বজনেরা।